kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

আলো ছড়াবে সৈয়দপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

রেজানুর রহমান

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আলো ছড়াবে সৈয়দপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

পৃথক ব্যানার হাতে নিয়ে পরস্পরের শরীর ঘেঁষে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষ। সৈয়দপুর শহরের মূল অংশে যত দূর চোখ যায় শুধু ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা নানা পেশার মানুষকে দেখে মনে হলো শহরটা তারা যেন অদৃশ্য এক মায়ায় জড়িয়ে ধরেছে। প্রতিটি ব্যানারে একই দাবি—সৈয়দপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। ব্যানারের দাবিটাই যেন খটকা লাগার মতো। দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ঘোষণা দিয়েছেন সৈয়দপুরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হবে। সেই অনুযায়ী বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ডও শুরু হয়েছে। তা সত্ত্বেও হঠাৎ বিমানবন্দর দ্রুত বাস্তবায়নের নিমিত্তে শহরে কেন এত বড় মানববন্ধন? খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মাত্র কয়েক দিন আগেই এ শহরেই ক্ষুদ্র পরিসরে পৃথক একটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ওই মানববন্ধন কর্মসূচিতে বসতভিটা ও তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণ করে সৈয়দপুর বিমানবন্দর সম্প্রসারণ না করার দাবি জানানো হয়েছে। এই পক্ষের দাবির শিরোনাম দেখে তাত্ক্ষণিকভাবে আমার যা মনে হয়েছে তা হলো—যার যায় আসলে সে-ই বোঝে তার ক্ষতিটা কেমন! আবার পরক্ষণেই এ কথাও মনে হলো, বৃহৎ স্বার্থের জন্য কাউকে না কাউকে তো ক্ষুদ্র স্বার্থ পরিহার করতেই হয়। এ কথা সবাই মানবে সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে ঘিরে শুধু সৈয়দপুর স্থানীয়ভাবে নয়, গোটা এলাকা অর্থাৎ নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় এলাকাজুড়ে পজিটিভ পরিবর্তনের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে এই বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক রূপ পেলে গোটা এলাকায় উন্নয়ন অগ্রযাত্রার নতুন দুয়ার খুলে যাবে। এই বাস্তবতায় যারা এর বিরুদ্ধাচরণ করছে তাদের মূল উদ্দেশ্যটা আসলে কী? যত দূর জানি, সৈয়দপুরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সরকার তাদের যথাযথভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে বলে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবু কেন এই অস্থিরতা? নাকি বিমানবন্দর সম্প্রসারণকাজে অহেতুক সমস্যা ও সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে কোনো কুচক্রী মহল?

খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ৬ মার্চ ২০১৯ নীলফামারী জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলা ভূমি বরাদ্দ কমিটির এক সভায় সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যাপারে একাধিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় বলা হয়েছে, সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরকরণের লক্ষ্যে বিমানবন্দর সম্প্রসারণ সম্পর্কিত প্রকল্পটিতে কম লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন কোনো বিকল্প জায়গায় বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। প্রস্তাবিত এলাকায় প্রায় এক হাজার ৩০০ পরিবার আছে এবং এসব পরিবারের জনসংখ্যা প্রায় সাত হাজার। তাদের নির্দিষ্ট এলাকায় যথাযথভাবে পুনর্বাসন করতে হবে এবং জীবিকা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে প্রত্যাশী সংস্থার পক্ষ থেকে অঙ্গীকার পাওয়া গেছে।

জেলা ভূমি বরাদ্দ কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এটা পরিষ্কার যে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যাপারে আন্তরিক এবং এ ব্যাপারে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও শুরু হয়েছে। দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ফিল্ডবুক তৈরির কাজও শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, প্রকল্পের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু খাসজমিতে বসবাসরত পরিবারের জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের জমির মালিকানার ব্যাপারে বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই। তাদের পক্ষ নিয়ে কেউ কেউ অহেতুক জটিলতার পরিবেশ তৈরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই জটিলতার অবসান হওয়া জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার যেন সঠিকভাবে ক্ষতিপূরণ পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। মোটকথা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে আন্তরিকভাবে দাঁড়াতে হবে। বিমানবন্দর সম্প্রসারিত হলে নিশ্চয়ই নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জমি অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। আবার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকেও এ কথা ভাবতে হবে কোনো ষড়যন্ত্রকারীর খপ্পরে পড়ে তারা যেন বিভ্রান্ত না হয়। তাহলে সৈয়দপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পটি বাধাগ্রস্ত হবে। যা কারোই কাম্য হওয়া উচিত নয়।

একসময় সৈয়দপুরসহ এ অঞ্চলটি ছিল রেল-কারখানার জন্য বিখ্যাত। রেল-কারখানার অতীত ঐতিহ্য নেই বললেই চলে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে ঘিরে শুধু সৈয়দপুর নয়, নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামসহ গোটা এলাকায় উন্নয়ন অগ্রযাত্রার এক বর্ণিল আলো ছড়িয়ে পড়েছে। সৈয়দপুরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা পেলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নেপাল-ভুটানের সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। গোটা এলাকার জীবন-মানের উন্নয়ন ঘটবে। সম্ভাবনার আলো ছড়িয়ে যাবে পুরো এলাকায়। কারো ভুলে এই আলোর গতি যেন থেমে না যায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই এ কথা ভাবতে অনুরোধ করছি।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার

সম্পাদক আনন্দ আলো

মন্তব্য