kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

রোজার আগেই খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা

মযহারুল ইসলাম বাবলা

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রোজার আগেই খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা

পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে এখনো প্রায় অর্ধমাস বাকি, অথচ এরই মধ্যে খাদ্যপণ্যের বাজারে দর বৃদ্ধির হিড়িক পড়ে গেছে। দর বৃদ্ধির এই প্রবণতা আমরা প্রতি রোজার মাসেই প্রত্যক্ষ করি।

রোজার আগে প্রতিবছরই ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করা হয়। দাম না বাড়াতে অনুরোধ করা হয়। সেই অনুরোধ ব্যবসায়ীরা অবলীলায় অবজ্ঞা করেন। এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। প্রধানত যে কারণটি উল্লেখ করা যেতে পারে, সেটা হচ্ছে আমাদের শাসকগোষ্ঠী প্রসঙ্গে। যেমন আমাদের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের শাসনামলে সংসদ সদস্য এবং সরকারে অন্তর্ভুক্ত কত শতাংশ রাজনীতিক আর কত শতাংশ ব্যবসায়ী? ৩০০ আসনের সংসদে যাঁরা বসেন তাঁদের সিকি ভাগ রাজনীতিক হলে অবশিষ্ট বৃহৎ অংশই শিল্পপতি-ব্যবসায়ী বা অন্য পেশাজীবী। রাজনীতিকদের পরিমাণ যে এক-চতুর্থাংশ সেটা অনায়াসে বলা যায়। তাহলে অনুরোধ বা নির্দেশ পালন কারা করছেন না এবং কেন করছেন না সেটাও অপরিষ্কার থাকে না।

একসময় আমাদের বাজারব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের একক আধিপত্য ছিল না। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল। যেমন টিসিবি, কসকর, রেশন শপ, ন্যায্যমূল্যের দোকান ইত্যাদি। রাষ্ট্রের দর্শন পুরোপুরি পুঁজিবাদী মতাদর্শের কারণে ওই সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলুপ্তি ঘটেছে। তাই এখন বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিদ্যমান। রাজনীতিতে সংসদ সদস্য-মন্ত্রীদের তুলনা বিচারেও সংখ্যাধিক্য ওই ব্যবসায়ীরা। যাঁদের একমাত্র লক্ষ্যই মুনাফা। অতি মুনাফা লাভের অভিপ্রায়েই তাঁরা রাজনীতিতে শামিল হয়ে নিজেদের অর্থ-বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। সেই অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে নানা পথে।

ধর্মীয় অনুশাসনে রোজার মাসকে সংযমের মাস হিসেবে অভিহিত করা হয়। বাস্তবতা কিন্তু ঠিক বিপরীত। কিছু মানুষের আচরণে অসংযমই যেন বেশি লক্ষ করা যায়। তাদের আহারে-বিলাসে সীমাহীন চাহিদায় এবং অপচয়ের ধাক্কায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের বাজারব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কার্যত কোনো ভূমিকা নেই, নেই নিয়ন্ত্রণও। সবটাই ব্যবসায়ীদের দখলে। তাঁরা চাহিদার বিবেচনায় ক্রমাগত খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করলেও এর জন্য তাঁদের কোনো জবাবদিহির মুখে পড়তে হয় না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জনগণের পকেট কাটছেন। বিত্তবান বা উচ্চমধ্যবিত্তদের দর বৃদ্ধির জন্য তেমন অসুবিধা না হলেও সাধারণ মানুষের দুদর্শার যেন অন্ত নেই। আমাদের কৃষিপণ্যের উৎপাদক কৃষক, কিন্তু তারা রক্ত-ঘামে উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পায় না। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য মধ্যস্বত্ব্বভোগী ফড়িয়া, পাইকার-ব্যবসায়ীরা স্বল্পমূল্যেই খরিদ করে বিভিন্ন পরিবহনে শহরে চালান করে। কৃষকের জমি থেকে ক্রয় করা পণ্য তিন-চার হাত বদলে তিন-চার গুণ বেশি মূল্যে বিক্রি হয় শহরের পাইকারি আড়তে। আড়ত থেকে খুচরা বিক্রেতাদের হাতে পণ্য পৌঁছায় কয়েক হাত ঘুরে। এই হাত ঘুরে ঘুরেই পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। প্রকৃত উৎপাদক কৃষক বঞ্চিত হয় ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে, মধ্যস্বত্বভোগীরা হাতিয়ে নেয় সর্বোচ্চ মুনাফা। পণ্য বিপণনের এই ব্যবস্থা যত দিন অটুট থাকবে তত দিন ঘাম ঝরানো পণ্য উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য যেমন কৃষক পাবে না, তেমনি ভোক্তা সাধারণের পক্ষেও ন্যায্য দামে পণ্য ক্রয় সম্ভব হবে না। তাই সর্বাগ্রে জরুরি এই সিন্ডিকেট ভাঙা। যা একমাত্র সরকারের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু সদিচ্ছার অভাবে বাস্তবে সেটা হচ্ছে না।

আমাদের বাজারব্যবস্থাজুড়ে নৈরাজ্য চলছে। রোজার আগমনে সেটা প্রতি রোজায়ই তীব্রতর রূপ ধারণ করে। নিয়ন্ত্রণহীন বাজারব্যবস্থার মাসুল দিতে হয় অসহায় সমষ্টিগত সাধারণ মানুষকে। বিত্তবান ও উচ্চমধ্যবিত্তদের মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপে খুব একটা যায়-আসে না। তাদের ক্রয়ক্ষমতা বেশি শক্তপোক্ত বলেই অল্প মূল্যের পণ্য উচ্চমূল্যে ক্রয়ে বেগ পেতে হয় না। অন্যদিকে মর্জিমাফিক মূল্যে পণ্য বিক্রিও করতে পারছে ব্যবসায়ী নামধারী অসাধু চক্র।

বাজারব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি ব্যর্থ। শুধু আশ্বাস আর নানা ছেলে-ভোলানো বুলি আওড়িয়ে থাকেন। বাস্তবে সেসব বুলি শুধুই কথার কথা আর মিথ্যা সান্ত্বনা মাত্র। বাংলায় প্রবচন আছে, ‘সরষেতেই ভূত থাকলে সে সরষে দিয়ে ভূত ছাড়ানো যায় না’। আমাদের দেশের বাস্তবতায় প্রবচনটি যথার্থই খাটে। আমাদের দেশের অর্থনীতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে করপোরেট ব্যবসায়ী কাম রাজনীতিকরা; রাজনীতিও ওই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণে। তাই সরকারপ্রধান  থেকে মন্ত্রীদের আহ্বানে ব্যবসায়ীরা সাড়া না দিয়েও নিরাপদ নিষ্কণ্টক অবস্থানে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। সমস্যার মূল কেন্দ্রে এটাই। এই ব্যবস্থাকে না পাল্টানো অবধি সমষ্টিগত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের কোনোই সম্ভাবনা নেই।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

মন্তব্য