kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

নারী ফুটবলে নতুন দিগন্ত

ইকরামউজ্জমান

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নারী ফুটবলে নতুন দিগন্ত

বাঙালি নারী ফুটবলের ইতিহাসে ২২ এপ্রিল ২০১৯ সব সময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছার নাম অনুসারে বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ মহিলা আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টের আয়োজন একটি যুগান্তকারী ও তাৎপর্যময় পদক্ষেপ। এই টুর্নামেন্টের আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) দেশের নারী ফুটবলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিল। ক্রীড়াঙ্গনে সম-অধিকারের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিল। নারী ফুটবলে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, যেটি সব সময় উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে।

দেশের ফুটবলে নারী ফুটবল এখন আলাদা একটি শক্তি। বিগত কয়েক বছরে বয়সভিত্তিক ফুটবলে নারী ফুটবলাররা দেশের জন্য যে সুনাম ও গৌরব অর্জন করেছেন—এটি পুরুষদের বয়সভিত্তিক ফুটবলে পাওয়া যায়নি। নারী ফুটবলাররা বয়সভিত্তিক ফুটবলে নিজেদের স্বপ্নপূরণে অনড়। তাঁরা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও নিজেদের চেনার জন্য ফুটবল মাঠে লড়াই করে চলেছেন। এই লড়াই পরিবর্তনের। এই লড়াই এগিয়ে চলার। টুর্নামেন্টের স্পন্সর প্রতিষ্ঠান কে স্পোর্টস এমন একটি উদ্যোগের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, যেটি শুধু সময়োপযোগী নয়—এর প্রভাব নারী ফুটবলে সুদূরপ্রসারী। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নারীদের ফুটবলে সহযোগিতা প্রশংসনীয়।

যখন নারী ফুটবল নিয়ে ভাবি, অবাক না হয়ে পারি না। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে নারী ফুটবল কোন অবস্থা থেকে কোথায় এসে পৌঁছেছে! ১৯৭৭ সালের একটি সকাল এখনো মনে আছে। সাবেক খ্যাতনামা খেলোয়াড় ও সিনিয়র জাতীয় ফুটবল প্রশিক্ষক শেখ সাহেব আলী ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ মাঠে (বেইলি রোডে) মেয়েদের ফুটবল খেলা শেখাচ্ছেন। অংশগ্রহণকারী মেয়েদের সে কী উৎসাহ। স্কুল কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে আমরা কয়েকজন গিয়েছিলাম। এর মধ্যে আব্দুল হামিদ, কাজী সামসুল ইসলাম, আতাউল হক মল্লিকও ছিলেন। স্কুলের শিক্ষয়িত্রী ফেরদৌস আরা খানম, যিনি পরবর্তী সময়ে প্রায় আট বছর মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জড়িত ছিলেন বিওএ ও বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের সঙ্গে এবং এই প্রশিক্ষণ শিবিরের দায়িত্বেও ছিলেন। প্রশিক্ষণ বেশিদিন চালানো সম্ভব হয়নি। তবে এটিই স্বাধীন দেশে মেয়েদের একত্র করে ফুটবল খেলা শেখানোর প্রথম উদ্যোগ। এরপর ২০০৩ সালে বাফুফে নারীদের ফুটবল নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে। এরপর আরেক ইতিহাস। আর এরই ধারাবাহিকতায় এখনকার নারী ফুটবল। ফুটবলে সাধারণ মহলের বড় আস্থার ক্ষেত্র।

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার ভূমিকা ও অবদান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর পরিবারের সদস্যের মধ্যে শুধু সীমাবদ্ধ ছিল না। এর বাইরে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে তাঁর ভূমিকা, অবদান, সহযোগিতা, প্রেরণা এবং সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে দৃঢ়চেতা মনোভাব পুরো জাতিকে সাহায্য করেছে। একজন নারী হিসেবে তিনি সব সময় পুরুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, বিভিন্নভাবে সাহায্য এবং উৎসাহিত করেছেন। তিনি নারী ও পুরুষ সমতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর নাম অনুসারে টুর্নামেন্টের নামকরণের কারণ হলো নারী ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। অন্যটি হলো—মহীয়সী নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন, যিনি শুধু জাতির জনককে সব সময় সমর্থন দেননি, তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিবার এবং এর বাইরে একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সব সময় ছিলেন, তাদের কথা ভেবেছেন বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও।

২২ এপ্রিল অনূর্ধ্ব-১৯ মহিলা ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। উদ্বোধনী খেলা স্বাগতিক বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে ছয়টি দেশ। ‘এ’ গ্রুপে মঙ্গোলিয়া, কাজিকিস্তান ও লাওস। আর গ্রুপ ‘বি’তে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাংলাদেশ ও কিরগিজস্তান।  টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ৩ মে। আশা করা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফাইনাল ম্যাচে মাঠে উপস্থিত থেকে খেলা দেখবেন এবং ট্রফি বিতরণ করবেন।

বাংলাদেশের নারী দল বয়সভিত্তিক ফুটবলে খুব ভালো খেলছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে টুর্নামেন্ট অনূর্ধ্ব-১৯-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাটা সমীচীন হয়েছে। স্বাগতিক নারী দল মাঠে লড়তে পারবে ভালোভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। গত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বয়সভিত্তিক দলটি ভারত ও নেপালের জাতীয় দলের বিপক্ষে ভালো খেলতে পারেনি। এর জন্য অবশ্য নারী ফুটবলাররা দায়ী নন। বয়সভিত্তিক দল কখনো সিনিয়র দলের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও কৌশলের দিক থেকে পেরে উঠবে না। সাফের দল থেকে দু-একজন সরিয়ে নতুন করে দু-তিনজনকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রশিক্ষণের পর বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ স্কোয়াড দাঁড় করানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব-১৫, ১৬ ও ১৭ নারী ফুটবলাররাই স্কোয়াডে ডমিনেট করছেন, আর তাঁরাই বয়সভিত্তিক ফুটবলে আসল শক্তি। বাংলাদেশের টার্গেট হলো শিরোপা। প্রতিপক্ষ দুটি দেশ ছাড়া অন্য দলের দলগত শক্তি সম্পর্কে অবগত না থাকায় কিছুই বলতে পারছি না। তবে বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট ও খেলোয়াড়দের বিশ্বাস, তাঁরা সেরাটা উপহার দেবে শিরোপা জয়ের জন্য। তাঁরা বলছেন, তাঁরা চাপমুক্ত ফুটবল খেলবেন। দেশের মানুষের সামনে খেলার বাড়তি সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

বাফুফে থেকে জানানো হয়েছে, বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টকে ফিফা ও এএফসি স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই এটি দেশের ফুটবল ক্যালেন্ডার ছাড়াও এএফসির ক্যালেন্ডারে স্থান পাবে। বাফুফে আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে পেরেছে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, এটি অনেক বড় বিষয়। বর্তমানে প্রতিটি দেশ নিজস্ব কর্মসূচি ও এএফসি এবং অন্যান্য কর্মসূচি নিয়ে এত ব্যস্ত যে সময় দিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে বাফুফের সাংগঠনিক দক্ষতা এবং যোগাযোগের কারণেই এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ সম্ভব হয়েছে। আশা করব এই টুর্নামেন্ট নিয়মিতভাবে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হবে।

এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের নারী দল অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্টে খেলবে। এতে বিভিন্ন অঞ্চলের বয়সভিত্তিক ফুটবলের অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত হওয়া সম্ভব হবে। স্বাগতিক নারী দল বিদেশি দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাওয়ায় নিজেদের যোগ্যতা, দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ পাবে, পাশাপাশি অভিজ্ঞতাও বাড়বে। দেশের ফুটবল বিনোদনে বিশ্বাসী মানুষ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের নারীদের খেলা দেখার সুযোগ পাবে। বালিকা, কিশোরী ও তরুণীদের এই টুর্নামেন্ট খেলার প্রতি আরো আগ্রহ বাড়াবে। বাড়বে দেশে নারী ফুটবলের জনপ্রিয়তা। বঙ্গমাতা ফুটবল দেশে মেয়েদের ফুটবলে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই ফুটবলে খেলে আসা ফুটবলাররা এবার অনূর্ধ্ব-১৯ আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপে দেশের সম্মানের জন্য লড়বেন। শুধু রোমাঞ্চ নয়, আবেগও অনেক বড় শক্তি।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য