kalerkantho

রবিবার । ৪ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

অভিনন্দন ঋষি সুনাক

ড. ফরিদুল আলম

২৬ অক্টোবর, ২০২২ ০৩:০২ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অভিনন্দন ঋষি সুনাক

ব্রিটেনের ৫৭তম প্রধানমন্ত্রী হলেন ৪২ বছর বয়সের ঋষি সুনাক। ১৮১২ সালের পর ব্রিটেনের সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী তিনি। অনেক জল্পনার অবসান ঘটল। সুনাক প্রথম এশীয় তথা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।

বিজ্ঞাপন

এটা সর্বজনবিদিত যে ব্রিটেনের মতো দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একজন অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির সরকারের শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার মতো অর্জনটি পেতে সুনাককে নিশ্চিতভাবেই তাঁর দল কনজারভেটিভ পার্টির অপরাপর সদস্যের চেয়ে নিজের যোগ্যতাকে বিশেষভাবে প্রমাণ করতে হয়েছে। লিজ ট্রাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের বিশ্লেষণ হচ্ছে এ রকম যে অধিকতর যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু একজন অশ্বেতাঙ্গ এবং নন-ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ব্যক্তিকে ঠেকানোর জন্যই তাঁর পরিবর্তে দলীয় সদস্যরা লিজ ট্রাসকে নির্বাচিত করেছিলেন। মাত্র সাত সপ্তাহ আগে এই পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে লিজ ট্রাসের কাছে পরাজিত হওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল যে সুনাকের আর এই পদে আসা হবে না। ছয় সপ্তাহ ক্ষমতায় থাকার পর লিজ ট্রাসের উচ্চাবিলাসী বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার জেরে দেশের অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে পড়ে। ব্যাপকভাবে সমালোচিত হওয়ার পর অর্থমন্ত্রীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েও নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি ট্রাস। সময় নষ্ট না করে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়াকেই তিনি সমীচীন মনে করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন।
ব্রিটেনের রাজনীতিতে ঋষি সুনাক বিশেষভাবে আলোচিত হয়ে ওঠেন ডেভিড ক্যামেরন সরকারের পর টেরেসা মের মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকারবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুনিয়র মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগলাভের পর। ২০১৫ সালে উত্তর ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ার কাউন্টির রিচমন্ড এলাকা থেকে তিনি প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। মে সরকারের পতনের পর বরিস জনসনের আস্থাভাজন হিসেবে ২০১৯ সালে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিফ সেক্রেটারি নির্বাচিত হন এবং পরের বছর তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাজিদ জাভেদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জনসনের মনোমালিন্যের জেরে সাজিদ পদত্যাগ করলে অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন ঋষি সুনাক। জনসন-সুনাক মিলে করোনার মহামারি থেকে ব্রিটিশ অর্থনীতিকে দারুণভাবে সামাল দিয়ে ঋষি সুনাক নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। যদিও বলা হয়ে থাকে, লকডাউন চলার সময় ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে পার্টিকে কেন্দ্র করে জনসন ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন এবং সেই সমালোচনা থেকে নিজেকে আড়াল করতে অর্থমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন সুনাক, সঙ্গে এটাও ধারণা করা যায় যে দলের ভেতর জনসনবিরোধীদের একটা অংশের সমর্থন পেয়ে আসছিলেন তিনি, আর সেটাকে আরো পোক্ত করতে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন। তিনি মন্ত্রিসভা ছেড়ে আসার পরই মূলত বরিস জনসনের সরকার আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। ওই সময় থেকে তাঁর সঙ্গে জনসনের যে দূরত্ব তৈরি হয়, বলা যায় সেই দূরত্ব লিজ ট্রাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে শেষ মুহূর্তে তাঁকে ছিটকে দিয়েছে। মূলত জনসন সর্বোতভাবে চেয়েছেন সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ বন্ধ করতে। তবে শেষ মুহূর্তে ট্রাসের পদত্যাগ ঘোষণা জনসনের সব হিসাব পাল্টে দেয়।

লিজ ট্রাসের পদত্যাগের পর আবারও নতুন করে আলোচনায় আসেন ঋষি সুনাক। জনসন ওই সময় ক্যারিবিয়ান দ্বীপে অবকাশে ছিলেন। অবকাশ সংক্ষিপ্ত করে সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফিরে আসেন। নতুন করে প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে নিজেকে শামিল করেন। একই সময়ে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেনি মরডান্টও প্রতিযোগিতায় নাম লেখালে দেখা যায় নিজ দলের ১৩৬ জন সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে ঋষি সুনাককে সমর্থন জানিয়ে বসেন, অন্যদিকে জনসন এবং মরডান্টের ক্ষেত্রে এই সমর্থনের সংখ্যা যথাক্রমে ৫৬ এবং ২৩। ব্রিটিশ সংসদে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের ৩৫৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৩৬ জনের প্রকাশ্যে সমর্থন এবং জনসনপন্থী কিছু সংসদ সদস্য সুনাককে সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনা আঁচ করে শেষ সময়ে বরিস জনসন ২২ অক্টোবর রাতে ঋষি সুনাকের সঙ্গে তিন ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে তাঁকে প্রধানমন্ত্রিত্বের লড়াই থেকে সরে আসতে অনুরোধ জানান। সুনাক তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে পরবর্তী সময়ে জনসন নিজেকে প্রার্থিতা থেকে সরিয়ে নেন। ধারণা করা হচ্ছে যে এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে দুজনের মধ্যে হয়তো কিছু একটা সমঝোতা হয়েছে। তবে সেটা কি সরকার গঠন নিয়ে নাকি সামনের নির্বাচনে কিভাবে লেবার পার্টিকে ঠেকাতে দুজন সমন্বিতভাবে কাজও করে যাবেন সেটা নিয়ে, বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। তবে শিগগির এই রহস্যেরও জট খুলবে বলে আশা করা যায়।

ঋষি সুনাক যুক্তরাজ্যের মতো একটি শক্তিধর গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন, বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই ভারত তথা এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য একটি আনন্দের বিষয় এবং সংগত কারণেই তাঁকে নিয়ে আগামী দিনগুলোতে চর্চা হবে অনেক বেশি। বাস্তবতা হচ্ছে, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির এমন এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে তিনি এই পদে আসীন হয়েছেন, যখন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা কোনো আশার কথা শোনাতে পারছেন না। ক্রমাগতভাবে পাউন্ডের দর কমে যাওয়ায় দেশটির মুদ্রাস্ফীতি গত ৪০ বছরের মধ্যে বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত অর্থ সরকারকে অর্জন করতে গেলে জনগণের ওপর অধিক হারে করারোপ করতে হবে। এই মুহূর্তে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই অতিরিক্ত করারোপের কথা চিন্তাও করা যায় না, বরং জনমনে স্বস্তি দিতে কর হ্রাসের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর। লিজ ট্রাস এটি করতে গিয়ে সরকারকে অভ্যন্তরীণভাবে আরো ঋণগ্রস্ত করেছেন, যার দায়ে তাঁকে সরে যেতে হয়েছে। ঋষি সুনাকও আশ্বাস দিয়েছেন কর হ্রাস করবেন। সে ক্ষেত্রে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধিকে তিনি কিভাবে সামাল দেবেন এটি একটি প্রশ্ন। তবে যেহেতু তিনি একজন সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী, সে ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই এমন কোনো বিকল্প ভেবে রেখেছেন, যা কাজে আসতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে নিজ দলের সংসদ সদস্যদের আস্থা অর্জনটা তাঁর জন্য খুব জরুরি।

কঠিন সময়ে এই দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করতে গেলে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে কিছু অপ্রিয় সিদ্ধান্তে আসতে হবে। ঋষি সুনাক একজন ব্রেক্সিটপন্থী নেতা হিসেবে ব্রেক্সিটের সপক্ষে জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে ব্রিটেনের অর্থনীতি নিয়ে তিনি নিজে যতটা আশাবাদী ছিলেন, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এর উল্টো চিত্র। ব্যয় বৃদ্ধি সংকোচন, সেই সঙ্গে কর হ্রাস পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে সম্ভবত তাঁকে সর্বাগ্রে কাজ করতে হবে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিশ্রুত ‘রুয়ান্ডা নীতি’ বাস্তবায়নের দিকে তাঁকে মনোযোগী হতে হবে (এই নীতির আওতায় অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাজ্য থেকে আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় স্থানান্তরের চেষ্টা করছে লন্ডন)। এ ক্ষেত্রে তাঁর সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ, প্রথমত, তিনি নিজে একটি অভিবাসী পরিবারের সন্তান হয়ে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে সবার আগে তিনি ব্রিটিশ এবং ব্রিটেনের জাতীয় স্বার্থে কাজ করাই একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর মূল কাজ, দ্বিতীয়ত, রুয়ান্ডা নীতি বাস্তবায়নের বিষয়টি ইউরোপিয়ান কোর্ট অব হিউম্যান রাইটস কর্তৃক ব্যাপকভাবে সমালোচিত এবং আইনি ঝামেলায় গত ১৪ জুন ব্রিটেন থেকে ৪৭ জন যাত্রী নিয়ে রুয়ান্ডাগামী প্রথম ফ্লাইটটি যেতে পারেনি। এই আইনি জট খুলতে তাঁকে কাজ করতে হবে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে। ঋষি সুনাক তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, দেশের অর্থনীতির গতি ফেরানো একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। একদিকে করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য ফেরানো, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব। গোটা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে মিলে রাশিয়ার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা, ব্রিটেন এর অংশ হলেও এই মুহূর্তে এই যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা তাদের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

সব শেষে ব্রিটেনের রাজনীতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের ভেতর যতই দলীয় কোন্দল থাকুক না কেন, এখন পর্যন্ত বিরোধী লেবার দল যে এর সুবিধা নিয়ে নিজেদের অবস্থানকে খুব একটা সুসংহত করতে পেরেছে—এমনটা দেখা যাচ্ছে না। ব্রিটেনের ইতিহাসে সংক্ষিপ্ততম লিজ ট্রাসের সরকারের পতনের পর তাদের জন্য এই মুহূর্তে এই উপলব্ধিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ যে সংকীর্ণ ব্যক্তিগত ভেদাভেদ ভুলে দল এবং দেশের স্বার্থে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাওয়াটাই মুখ্য। বর্তমান কনজারভেটিভ দল ২০১০ সাল থেকে ক্ষমতাসীন। এই সময়ের মধ্যে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তন হয়েছে, অথচ এর আগে লেবার পার্টির টনি ব্লেয়ার একা ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করেছেন। দলের মধ্যে নেতৃত্বের বিকাশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে ব্যক্তিত্বের কারিশমায় দল অনেক সময় উজ্জীবিত হয়। অবস্থাদৃষ্টে লেবার পার্টি এবং কনজারভেটিভ—এই দুটি দলের ভেতরই বিষয়টি অনুপস্থিত। আপাতত নতুন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাককে অভিনন্দন এবং তাঁর জন্য শুভ কামনা।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।



সাতদিনের সেরা