kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

তোষণ নয়, ক্ষমতায়নের বিস্ময়

বাহার উদ্দিন

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তোষণ নয়, ক্ষমতায়নের বিস্ময়

মহিলাদের অর্ধেক আকাশ, সহধর্মিণী, অর্ধাঙ্গিনী, হোম মিনিস্টার, গৃহকর্ত্রী—এ রকম নানা বিশেষণে ভূষিতভাষিত করতে সমাজ এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করে। এটা তার পুরুষতান্ত্রিকতার সহজার্জিত কপট স্বভাব হতে পারে বা আলংকারিক তোষণের নান্দনিক চেহারা। কিন্তু বাস্তবে বহুস্তরীয় ক্ষমতায়নের পরিসরে আমরা নারীকে কোন চোখে দেখি, তথ্য দিয়ে পরিসংখ্যান পেশ করে তার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। মেয়েরা মায়ের জাত। তারাই পারিবারিক শান্তি ও সংহতির রক্ষক, তাদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থানকে প্রান্তিকতার বাইরে নিয়ে আসা দরকার ইত্যাদি বুলি সাজিয়ে নৃশংস বাস্তবকে ঢেকে রাখি বটে; কিন্তু আমাদের প্রশ্নহীন, গৃহহীন বাস্তবের আড়ালে চেপে রাখা রুচিহীনতা, আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি মেয়েদের সুনয়না ভাবে, সুনয়নে দেখে না। কি উন্নত, কি অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মহিলাদের এক অংশের দারিদ্র্য ও অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে, অর্থোপার্জনের আদিম আর অশালীন পেশার পাষাণ বন্দিশিবিরে, কনসেনটেশন ক্যাম্পে ঠেলে দেওয়া হয়। যেখানে তারা প্রতিদিন দেহ-মনের সব সুন্দরকে বেঁচে থাকার সজল তাগিদে বিক্রি করে দেয়, ‘কান্নার শরীর নিয়ে সারা রাত জাগে, রাত্রির লেপের নিচে কান্নার শরীর করে যায় খেলা।’ (কবি বীরেন চট্টোপাধ্যায়)

জানি না, এই বাধ্যতামূলক কান্না রুখতে মানবসভ্যতাকে কত দিন, কত বছর লড়াই করতে হবে! পুরুষশাসিত সমাজের এ এক জঘন্য কলঙ্ক। এর কবল থেকে নিষ্কৃতির রাস্তা কী? নারীর সার্বিক ক্ষমতায়ন? দারিদ্র্যের অবসান? পুরুষের একক আধিপত্যের সমূল বিনাশ? যা বরাবর জিজ্ঞাসাচিহ্নে, শংসয়ে আচ্ছন্ন। অবরুদ্ধ। অবরোধ কি শুধু এ ক্ষেত্রে? না, মহিলাদের রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণে, আর্থিক স্বাধীনতা উন্মোচনেও সমানভাব প্রযোজ্য।

মূল সমস্যাটি যেহেতু ক্ষমতায়নের পক্ষপাতিত্ব, যেহেতু সংসদীয় গণতন্ত্র আর তার রাজনীতি শুধু প্রতিশ্রুতির বুলিতে সীমাবদ্ধ, সে জন্য এর সহজ সমাধান নানা রকম অনীহা, অজুহাত ও আরোপিত জটিলতায় আকীর্ণ। যেকোনো নির্বাচনের আগে বা সুগঠিত সংসদে, সংসদের বাইরে বিষয়টি যতটা অঙ্গীকারের সুললিত বাণী শোনায়, তৈরি করে মনোহর প্রত্যাশা, ঠিক ততটাই প্রার্থী তালিকায় তার প্রতিচ্ছবি, তার কাহিনি নিষ্প্রভ, হতাশাজনক চিত্র এঁকে দেয়। আবার নারী যেখানে সর্বোচ্চ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রক, সেখানে মেয়েদের ন্যায্য অধিকার ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের আশ্বাসিত স্বপ্ন কখনো কখনো জাগৃতির চেহারা নেয়। এর নিকটতম দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের নারীবিষয়ক রাষ্ট্রীয় ভাবনা আর পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক, সুদূরপ্রসারী, ইতিবাচক চালচিত্র। ঢাকায়, ওখানকার সংসদের অধ্যক্ষ শিরীন শারমিন চৌধুরী আমাদের বলেছিলেন, নারীর ক্ষমতায়নের অভিমুখটিই ‘ইজ দ্য সেন্ট্রাল সাকসেস স্টোরি অব বাংলাদেশ।’ এপারে আমাদের বাংলায়ও এ রকম সাফল্যের বহুমুখী, বেনজির ছবি আজ বিশ্বের চর্চিত বিষয়। লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের এবং সর্বভারতীয় ও বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের প্রার্থী তালিকা খতিয়ে দেখলে বৈষম্যরোধ ও বৈষম্যরক্ষার প্রবণতা পরিষ্কার হয়ে উঠবে। এ ব্যাপারে তৃণমূল ঢাকঢোল পেটায়নি, নিঃশব্দে সবার আগে প্রার্থী মনোনয়নের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে বুঝিয়েছিল—নারীকে, নারীর রাজনৈতিক অধিকারকে উঁচিয়ে ধরতে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলার ৪২ আসনে তৃণমূলের মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা ১৬। অর্থাৎ ৪০.৫ শতাংশ। তাঁরা একক কোনো বা শুধু প্রভাবশালী সমাজের নন, বহুভাষিক, বহুধর্মীয় প্রান্তিক, অপ্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটি একটি রেকর্ড। মেয়েদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের এ এক অদ্বিতীয় বিস্ময়। ইউরোপ থেকে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া থেকে আফ্রিকা, এশিয়ার নানা ভূখণ্ডে এ রকম দুঃসাহস কখনো দেখা যায়নি। দ্বিতীয়ত, প্রার্থী নির্বাচনে তৃণমূল যে অসাম্প্রদায়িক, যে বহুত্ববাদিতাকে গুরুত্ব দিয়েছে, সেটিও চক্ষু উন্মোচনের পক্ষে যথেষ্টের চেয়েও বেশি। তৃতীয়ত, নবীনবরণেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চ্যালেঞ্জ তাঁর দ্রোহী, তাঁর তেজিয়াল দূরদৃষ্টিও অসামান্য। এই যেমন—যাদবপুর লোকসভা আসনে দাঁড় করিয়েছেন অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তী আর বসিরহাটে নুসরত জাহানকে। নুসরতের কথা একটু বলা দরকার। সাবলীল, বাকপটু মহিলা। শতবর্ষের বাংলা সিনেমায় প্রথম মুসলিম অভিনেত্রী। তাঁর ধর্মীয় পরিচয় বা অন্যান্য বিষয়কে দর্শক আমল দেয়নি। বাঙালি ও অভিন্ন ধ্যান-ধারণার পরিচিতি, অভিনয়ের দক্ষতাকে স্বাগত জানিয়ে তাঁরা জাগিয়ে তুলেছেন জনপ্রিয়তার মিনার। বসিরহাটে তাঁর সভায় লাখ লাখ মানুষ, বিশেষ করে মহিলাদের সরব, স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি আমাদের অবাক করে দিচ্ছে। মিমির জনসমাবেশও এ রকম। যেখানে মিমি, সেখানেই সানন্দ উল্লাস। এই দুজন বা বীরভূমের শতাব্দী রায় আর আসানসোলে সুচিত্রাকন্যা মুনমুন সেনের সভা নিয়ে জনোচ্ছ্বাস কী প্রমাণ করে? তাঁরা অভিনয়জগতের সদস্য বলেই বানে ভাসছে জনস্রোত! না, মেয়েদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে তাদের অভিপ্রায় বড় হয়ে উঠছে বলেই নারীর আস্থা ও আত্মবিশ্বাস সম্মুখপানে ছুটছে। এর উত্তর আমরা দেব না। খুঁজব সমাজবিজ্ঞানের কাঙ্ক্ষিত আগ্রহে, একমাত্র ওড়িশা ছাড়া ভারতের বিভিন্ন দলের প্রার্থী তালিকায় মহিলাদের উপস্থিতির গড় হার সন্ধান করে। এখানে শীর্ষে অবশ্যই তৃণমূল। দ্বিতীয় ওড়িশার স্বল্পভাষী মুখ্যমন্ত্রী বিজু পট্টনায়কের বিজেডি, ৩৩ শতাংশ।

ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর উইমেন রিজার্ভেশন বলেছে, ১৫টি দল এ পর্যন্ত ঘোষিত তালিকায় ১৩৬ জন মহিলা প্রার্থী খাড়া করেছে। এ সংখ্যা হয়তো বাড়তে পারে। সর্বভারতীয় দল বিজেপি, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ও বিএসপির মহিলা প্রার্থীর হার যথাক্রমে ১২, ১৩.৭ ও ৮.৩ শতাংশ। পিএস (লোহিয়া) ৭.৯, এসপি ১৭.২, এসএইচএস ৪.৫, দাক্ষিণাত্যের এডিএমকে ৪.৮, ডিএমকে ১০, শারদ পাওয়ারের এনসিপি ১১.১, জেডি (ইউ) ৫.৯, আরজেডি ১৭.৬ এবং টিআরএস ১১.৮ শতাংশ। সবচেয়ে করুণ অবস্থা দাক্ষিণাত্যের এআইএডিএমকের, তাদের মহিলা প্রার্থী নেই। মহারাষ্ট্রের শিবসেনার মাত্র একজন।

সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চের কো-অর্ডিনেটর অর্চনা ঝা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, বেশির ভাগ দল মহিলাদের মাথায় টুপি পরিয়ে রাখে, হাতে তুলে দেয় দলীয় পতাকা। কার্যত, বিশেষ করে টিকিট বিলির মুহূর্তে তাদের সঙ্গে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো আচরণ করে। এ জন্যই আমরা পরবর্তী সরকারকে বলব, অবিলম্বে মহিলা আসন সংরক্ষণ বিল পাস করাতে হবে।

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে, বিজেপি তার সংকল্পপত্রে, প্রচারসভার নিনাদিত ভাষণেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ক্ষমতায় এলে সংসদে, বিভিন্ন প্রদেশের বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিল পাস করবে। ডান-বাম বিভিন্ন দল বিল সমর্থনের অঙ্গীকার জানিয়েছিল। পাঁচ বছরে মোদি সরকার এ ব্যাপারে যে উদাসীনতা দেখাল, তা অভূতপূর্ব। ১৬ জুলাই, বর্ষা অধিবেশনের দুই দিন আগে, কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, সংসদে বিলটি এলে আমার দল নিঃশর্তে সমর্থন করবে। প্রধানমন্ত্রী কেন জানি বিষয়টি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেলেন। কংগ্রেস মুখপাত্র প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী আর বিজেপির নিঃশব্দ মনোভাব প্রমাণ করল, নারীর ক্ষমতায়নের ভাবনা দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসকের আরেক জুমলা, ফলনহীন শূন্য প্রতিশ্রুতি।

প্রতিজ্ঞা আর আশ্বাসের হালকা আওয়াজ, বড় আওয়াজ শুনতে ভারতের গণদেবতা অভ্যস্ত। যে জনরায় নরেন্দ্র মোদিকে ঐতিহাসিক জয় উপহার দিয়েছিল, তাতে ভারতীয় মহিলাদের সমবেত অংশগ্রহণ বিলকুল নগণ্য নয়। কংগ্রেসকেও ভরাট আবেগ দিয়ে একসময় তারা সমর্থন করেছে। উত্তর প্রদেশের মায়াবতীকে কুরসিতে বসিয়েছে। ঠিক একইভাবে ‘নেতাজি’ মোলায়েম সিং ও তাঁর ছেলে অখিলেশ যাবদকে মুখ্যমন্ত্রিত্বের সুখ উপভোগের বুলন্দ দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন ভোটের প্রার্থী তালিকায়, চলতি লোকসভা নির্বাচনের মনোনয়নে এসব দল যে অবজ্ঞা প্রদর্শন করল, তা সমাজের অর্ধেক আকাশকে, নারীর উন্মোচনের ইচ্ছাকেও ঠেলে পাঠাল খাপছাড়া চতুষ্কোণে। এখানেই প্রাদেশিক শক্তি নিয়ে, সবল অভিপ্রায় নিয়ে, অহেতুক বাক্যক্ষয় না করেই প্রার্থী নির্বাচনে অভাবনীয় আলো ছড়ালেন মমতা। সমাজতত্ত্ব আর ইতিহাসের বৃত্ত তাঁর সদিচ্ছার বিস্মৃতি আশা করবে। কেউ কেউ বলছে, তৃণমূলের এও আরেক ‘তুষ্টিকরণের রাজনীতি’ বা অন্য রকম কৌশল। সত্যি কি তাই? আমাদের ধারণা, তোষণ নয়, মেয়েদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে, সাম্য আর সুবিচারের পথ নির্ণয়ে এটি এক বুদ্ধি ও বিবেক তাড়িত বিস্ময়।

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা

[email protected]

মন্তব্য