kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি

হীরেন পণ্ডিত

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি

দুর্নীতি দমনে প্রধান শর্ত হচ্ছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সবার বেলায় আইন সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা উচিত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য তৈরির কথাও বলেছেন অনেকে। দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদকের কাজকর্মে পক্ষপাতিত্বের চিহ্ন ফুটে উঠলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন দুরূহ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দুদককে অবশ্যই স্বাধীন ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তা না হলে এটি একটি সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশে দুর্নীতির বিস্তার  হচ্ছে, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি চাইলে এর মূলোৎপাটন জরুরি। এ জন্য শক্ত হাতে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ও সদিচ্ছা থাকা প্রয়োজন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মিডিয়ার ভূমিকা প্রশংসনীয়। উন্নয়নের জন্য যতগুলো বাধা আছে এগুলোর মধ্যে দুর্নীতি অন্যতম। দুর্নীতি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেও দুর্নীতি রয়েছে। অনেক দেশে সরকার, এমনকি প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছে দুর্নীতির কারণে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উন্নয়নের অভিযাত্রায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে উন্নয়নের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশে কাজ হচ্ছে।

দেশে দুর্নীতির বিস্তৃতি ঘটছে, তাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ সচেতন জনমানুষের অনেকেই উৎকণ্ঠিত। এটি সত্যি যে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা দুর্নীতিতে লিপ্ত না থাকলে তাঁদের অধীন ব্যক্তিরা দুর্নীতি করার সাহস পাবে না। দুর্নীতির মাত্রা পরিমাপের কিছু পদ্ধতি রয়েছে। সেগুলো ব্যবহার করেই জানা সম্ভব একটি দেশ দুর্নীতিগ্রস্ত কি না। বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকেই একটি সম্ভাবনাময় দেশ। কিন্তু দুর্নীতির কারণে আমরা সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারিনি। আজ দুর্নীতির কারণে আমাদের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি যেমন ব্যাহত, একইভাবে অনেকের মধ্য থেকে সততা, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের যে প্রবৃদ্ধি  রয়েছে এর বাইরেও এ কথাটি নির্দ্বিধায় বলা যায় দুর্নীতি না থাকলে প্রবৃদ্ধি আরো বাড়তে পারত। সমাজের ওপর স্তরের ব্যক্তিদের এক বড় অংশ দুর্নীতির মাধ্যমে যে পরিমাণ সম্পদ আহরণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে, এর যদি ব্যত্যয় হতো তাহলে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যেতে পারত। দুর্নীতি না থাকলে বাংলাদেশের চেহারার পরিবর্তন ঘটে হতো এশিয়ার অন্যতম উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র।

বাংলাদেশে দুদক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর তৎপর। দুদক শুধু দুর্নীতি দমনে তৎপর নয়, বরং সামাজিক তৎপরতার মাধ্যমে তারা জনগণকে দুর্নীতি প্রতিরোধে সম্পৃক্ত করছে। দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধি নির্মূল করতে হলে গোটা সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া সবাইকে সম্মিলিতভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে কিছু দুর্নীতিবিরোধী উপাদান সংযোজন করে শিশুদের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে। দুদকের প্রচেষ্টায় এবং সবার সহযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে চিরতরে দুর্নীতি নির্মূলের চেষ্টা করে উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করবে।

কিন্তু পরবর্তী সময় দেখা গেল এ দেশের জনমানুষ আশাহত হয়েছে এবং দুর্নীতির মাত্রার এতটুকুও হ্রাস পায়নি, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর বৃদ্ধি ঘটেছে। নীতিনির্ধারকরা বলেন, অনেক বিষয়ে সফল হলেও দুর্নীতি রোধে আশানুরূপ সফলতা পাওয়া যায়নি। দুর্নীতি রোধে সফলতা না পেলে আমাদের পক্ষে কখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না এ বিষয়ে সংশয় রয়েছে। দুর্নীতি রোধ করতে হলে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবসহ ঊর্ধ্বতন পদে কর্মরতদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তার অধীন বিভাগের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আমরা যে চিত্র পাই তা হতাশাব্যঞ্জক। যেকোনো মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদে আসীন ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর পক্ষে অধীনদের দুর্নীতিমুক্ত থাকার উপদেশ বাণী কোনো কাজে আসবে না।

দুর্নীতি দমনের জন্য সরকারিভাবে দায়িত্ব পালন করে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুর্নীতি বিষয়ে অভিযোগপ্রাপ্ত হলে দুদক তার অধীন কর্মকর্তা দ্বারা তদন্তের ব্যবস্থা করে। তদন্তে বস্তুনিষ্ঠতা পাওয়া গেলে এজাহার দায়ের করা হয় এবং এজাহার দায়ের-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগপত্র দায়ের করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এজাহারে উল্লিখিত আসামির সংখ্যার চেয়ে অভিযোগপত্রে উল্লিখিত আসামির সংখ্যা অনেক বেশি। দুদক কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার সংখ্যানুপাতে সাজার হার খুবই কম এবং যেসব মামলায় এজাহার দায়ের-পরবর্তী তদন্তকালীন এজাহারে উল্লিখিত নয় এমন ব্যক্তির আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্তি ঘটে, তাদের বড় অংশের ক্ষেত্রেই খালাসের ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যায়। দুদকের মামলায় অধিক হারে সাজা নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ন্যায়নিষ্ঠভাবে তদন্তকার্য পরিচালনা করতে হবে এবং এজাহার দায়ের-পরবর্তী শুধু অন্যায়ভাবে প্রত্যাশিত প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ না হওয়ার কারণে নিরপরাধ ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। দুদককে আরো শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারলে আমরা আরো এগিয়ে যাব।

লেখক : প্রাবন্ধিক

[email protected]

মন্তব্য