kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

সিপাহি-জনতার বিপ্লব

এমাজউদ্দীন আহমদ

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



সিপাহি-জনতার বিপ্লব

জিয়াউর রহমান এবং আবু তাহের। মুক্তিযুদ্ধের আগুনে পোড়া দুই খাঁটি সোনা। দেশপ্রেমিক এবং বলিষ্ঠ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে সচকিত এ দেশের দুই কৃতী সন্তান। দুজনই আজ ইতিহাস। দুজনেরই রয়েছে অসংখ্য অনুসারী। কার পথ সঠিক এবং কার পথ বিভ্রান্তিকর, তার বিচার করা শুধু হীনম্মন্যতায় আক্রান্তদের মুখেই শোভা পায়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দুজনেরই রয়েছে অত্যন্ত গৌরবজনক ভূমিকা। এ কথা স্মরণে রেখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁরা কী ভাবতেন, বিশেষ করে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী সম্পর্কে তাঁদের চিন্তা-ভাবনা কেমন ছিল, তার বিবরণসহ ৭ই নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রেক্ষাপট রচনায় তাঁদের ভূমিকার কিঞ্চিৎ আভাস রয়েছে এ লেখায়।

জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন জাতীয়তাবাদী। জাতীয়তাবাদের পরশমণির স্পর্শে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে সোনা ছড়িয়ে তিনি চেয়েছেন বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে। সামাজিক শক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণমুখী করে সচেতন জনগণের মাধ্যম হিসেবে তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাহের কিন্তু বিশ্বাসী ছিলেন আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রে। উৎপাদনের উপাদানগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং বণ্টন ব্যবস্থাকে গণমুখী করে তিনি চেয়েছিলেন সমাজবাদী কল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে জনকল্যাণ বৃদ্ধি করতে। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের (Liberal Democracy) প্রতি একজনের বিশ্বাস ছিল অত্যন্ত দৃঢ় ও মজবুত। অন্যজন কিন্তু উদারনৈতিক গণতন্ত্রকে ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’রূপে চিহ্নিত করে এবং জনকল্যাণের জন্য অর্থহীন মনে করে বিশ্বাস করতেন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশে। জেনারেল জিয়ার গতি তাই নির্ধারিত হয়েছে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও তার আনুষঙ্গিক ক্রিয়াকলাপের দিকে। অন্যজনের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’ (Scientific Socialism) দিকে। সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ও স্বরূপ সম্পর্কেও জিয়াউর রহমান ও আবু তাহেরের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। জিয়ার কাছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও জাতীয় স্বাধীনতা সংরক্ষণের অতন্দ্র প্রহরীরূপেই প্রতিরক্ষা বাহিনী ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠান। জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের মাধ্যমে, বিশেষ করে সৈনিকদের মধ্যে পেশাদারি (Professionalism) বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিকতার আলোকে সমুজ্জ্বল করতে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে দীক্ষা গ্রহণকারী তাহের কিন্তু চেয়েছিলেন মার্ক্সীয় দর্শনের সূত্র অনুযায়ী ‘পুরনো সামরিক বাহিনীকে টুকরো টুকরো করে গুঁড়িয়ে দিয়ে, তারপর (নতুন সমাজের উপযোগী করে) আবার তাকে গড়ে তুলতে।’ উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গির এই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যই ৭ই নভেম্বর বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি করে।

কর্নেল তাহের তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) আন্ডারগ্রাউন্ড সশস্ত্র শাখা বিপ্লবী গণবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশব্যাপী বিপ্লবী শক্তিগুলোর বিকাশ ও বিস্তারে মনোযোগী হন ১৯৭২ সালে প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে অবসরগ্রহণের পর থেকে। বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে তাঁরই নির্দেশে গঠিত হতে থাকে শত শত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, অনেকটা রুশ বিপ্লবের আগের সৈনিক সোভিয়েতের আদলে। দেশে কতগুলো বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গঠিত হয়েছিল তার প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি বটে, কিন্তু ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রংপুর সেনা ছাউনিগুলোতে বহুসংখ্যক সংস্থা গঠিত হয়েছিল। এভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করে জাসদ ও বিপ্লবী গণবাহিনীর কমান্ডার তাহের চেয়েছিলেন দেশে একটি বিপ্লব সংঘটিত করতে যখন সৈনিক ও জনতা একসঙ্গে বিপ্লবের পতাকা উত্তোলন করে সরকারকে পর্যুদস্ত করবে এবং দেশময় এক বিপ্লবী পরিষদ গঠন করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বন্যায় সমাজকে প্লাবিত করবে।

তাহেরের জন্য এই কাজটি সহজ হয়েছিল বিভিন্ন কারণে। এক. তখন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী সংখ্যার নিরিখে শুধু যে ক্ষুদ্রতর ছিল তা-ই নয়, খণ্ড-ছিন্ন ও বিভক্ত ছিল, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত (Repatriates) কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিল এক ধরনের অনতিক্রম্য দূরত্ব। দুই. সরকার কর্তৃক সৃষ্ট জাতীয় রক্ষীবাহিনী এবং এই বাহিনীর প্রতি সরকারের কর্তাব্যক্তিদের সীমাহীন দুর্বলতা প্রতিরক্ষা বাহিনীর নৈতিক মান (esprit de corps) ভীষণভাবে অবনত করে। তিন. কর্নেল তাহের ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল এবং ৪৪ ব্রিগেডের কমান্ডার হিসেবে তাঁর ছিল কৃতিত্বপূর্ণ অর্জন। এসব কারণে তাঁর দর্শন ও নির্দেশনা সাধারণ সৈনিকদের কাছে হয়ে ওঠে গভীর আবেদনপূর্ণ ও আকর্ষণীয়। জাসদের তরুণ নেতৃত্বও ওই সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রতিপক্ষরূপে প্রতিভাত হচ্ছিল এবং সেই আকর্ষণীয় নেতৃত্বের ফলে ১৯৭২ সালের শেষ দিক থেকে সেই সময়ে বিপ্লবী চেতনার বিস্তার ঘটে দ্রুতগতিতে। বিপ্লবী গণবাহিনীতে তাহেরের যোগদান জাসদের সামরিক উইংকে শক্তিশালী করে এবং জাসদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে তাহেরের সামরিক পরিকল্পনাকে দৃঢ়তর করে।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে কর্নেল তাহের খুশি হননি দুটি কারণে। এক. যারা এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে তাদের কোনো মহৎ উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর মতে, সবচেয়ে উত্তম পন্থা হতো জনগণকে প্রতারণার জন্য একটি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিবকে সরিয়ে দেওয়া (‘সমগ্র জনতার মধ্যে আমি প্রকাশিত’-তাহেরের টেস্টিমনি)। দুই. খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার কোনোক্রমে এর গ্রহণযোগ্য বিকল্প ছিল না। ১৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানে, তাঁর মতে, শুধু একটি পরিবর্তন এসেছিল এবং তা ছিল ‘ইন্দো-সোভিয়েত কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছিটকে পড়েছিল আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী গহ্বরে’। তাঁর নিজের কথায়, ‘আগস্ট অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ সিভিলিয়ান একনায়কত্ব থেকে নিমজ্জিত হয়েছিল সামরিক-ব্যুরোক্রেটিক একনায়কত্বের গভীর অন্ধকারে।’

যখন কর্নেল তাহের শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পেয়েছিলেন, তখনই তিনি অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ছুটে গিয়েছিলেন ঢাকা রেডিও স্টেশনে। খন্দকার মোশতাক আহমদও তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কর্নেল তাহের তাঁদের জন্য কয়েকটি সুপারিশ করেছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চারটি : (১) চতুর্থ সংবিধান সংশোধনী আইনের আশু প্রত্যাহার। (২) সব রাজবন্দির মুক্তি দান। (৩) বাকশাল ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি জাতীয় সরকার (National Government) গঠন, এবং (৪) নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণ।

এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পর্যালোচনা করলেও কর্নেল তাহেরের পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্যক জানা সম্ভব। সব রাজবন্দির মুক্তি দেওয়া হলে তখন মুক্তি পেতেন বিভিন্ন জেলখানা থেকে হাজার হাজার জাসদের নেতাকর্মী। জাতীয় সরকার গঠিত হলে ওই সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন জাসদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব হতো জাসদের নেতাকর্মীদের। তেমন হলে তাহেরের পক্ষে সেই সময় বৈপ্লবিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হতে পারত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায়। ৩ নভেম্বরে সংঘটিত অভ্যুত্থানের ফলে দল হিসেবে জাসদের এবং সামরিক নেতা হিসেবে তাহেরের কর্মসূচি ভীষণভাবে ব্যাহত হয় এবং সব দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এও জানা যায়, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীকে বিপ্লবীদের হাত থেকে মুক্ত করা। তাই ৭ই নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে খালেদ মোশাররফকে ‘ইন্দো-সোভিয়েত অক্ষশক্তির এজেন্ট’রূপে চিহ্নিত করে অল্প সময়ে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানকারীদের পর্যুদস্ত করা। ৬ নভেম্বর রাতে কর্নেল তাহেরের সভাপতিত্বে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাগুলোর যে সভা অনুষ্ঠিত হয়, সেই সভায় যেসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তার কয়েকটি ছিল এই : (১) খালেদ মোশাররফকে সদলবলে উৎখাত করা। (২) জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা। (৩) সামরিক বাহিনী-সংক্রান্ত বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য একটি বিপ্লবী সামরিক কমান্ড কাউন্সিল গঠন করা। (৪) দল-মত-নির্বিশেষে সব রাজবন্দিকে মুক্ত করা এবং (৫) বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাগুলোর ১২ দফা দাবি বাস্তবায়ন করা। ১২ দফা দাবির মূল কথা ছিল দেশে শ্রেণিহীন সমাজ গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এক শ্রেণিহীন সামরিক বাহিনী গঠন, যে বাহিনীতে প্রচলিত এলিট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অফিসারদের যে অবস্থান ছিল তার বিলুপ্তি ঘটিয়ে সাধারণ সৈনিকদের ওপর প্রতিরক্ষার সার্বিক ব্যবস্থা অর্পণ। সামরিক বাহিনীতে অফিসারদের আর প্রয়োজন নেই—এই ধারণার বশবর্তী হয়ে একপর্যায়ে বহুসংখ্যক সামরিক কর্মকর্তাকে প্রাণ দিতে হয় সাধারণ সৈনিকদের হাতে। এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬ জন।

জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তখন তাঁদের প্রয়োজন ছিল শুধু খালেদ মোশাররফকে পরাস্ত করার জন্য নয়, ৭ই নভেম্বর বিপ্লবোত্তর পর্যায়ে জাতীয় রাজনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্য। কেননা জাতীয় জীবনের ওই সন্ধিক্ষণে একমাত্র জিয়াউর রহমানের মতো কৃতী সৈনিকই ঐক্যের প্রতীক হিসেবে জাতির সামনে মাথা উঁচু করতে পারতেন। তাহের তাঁকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। ১৯৭৩ সাল থেকে গড়ে ওঠা বিপ্লবী সৈনিকদের সংগঠন এবং তাদের দাবি বাস্তবায়নের মাধ্যম হিসেবে। কিন্তু যার জন্য ইতিহাস নির্দিষ্ট করে রেখেছে বেশ কিছুসংখ্যক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ—বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন, জাতীয়তাবাদী অঙ্গীকারের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, সুষম অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে অপচয়প্রবণ এবং বিশ্বময় প্রত্যাখ্যাত সমাজতন্ত্রের প্রত্যাহার, রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় উদারনৈতিক নীতিমালার প্রবর্তন—তিনি কোনো ব্যক্তি, তা তিনি যতই মহান হোন অথবা কোনো সংগঠন, তা যতই শক্তিশালী হোক তার মাধ্যম হিসেবে কাজ করবেন কেন?

জেনারেল জিয়া ছিলেন একজন খ্যাতনামা সৈনিক। ১৭ বছর বয়সে ১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেন এবং ১৯৫৫ সালে কমিশন লাভ করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে কৃতী যোদ্ধা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টরে তিনি নেতৃত্ব দেন। জেড-ফোর্স (Z-Force) তাঁরই পুণ্য নাম ধারণ করে। বীর-উত্তম অভিধায় জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করে। ১৯৭২ সালে তিনি হন ডেপুটি চিফ অব স্টাফ। ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্টে তিনি হন সামরিক বাহিনীর প্রধান। ৩ নভেম্বর রাত ১টায় তাঁকে খালেদ মোশাররফ বন্দি করেন। ৭ই নভেম্বরের বিপ্লবে তিনি শুধু মুক্তই হলেন না, তিনি এলেন জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে।

কর্নেল তাহেরের পরিকল্পনা কেন সফল হলো না তার পর্যালোচনা এ পরিসরে সম্ভব নয়। সম্ভব নয় জেনারেল জিয়ার সাফল্যের মূলে কোন কোন উপাদান কার্যকর হয়েছিল। শুধু এটুকু বলা প্রয়োজন, ৭ই নভেম্বরের বিপ্লবে জেনারেল জিয়া হয়ে ওঠেন জাতীয় আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। বাকশালবিরোধী চেতনার সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি। আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসের প্রত্যক্ষ নিদর্শন। জিয়া এই সন্ধিক্ষণে সিপাহি-জনতার সামনে দাঁড়ালেন ত্রাতা হিসেবে, নতুন যুগের পথপ্রদর্শক হিসেবে, বাংলাদেশের অধ্যাত্ম সত্তার রূপকার হিসেবে। ৭ই নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব এ কারণে এ জাতির কাছে এক তাৎপর্যপূর্ণ দিন।

কর্নেল তাহেরের স্বপ্ন ছিল, সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠিত করে তাঁর মাধ্যমে সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করা, শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের পূর্ণ সত্তার বিকাশ সাধন করা। জিয়া চেয়েছেন জনগণের মধ্যে আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করে সামাজিক প্রতিবন্ধকতার বিন্ধ্যাচল উল্লঙ্ঘন করতে। পরনির্ভরশীলতার সব বাধা দুমড়ে-মুচড়ে, জাতীয়তাবাদী চেতনার আগুনে সব বৈষম্য ও অনাচার ঝলসে জাতীয় সংহতির মূল সুদৃঢ় করতে। তিনি চেয়েছেন, বাংলাদেশ নিজের ওপর আস্থা রেখে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। বাংলাদেশের জনগণ স্বীয় সত্তায় বিশ্বাসী হয়ে মাথা উঁচু করুক স্বগৌরবে।

৭ই নভেম্বরের বিপ্লবের মৌল সূত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিপ্লবী চেতনা দুই ধারায় ছিল প্রবাহিত। এক খাতে ছিল সমাজ পুনর্গঠনের জন্য বিপ্লবী চিন্তাস্রোত। অন্য খাতে প্রবাহিত হয়েছিল ভারতবিরোধী এবং ভারত-বিদ্বেষী চেতনা। চূড়ান্ত পর্যায়ে ভারতবিরোধী মনোভাব, বিশেষ করে আত্মনির্ভরশীলতার দুর্দমনীয় স্পর্ধাই জয়ী হয় এবং তারই শীর্ষে অবস্থান করেছিলেন জেনারেল জিয়া। এ দেশের রাজনীতির গতিধারায় ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর যা ঘটেছিল, বাংলাদেশের রাজনীতির মৌল প্রকৃতির বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটলে, ৫০ বছর পরেও এমনি অবস্থায় এই সুর ছন্দিত হবে। উচ্চারিত হবে তেমনি বাণী। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই স্রোতের বিপরীতে চললে নিজের বিপদই শুধু ডেকে আনবে তা-ই নয়, সমাজে বিপ্লবের শিখা আবার প্রজ্বালিত করবে।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা