kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

খ্রিস্টের শুভ পুনরুত্থান

মার্টিন অধিকারী

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খ্রিস্টের শুভ পুনরুত্থান

খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের জন্য আজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের দিন। খ্রিস্ট ধর্ম বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠাতা যিশুখ্রিস্টের মৃত্যু থেকে পুনরুত্থানের বার্ষিকী আজ। বর্তমান কালের খ্রিস্ট ধর্মের বিখ্যাত প্রচারকের কথায় ‘পুনরুত্থান হলো খ্রিস্ট ধর্মের নির্ভরবিন্দু।’ পবিত্র বাইবেলের শিক্ষায় মানুষের পাপমুক্তির মূল্যরূপে খ্রিস্টের আত্মদান ও মৃত্যুর ওপরে তাঁর বিজয়ের বিষয়গুলো একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি নিষ্পাপ ও নিষ্কলঙ্ক ঐশমানব বলেই পাপী মানুষের পাপের কাফফারা বা প্রায়শ্চিত্ত সাধন করতে পেরেছেন এবং পাপের দণ্ড যে অনন্ত মৃত্যু বা ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্নতা, তাকে ঘোচাতে পেরেছেন। মৃত্যুর ওপর তাঁর জয়লাভ দেখায় যে মৃত্যু তাঁর অধীন, তিনি শাশ্বত চিরঞ্জীব, মৃত্যুর অধীন নন। সব বিশ্বসংসারের সার্বভৌম স্রষ্টা ও প্রভু এবং মঙ্গলময় ও ন্যায়বান ঈশ্বর তাঁর পুত্রের স্বেচ্ছায় আত্মদানের মধ্য দিয়ে মানুষের পাপের মুক্তি সাধন করেছেন তাঁরই অনন্ত-অসীম প্রেমের মাহাত্ম্যে। খ্রিস্ট তাই বলেছেন, ‘পিতা আমাকে এই জন্য প্রেম করেন; কারণ আমি আপন প্রাণ সমর্পণ করি, যেন আবার তা গ্রহণ করি। কেহ আমা হইতে তাহা হরণ করে না, বরং আমি আপনা হইতেই তাহা সমর্পণ করি। তাহা সমর্পণ করিতে আমার ক্ষমতা আছে; এবং আবার তাহা গ্রহণ করিতেও আমার ক্ষমতা আছে।’ (যোহন ১০ : ১৭-১৮)

এ কথা অবশ্য উল্লেখ্য যে নিষ্পাপ খ্রিস্টের মানবদেহ ধারণ পাপের অধীন মানুষের জন্য দুঃখভোগ ও নিষ্ঠুর ক্রুশীয় মৃত্যু এবং রূপান্তরিত দেহে তাঁর গৌরবময় পুনরুত্থানের সব ঘটনাই একসূত্রে গাঁথা। তাঁর একই বাণী যে তিনি অনন্তকালীন সত্য ও পুত্র-ঈশ্বর। পুত্ররূপে তিনি মানবের পরিত্রাণের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার ও একমাত্র কার্যকর ও সার্থক উৎসর্গ। সে উৎসর্গ বা বলির সার্থকতা ও ঐশ্বরিক মূল্যায়ন হয়েছে তাঁর মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে। খ্রিস্টে বিশ্বাসী তাই তাঁর মাধ্যমে পাপের ক্ষমা ও পরিত্রাণ লাভ করেন। পশুর রক্ত কিংবা অন্য কোনো কিছুর বিনিময়ে পাপের পরিত্রাণ হয় না। ঈশ্বরের একমাত্র ‘মেষশাবক’, যিনি সেই খ্রিস্টের অনুগ্রহে পাপীর পক্ষে তাঁরই আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে তা সম্ভব। পবিত্র ঈশ্বর পাপকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছেন। আর তা থেকে মানুষের প্রায়শ্চিত্তের কাজটি সহজ হওয়ার কথা নয় বলেই খ্রিস্টকে মানুষের পাপের দণ্ড সেদিনের বিধানানুযায়ী ক্রুশে মৃত্যুবরণ করতে হলো। শাস্ত্রে বলা আছে, ‘যিনি পাপ জানেননি, তাঁকেই তিনি আমাদের পক্ষে পাপস্বরূপ করলেন, যেন আমরা তাতে ঈশ্বরের ধার্মিকতাস্বরূপ হই।’ (২ করিন্থীয় ৫ঃ২১) পাপের কারণে খ্রিস্টের আত্মদান, নরকযন্ত্রণা ও ঈশ্বরের ক্রোধজনিত ঈশ্বর থেকে তাঁর বিচ্ছিন্নতার সবই পাপীর মুক্তির মূল্য।

মানবের পরিত্রাণের জন্য ত্যাগ স্বীকারের চূড়ান্ত আদর্শ খ্রিস্টের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘ঈশ্বরের স্বরূপবিশিষ্ট থাকিতে তিনি  ঈশ্বরের সহিত সমান থাকা ধরিয়া লইবার বিষয় জ্ঞান করিলেন না, কিন্তু আপনাকে শূন্য করিলেন, দাসের রূপ ধারণ করিলেন, মনুষ্যদের সাদৃশ্যে জন্মিলেন; এবং আকার-প্রকারে মনুষ্যবৎ প্রত্যক্ষ হইয়া আপনাকে অবনত করিলেন; মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি ক্রুশীয় মৃত্যু পর্যন্ত আজ্ঞাবহ হইলেন...।’ (ফিলিফীয় ২ : ৬-১১)

যিশুখ্রিস্টের পুনরুত্থানের পারমার্থিক প্রত্যাশার পাশাপাশি ঐহজাগতিক অতীব গুরুত্ববাহী এক তাৎপর্য আছে। তাঁর দুঃখভোগ, মৃত্যুযন্ত্রণা এবং তাঁর পুনরুত্থানের বার্তা আমাদের আত্মসমীক্ষার জন্য চেতনা দেয়। কিন্তু পাপের জন্য শুধু অনুশোচনা বা দুঃখ প্রকাশই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন হিংসা, অন্যায় ও মন্দতা পরিত্যাগ করে নতুন জীবনে চলা। সব মানবসমাজ আজ পাপপঙ্কে নিমজ্জিত। তাই আজ যেন কোথাও প্রকৃত শান্তি নেই। মানুষের জীবনকে প্রেমময় ঈশ্বর অসীম মূল্য দান করেন। ‘আমার জীবনের দিব্য পাপীর মরণে আমার শান্তি নাই; বরং পাপী যে আপন কুপথ হইতে ফিরিয়া বাঁচে, তাহাতেই আমার শান্তি।’ (যিহিস্কেল ৩৩ঃ১১) তাহলে আমাদের নিজের ও অন্যের জীবনকে মূল্য দিতে হবে। হিংসায় উন্মত্ত মানবসমাজে আজ অনেকের মানবীয় মূল্যবোধের যেন অপ্রতিরোধ্য অধোগতি। আমাদের কাছে খ্রিস্টের পুনরুত্থানের আহ্বান সব লোভ, অন্যায় ও হিংসার ঊর্ধ্বে ওঠার, জীবনকে পবিত্র ও মহামূল্য বলে জ্ঞান করার আহ্বান। মানুষের মধ্যে আজ চাই তার মূল্যবোধের পুনরুদ্ধার ও পুনরুত্থান।

লেখক : খ্রিস্টীয় ঈশতত্ত্বের শিক্ষক

[email protected]

মন্তব্য