kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

জিনগত সমস্যা হিমোফিলিয়া

ডা. মো. আশরাফুল হক

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জিনগত সমস্যা হিমোফিলিয়া

রক্ত আমাদের জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয়, প্রত্যেক মানুষের শরীরে রক্ত প্রবাহিত হয় সুনির্দিষ্ট নিয়মে। কোথাও আঘাত পেলে, কেটে গেলে রক্তপাত হওয়াটাই স্বাভাবিক, আবার প্রাকৃতিকভাবে সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়াটাও নিয়ম। তবে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে যাদের ক্ষেত্রে এমনটা হয় না, স্বাভাবিকের চেয়ে অধিক সময় ধরে রক্তপাত হয়। তাদের রক্তে Clotting factor নামক এক ধরনের প্রোটিনের অভাব থাকে। এটি একটি জন্মগত সমস্যা। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে একজন হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে।

কী কারণে এই রোগ হয়?

হিমোফিলিয়া জিনের মধ্যে একটি পরিবর্তন বা পরিবর্তন দ্বারা সৃষ্ট হয়, যা রক্তচাপ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লোটিং ফ্যাক্টর প্রোটিনগুলো তৈরির নির্দেশাবলি সরবরাহ করে। এই পরিবর্তন বা মিউটেশন ক্লোটিং প্রোটিন সঠিকভাবে কাজ করতে বা সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত হতে পারে। এই জিন এক্স ক্রমোজমে অবস্থিত।

সাধারণ নিয়মে মহিলারা এই রোগের বাহক হয় এবং পুরুষের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে মহিলারাও হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এমনকি পারিবারিক ইতিহাস নেই—এমন পরিবারেও এই রোগের আবির্ভাব ঘটতে পারে। 

কী ঘটে এই রোগে?

জয়েন্টের মধ্যে রক্তপাত হয় স্বল্প আঘাতেই। মাংসপেশিতে রক্তপাত হয়ে কালো হয়ে যায়। না জানার কারণে ছোট অপারেশন, যেমন মুসলমানি, কান ফুটো করা, দাঁত ফেলার পর অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হয়। বেশি রক্তক্ষরণ হওয়ার কারণে জয়েন্টের আকার বদলে গিয়ে চলনক্ষমতা হ্রাস পায়। মস্তিষ্কে রক্তপাত হয়ে অল্প বয়সে মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে।

কিভাবে রোগ নিরূপণ সম্ভব?

যাদের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে, যাদের ক্ষেত্রে কম বয়সে এমন অস্বাভাবিক রক্তপাত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাদের দ্রুততার সঙ্গে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা করিয়ে রোগ নিরূপণ করা উচিত। পরীক্ষা করা প্রয়োজন এই কারণেই যে এই রোগ দুই ধরনের, কোন ধরনের যেমন জানা প্রয়োজন, তেমনি জানা প্রয়োজন রোগটি কোন পর্যায়ে আছে। এর ওপর নির্ভর করে একজন কিভাবে চলবে, কোন পর্যায়ে কী চিকিৎসা নেবে ইত্যাদি।

চিকিৎসা কী?

রক্তে যার অভাবে এর উৎপত্তি তার অভাব পূরণ করাই এর লক্ষ্য। তা হতে পারে রক্তের সুনির্দিষ্ট উপাদান পরিসঞ্চালন করা, হতে পারে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি এই ফ্যাক্টর দেওয়া, যা একমাত্র একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই জানেন, হতে পারে নানা ধরনের ওষুধ, যা দিয়ে আপৎকালীন চিকিৎসার কিছু অংশ পূরণ সম্ভব।

রোগ নিয়ন্ত্রণের উপায়

নিয়মিত সুনির্দিষ্ট ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ রাখা, যাতে শরীরের নানা জয়েন্টের বিপদের ঝুঁকি কমে। দ্রুত রক্তপাত বন্ধ করার চিকিৎসা শুরু করা, যেমন ঘরে সব সময় বরফ রাখা, যাতে আঘাত পেলেই তা কাজে লাগানো যায়। যেহেতু প্রয়োজনে রক্ত নেওয়ার দরকার হয়, তাই রক্তবাহিত রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা নিয়মিত করা উচিত। প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন নেওয়া। রোগী চিহ্নিত করার মতো কাগজ বহন করা, বাইরে যাওয়ার সময় যাতে চিকিৎসক বা সেবাদানকারী কেউ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কিভাবে চিকিৎসা শুরু করা অথবা দেওয়া উচিত। কারণ রোগী হয়তো প্রথমেই বিশেষজ্ঞের কাছে নাও পড়তে পারেন।

স্বাভাবিক সর্দি-কাশির মতো হিমোফিলিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। তাই তাদের আলাদা করে লালন-পালন, শিক্ষাদান করা উচিত নয়। তাকে বিশ্বাস করাতে হবে সে অন্য ১০ জনের মতোই, শুধু কিছু ক্ষেত্রে সে অন্য অনেকের মতো সব কিছু অনায়াশেই করে ফেলতে পারে না ঝুঁকি থাকার কারণে। অনেকে সামাজিক বোঝা মনে করে এই রোগের কথা বিয়ের সময়ও জানায় না, ফলে আরেকটি জীবনে ঝুঁকি সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে।

প্রতিবছর ১৭ এপ্রিল হিমোফিলিয়া দিবস পালন করা হয়, যাতে এর গুরুত্ব আমরা আরো ভালো করে বুঝতে পারি। একটি প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়, যাতে আমরা একটি লক্ষ্যে কাজ করতে পারি। এবারের প্রতিপাদ্য হলো—প্রচার, উপযুক্ত চিকিৎসা প্রথম পদক্ষেপ। সঠিকভাবে প্রচার হলে সচেতনতা সহজেই সৃষ্টি সম্ভব, সঙ্গে সঠিক চিকিৎসা কোথায় কিভাবে পাওয়া যায় তা জানা থাকলে চিকিৎসকসহ রোগী সবাই উপকৃত হওয়ার সুযোগ থাকে। রক্তের উপাদান যেহেতু তাদের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে জীবন রক্ষাকারী, তাই রক্তের সেসব উপাদান যাতে সুলভে, জীবাণুমুক্তভাবে এবং সহজেই পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করা সরকার এবং নীতিনির্ধারক সবারই উচিত। স্কুলগামী শিশুদের রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হিমোফিলিয়া আক্রান্তদের চিহ্নিত করে তাদের তালিকা করে স্কুল থেকেই শিক্ষাদান শুরু করা হলে সচেতনতা আরো দ্রুত সময়ের মধ্যে তৈরি সম্ভব। সঙ্গে তাদের একটি হেলথ কার্ডের ব্যবস্থা করা গেলে কোন সময়ে কোন সেবা নেবে, কিভাবে নেবে তার নির্দেশনা সহজেই পাওয়া যায়।

হিমোফিলিয়া নির্মূল করা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বেশ কষ্টসাধ্য। তবে এবারের প্রতিপাদ্যকে লক্ষ্য করে অগ্রসর হলে এর নিয়ন্ত্রণ খুবই সম্ভব।

লেখক : ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

মন্তব্য