kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

প্রবাসে মঙ্গল শোভাযাত্রা

ঊর্মি রহমান

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রবাসে মঙ্গল শোভাযাত্রা

গাছের পাতা ঝিরি ঝিরি আন্দোলিত হতো, ছায়া দিত আর রমনা হ্রদের পানি নিঃশব্দে বয়ে যেত। গাছটাকে আমরা বটগাছই বলতাম, এখনো বলি। পরে শুনেছি সেটা অশ্বত্থগাছ। কিন্তু তাতে কী আসে যায়, সেই গাছ, তার তলার বেদি, হ্রদের পানি আর ভোরের আকাশ, বাতাসে সুর—এসবই ছিল আমাদের ভালোবাসায় মাখা। আমরা এসবের মাঝেই বাংলা নববর্ষকে বরণ করেছি, আজও করি। আমি হয়তো সেখানে নেই। মনটা সেখানেই থাকে। আমি একজন প্রবাসী। আমার জন্ম, বড় হওয়া, লেখাপড়া আর জীবিকার শুরু বাংলাদেশে; কিন্তু বৈবাহিক সূত্রে বর্তমানে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছি। এর আগে লন্ডনে ছিলাম প্রায় তিন দশক। ঢাকায় প্রায় ১২ বছর সাংবাদিকতা করার পর বিলেতে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে যোগ দিতে যাই। লন্ডন বসবাসকালে প্রথম দিকে পহেলা বৈশাখের দিনটা কাটত এক ধরনের মন খারাপ নিয়ে। কিন্তু পরে সে ছবিটা বদলে যায়। সেখানেও বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন শুরু হয়। লন্ডনে বাংলা নববর্ষকে বরণ করা হতো দুইভাবে। ঠিক বৈশাখের দিনটাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো, তার সঙ্গে থাকত বাঙালি খাবার। এরপর যখন আবহাওয়া ভালো ও উষ্ণ হতো, বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকত না তখন বাঙালি অধ্যুষিত এলাকার ব্রিকলেন নামের রাস্তায় ও সংলগ্ন পার্কে বৈশাখী মেলা হতো। সেটা অনেক বছর ধরেই হয়ে আসছে।

 

তারপর বিলাত থেকে অবসর নিয়ে চলে এলাম, সেটাও আমার প্রিয় ঢাকা শহরে নয়, কলকাতায়। এর পেছনে নানা রকম কারণ আছে। সেসব এখানে অবান্তর। কলকাতায় এসে থাকতে শুরু করার প্রথম বেশ কয়েক বছর বাংলা মাসের প্রথম দিনটাতে মনটা বিষণ্ন থাকত। মনেই হতো না সেটা একটা বিশেষ দিন। বাংলাদেশে যেখানে গোটা দেশ আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে, সেখানে কলকাতায় দিনটা কাটত অত্যন্ত সাদামাটাভাবে। ঘরে বসে বন্ধুদের পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তা পড়তাম। হয়তো কোনো আত্মীয়ের বাড়ি রাতে খাবার দাওয়াত থাকত। সেখানেও কিন্তু বাঙালি খাবার নয়, থাকত মিশ্র খাবার, পোলাও, মাংস ইত্যাদি। তখন মনে হতো ছুটে যাই সেই রমনার বটমূলে, ঢাকার সবার সঙ্গে নববর্ষের আনন্দ ভাগ করে নিতে। তারপর একদিন একটি ফোন পেলাম, ‘দিদি, আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রা করব ভাবছি। তাই একটি সভা ডেকেছি। আপনি কি আসবেন?’ গেলাম। সেই থেকে শুরু এক নতুন অধ্যায়ের, এক নতুন পথের, এক আনন্দময় সখ্যের। আমাদের পথ চলা শুরু হলো, আমাদের মানে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা কলকাতা’ নামের সংগঠনের। আমাদের সংগঠনটা অরাজনৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক। আমাদের মূল সুর সম্প্রীতি, সংহতি ও সমন্বয়। আমাদের বুকে আছে বাংলা সংস্কৃতি। শুধু পহেলা বৈশাখে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় আমাদের দায়িত্ব শেষ বলে আমরা মনে করি না। আমরা সারা বছর অনুষ্ঠান করি আর সেটা যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান নয়। আমরা কোনো মনীষী বা বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মতিথি পালন করি না। আমাদের সংগঠন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা কলকাতা’র যে মূল সুর, যে চেতনা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, সেটাকে মনে রেখেই এসব অনুষ্ঠান সাজানো হয়। আমরা ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার ভাষাশহীদ ও মে মাসে বরাক উপত্যকার ভাষাশহীদদের স্মরণ করি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সংকট মুহূর্তে সব সম্প্রদায়কে যে রাখী বন্ধনে বেঁধেছিলেন, সে কথাকে মনে রেখে আমরাও ১৬ অক্টোবর সব সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে রাখী বেঁধেছি। অসমের নাগরিকপঞ্জিতে নাজেহাল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একটা শোভাযাত্রা করেছি, সেখানেও কোনো রাজনীতি ছিল না। ছিল সম্প্রীতির বার্তা, ছিল গান ও কবিতা। আমরা ‘সম্প্রীতির কবিতা, সমন্বয়ের গান’ নামে অনুষ্ঠান করেছি, সেখানেও এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে, ধামাইল গান ও নাচ দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা কলকাতা’ বসন্ত উৎসবের আওতায় এনেছে বিভিন্ন স্কুলের শিশু-কিশোরদের। এ ছাড়া সেসব স্কুলে মুখোশ তৈরির ওয়ার্কশপ করা হয়েছে। আমরা পঞ্চকবির গানের অনুষ্ঠান করেছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সের ও রজনীকান্তের গান সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এবারও নববর্ষে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা  থাকছেই। সেখানে থাকছে বাংলার নানা রকমের উপকরণ, সরা, ডালা, কুলা, ছাতা, বিশাল এক তারা, দণ্ড পুতুল, হাতি ইত্যাদি, যা আমাদের শিল্পীরা তৈরি করেছে। এই শোভাযাত্রায় অংশ নেবে অনেক স্কুলের ছেলে-মেয়েরা। তার সঙ্গে তো থাকছে বিশিষ্ট ব্যক্তি, শিল্পী, সাধারণ মানুষ। এবারের নববর্ষ আরো রঙিন হয়ে চৈত্রাবসানে গাজন উৎসব এবং ৪ বৈশাখ বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড জলের গান ও পশ্চিমবঙ্গের পরিধির মিলিত বৈশাখী উৎসব সোনার বাংলা।

বছরে এক দিনের জন্য যেন আমরা হঠাৎ করে বাঙালি হয়ে না যাই। আমরা সারা বছর নানা অনুষ্ঠানে নিজেদের এবং আমাদের আশপাশের মানুষকে উজ্জীবিত রাখার চেষ্টা করি, যার মূল সুরও বাঙালি সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও সমন্বয়। 

লেখক : সাংবাদিক

মন্তব্য