kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

নিউমোনিয়া প্রতিরোধের উপায়

রাশেদ রাফি

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিউমোনিয়া প্রতিরোধের উপায়

২০০৬ সালে ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বের করে ‘নিউমোনিয়া দ্য ফরগোটেন কিলার অব চিলড্রেন’ নামে একটা বিশেষ প্রতিবেদন। বিস্ময়ের বিষয় হলো, তা এখনো ‘ফরগোটেন’ বা রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে। ইউনিসেফের সর্বশেষ তথ্য (২০১৭) অনুযায়ী সারা বিশ্বে নিউমোনিয়া এখনো শিশুমৃত্যুর কারণ হিসেবে সবার ওপরে এবং এখনো অনূর্ধ্ব পাঁচ শিশুমৃত্যুর ১৬ শতাংশের কারণ এই রহস্যঘাতক। পৃথিবীর গড় হিসাবের মতো বাংলাদেশেও অনূর্ধ্ব পাঁচ শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে আছে এই নিউমোনিয়া। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী এ দেশে পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যু হারের ১০টি কারণের মধ্যে এখনো শীর্ষে আছে নিউমোনিয়া, যা মোট মৃত্যু হারের ৩০ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৬ সালের তথ্যানুযায়ী জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি ১৯৯০-২০১৫) অর্জন করতে গিয়ে পৃথিবীব্যাপী অনূর্ধ্ব পাঁচ শিশুমৃত্যুর হার কমানো হয়েছে অর্ধেকেরও বেশি, যা ১২.৭ মিলিয়ন থেকে নেমে এসেছে ছয় মিলিয়নে। এ ক্ষেত্রে ম্যালেরিয়া, হামসহ অন্য সব সমস্যাকে যেভাবে মোকাবেলা করা হয়েছে নিউমোনিয়াকে সেভাবে প্রতিরোধ করা হয়নি। আর তাই এটি এখনো মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে সবার ওপরে আছে। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে পৃথিবীব্যাপী ম্যালেরিয়া আক্রান্ত শিশুমৃত্যুর হার ঠেকানো হয়েছে ৮৬ শতাংশ অথচ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুমৃত্যুর হার ঠেকানো হয়েছে মাত্র ৫১ শতাংশ। নিউমোনিয়া বিষয়ে পৃথিবীর এই পিছিয়ে পড়া গড় হিসাবের সঙ্গে তাল রেখেছে বাংলাদেশও।

সেভ দ্য চিলড্রেন ও শিশু স্বাস্থ্য গবেষণা ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে নিউমোনিয়ার কারণে বছরে ৫০ হাজার অনূর্ধ্ব পাঁচ শিশু মারা যেত, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১৭ হাজারে। বর্তমানে বাংলাদেশ নিউমোনিয়া মোকাবেলার জন্য সব দিক থেকে প্রস্তুত। নিউমোনিয়া রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেখানো আইএমসিআই (ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট অব চাইল্ডহুড ইলনেস) প্রক্রিয়ার অধীনে বাংলাদেশ সরকার ও আইসিডিডিআরবি ১৯৯৯ সাল থেকে শিশুদের জন্য পুষ্টি কর্মসূচি ও অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার কথা বলে আসছে, যা এখন প্রায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০১৫ সাল থেকে গ্যাভি (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনেশন অ্যান্ড ইমুনাইজেশন) ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় ব্যাক্টেরিয়াজাত নিউমোনিয়া রোধে দুটি ভ্যাকসিন দিয়ে আসছে, যা হলো হিব (হ্যামোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ ‘বি’) ও পিসিভি (নিউমোকোক্যাল কনজুগেট ভ্যাকসিন)। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় খবর হলো, ডা. জোবায়ের চিশতির বাবল সিপিএপি (কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়েজ প্রেসার) ডিভাইস। মাত্র ১০৫ টাকা খরচে তৈরি প্লাস্টিক বোতলের এ ডিভাইস বিদেশি ১৫ হাজার ডলারের মেশিনের স্থলে ‘নিউমোনিয়া আক্রান্ত’ শিশুকে সহজ শ্বাস-প্রশ্বাসে সহযোগিতা করে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। এরই মধ্যে আইসিডিডিআরবি হাসপাতালে এই চিকিৎসার মাধ্যমে নিউমোনিয়া আক্রান্ত ৭৫ শতাংশ শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে, যা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া সরাসরি অপুষ্টির সঙ্গে জড়িত বিধায় বাংলাদেশ অপুষ্টিরোধে ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাশাপাশি অন্যান্য অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জিএপিপিডি (গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর নিউমোনিয়া অ্যান্ড ডায়রিয়া) কর্মসূচির আওতায় ২০২৫ সালের মধ্যে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া-সংক্রান্ত সব প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যু বন্ধ করার বিষয়েও বাংলাদেশ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এখন কথা হলো, কমতিটা কোথায়? আসলে কমতিটা হলো জনসচেতনতায়।

আমাদের সবার জন্য জানার বিষয় হলো, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় তারাই, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম; আর এ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে সাধারণত অপুষ্ট শিশু ও বৃদ্ধরা। অতএব, এই রহস্যঘাতকের হাত থেকে আমাদের শিশু ও বৃদ্ধদের রক্ষা করার জন্য চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। আমাদের জানতে হবে কী করলে শিশু ও বৃদ্ধরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হবে না, কখন আক্রান্তজনকে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে এবং সেই সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী কিভাবে আক্রান্ত শিশু বা বৃদ্ধকে চিকিৎসা দিতে হবে।

লেখক : জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষক, প্রধান নির্বাহী—ফুল-পাখি-চাঁদ-নদী ফিল্মস

[email protected]

মন্তব্য