kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

বাতাসে আগুনের গন্ধ

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাতাসে আগুনের গন্ধ

সময়টা হুট করে যেন ‘আগুনময়’ হয়ে উঠেছে। বাতাসটা হঠাৎ যেন আগুনপোড়া লাশের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। আগুনে পীড়িত, আহত-নিহতদের অসহায় রোদন আর চিৎকারে বারবার কেঁদে উঠছে আকাশ। এ কান্না যেন থামছেই না।

আমাদের দেশে সাধারণত রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার আসেন। তারপর শুরু হয় পোস্টমর্টেম। এবারও অগ্নিকাণ্ডের পর জানা যায় ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই কিংবা নেই প্রয়োজনীয় বহির্গমন সিঁড়ি। এমনকি নকশাবহির্ভূত নির্মাণেরও প্রতিকার নেই। ওদিকে ডিএনসিসির কাঁচাবাজারে আগুনের ঘটনায় জানা গেল, ওই মার্কেটে এখনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। অথচ  দুই বছর আগেও একই মার্কেটে আগুন লেগেছিল। রাত পেরোতেই অতীত হয়ে যায় ৫৪ বছরের ইতিহাস। ভোরের সূর্য উঁকি না দিতেই নাই হয়ে যায় ৬৩৪টি দোকান। ওই ঘটনার পর জানা যায়, ভবনটি ছিল অনেক আগে থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। দোতলা ভিতের ওপর দাঁড়ানো চার তলা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সেটা ভেঙে ফেলতে রাজউক একাধিকবার চিঠি দেয়। ঝুঁকির বিষয়টি জানিয়ে রাজউক মার্কেটটির কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের একাধিকবার তাগাদাপত্রও দেয় (কালের কণ্ঠ, ৪ জানয়ারি, ২০১৭)। বুয়েটের পরীক্ষায় ২০০৯ সালেই মার্কেটটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। তার পরও তাদের হুঁশ হয়নি। মার্কেটটিতে ৯০টি অবৈধ স্থাপনা ছিল। খাবার হোটেলে অবৈধ গ্যাস সিলিন্ডারের হরদম ব্যবহার ছিল। অথচ ছিল না আলো-বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। মার্কেটটির এক বড় অংশজুড়েই ছিল দাহ্য পদার্থ। বিপরীতে ছিল না পর্যাপ্ত অগ্নি প্রতিরোধক বা নির্বাপক যন্ত্রপাতি বা ব্যবস্থা (কালের কণ্ঠ, ৪ জানয়ারি, ২০১৭)। এত বড় একটা ট্র্যাজেডির পরও তাদের সুমতি হয়নি। ৩০ মার্চ আবারও পুড়ল ভবনটি।

বিদ্যমান আইন অনুসারে প্রতিটি ভবন বা দালানে অগ্নিঝুঁকি অনুপাতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র্ত্র মজুদ এবং জরুরি নির্গমন পথ, দরজা ও সিঁড়ি থাকতে হবে। আকার ও আয়তন অনুপাতে একটি ভবনে কী ধরনের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র মজুদ থাকতে হবে, তা-ও আইনে বলা আছে। অন্যদিকে বৈদ্যুতিক গোলযোগে যাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা না ঘটে তজ্জন্য বিধান হলো, সঠিক মানের বৈদ্যুতিক তার বা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে। ওই লাইন আবার প্রতি ছয় মাস অন্তর পরীক্ষা করতে হবে। তা ছাড়া অগ্নিনিরাপত্তার জন্য ভবন নির্মাণের সময়ও পালন করতে হয় অনেক বিধি-বিধান। যেমন—বহুতল বা বাণিজ্যিক ভবন বানাতে গেলে এখন অগ্নিনির্বাপণ ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ছাড়পত্র লাগে। ওই ছাড়পত্র ছাড়া বহুতল বা বাণিজ্যিক ভবনের নকশা অনুমোদন বা নকশা সংশোধন করা যাবে না। ভবন নির্মাণ শেষে আবারও একই অধিদপ্তর থেকে ব্যবহারযোগ্য সনদ (occupancy certificate) নিতে হবে। তা ছাড়া ভবনে বা ভবনের কোনো অংশ মালগুদাম ও কারখানা হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলে ওই দপ্তরের লাইসেন্স লাগবে। এসব বিধি-বিধানের লঙ্ঘন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

দেশের বেশির ভাগ বাণিজ্যিক বা বহুতল ভবনই একই দোষে দুষ্ট। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকার ৯০ শতাংশ ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে আছে সাড়ে ১১ হাজার ভবন। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা অধিদপ্তর এসব আইনের প্রয়োগ কিংবা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কার্যত সাক্ষী গোপাল বললেই চলে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছেই। প্রতিবারই তদন্ত কমিটি হয়, তদন্তও নাকি হয়। তবে তা আলোর মুখ দেখে না। কয়েক দিন মিডিয়ায় মাতামাতি, একটু আলাপ-আলোচনা, সতর্কতার অনুভূতি, একটু টনক নড়া, তারপর সব শেষ। এই এক বৃত্তেই আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায় প্রায় একই চিত্র, একই সমস্যা। তার পরও সরকারের কোনো প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেই, ভবনগুলোতে অগ্নিঝুঁকি হ্রাসে পূর্বতৎপরতা নেই। কিন্তু কেন? নাকি সরকার বোঝাতে চাচ্ছে, এটাই আমাদের অনিবার্য নিয়তি?

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

[email protected]

মন্তব্য