kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

‘আদুরী উদাহরণ হয়ে থাকবে’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘আদুরী উদাহরণ হয়ে থাকবে’

শিশু গৃহকর্মী আদুরীকে নির্যাতন করে মৃত ভেবে ডাস্টবিনে ফেলে আসা গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ঘটনায় এই আদুরী সমাজে একটি ন্যায়বিচারের উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন সিনিয়র সাংবদিক মাহফুজ উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘যেভাবে এই ছোট মেয়েটিকে অমানবিক নির্যাতন করে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, তা সব মানুষের চোখে জল এনে দিয়েছিল। এটাও মানুষ করতে পারে! কারো মধ্যে মনুষ্যত্ব থাকলে সে এভাবে অবুঝ শিশুর ওপর নির্মম নির্যাতন করতে পারে না। এটা আমাদের সমাজের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। কেউ এটি মনে রাখলে আর অন্তত কাজের লোকদের ওপর এভাবে নির্যাতন চালাতে পারবে না।’ মঙ্গলবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে পর্যালোচনাভিত্তিক টক শো ‘নিউজ অ্যান্ড ভিউজে’ আলোচনা করতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

সাংবাদিক ইয়াসির রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো আলোচনা করেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সঞ্চালক জানতে চান, আজকে এমন একটি নির্যাতনের মামলার রায় হলো, যা সারা দেশে মানুষের মধ্যে অন্য রকম আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এখানে আদুরী নামে একটি মেয়েকে রাস্তার পাশে পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় যে মামলা হয় তার বিচার হয়েছে। সবাই এ বিচারে খুুশি। এমনকি নির্যাতিত পরিবারটিও বলেছে, সঠিক বিচার হয়েছে। কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

জবাবে মাহফুজ উল্লাহ বলেন, “আদালতে গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যাবজ্জীবন সাজা ছাড়াও একই সঙ্গে তাঁকে এক লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। ওই অর্থ আদায়ের পর তা নির্যাতিত আদুরীকে দিতে হবে। আর জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে আরো এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে গৃহকর্ত্রী নদীকে। মঙ্গলবার ঢাকার তিন নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার এ রায় দেন। অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় এ মামলায় নদীর মা ইসরাত জাহানকে খালাস দিয়েছেন আদালত। আমরা টিভি মিডিয়ায় দেখেছি, রায়ে রাষ্ট্রপক্ষের পাশাপাশি আদুরী ও তার পরিবার সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। তবে রায় ঘোষণার পরপরই কান্নায় ভেঙে পড়েন নদী। তাঁর আইনজীবী বলেন, ‘ন্যায়বিচার হয়নি, রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। উচ্চ আদালতে আপিল করব।’ রায় ঘোষণা উপলক্ষে এর আগে কারাগারে থাকা নদীকে আদালতে হাজির করা হয়। সাজা পরোয়ানা দিয়ে পরে তাঁকে আবারও কারাগারে পাঠানো হয়। জামিনে থাকা তাঁর মা ইসরাত জাহানও এদিন আদালতে ছিলেন।”

আলোচনার এ পর্যায়ে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম বলেন, ‘যদি আমরা এ ঘটনার একটু আগে যাই তাহলে দেখব, ২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বারিধারা ডিওএইচএসের কাছে রেললাইনের পাশে একটি ডাস্টবিন থেকে আট বছর বয়সী আদুরীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তখন তার শরীরে ছিল নির্যাতনের অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন দিন পর তার জ্ঞান ফেরে। আরো দেড় মাসের চিকিৎসা শেষে তাকে পটুয়াখালী সদর উপজেলার পূর্ব জৈনকাঠী গ্রামে নিজ বাড়িতে নেওয়া হয়। চার বছর আগের সেই নির্যাতনের স্মৃতি এখনো দুঃস্বপ্ন হয়ে কিশোরী আদুরীর ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। এজাহারে গৃহকর্ত্রী নদী, তাঁর মা ইসরাত জাহান, স্বামী সাইফুল ইসলাম মাসুদ ও তাঁদের আত্মীয় সৈয়দ চুন্নু মীর ও মো. রনিকে আসামি করা হয়। হাকিমের কাছে জবানবন্দিতে আদুরী জানায়, নদী তাকে দিনে এক বেলা খেতে দিতেন, তা-ও মুড়ি। মাঝেমধ্যে ভাত দিতেন, তা-ও শুধু লবণ কিংবা মরিচ দিয়ে। থাকতে দিতেন ব্যালকনিতে। আর নির্যাতন চলত অহরহ। প্রায়ই গরম ইস্ত্রি দিয়ে ছেঁঁকা দেওয়া হতো শরীরের বিভিন্ন স্থানে। ব্লেড দিয়ে গাল কেটে একবার সেখানে আগুনও দেওয়া হয়েছিল। মামলায় গ্রেপ্তার হলে ওই বছরের ১ অক্টোবর দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন নদী। এখানে একটি বড় দিক হলো যে এই আদুরীকে মামলা পরিচালনায় সহায়তা করেছে বেসরকারি একটি সংস্থা। তারা এগিয়ে এসেছে। সাংবাদিকরাও অনেক ভালো ভূমিকা রেখেছেন। এর ফলেই একটি সুষ্ঠু বিচার পাওয়া সম্ভব হয়েছে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন। এটা আমাদের সমাজের জন্য একটি দৃষ্টান্ত।’

মন্তব্য