kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০২২ । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বেঙ্গল ওয়াটার মেশিন : আশাব্যঞ্জক না বিপজ্জনক?

ড. সারা নওরীন   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১১:৪৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বেঙ্গল ওয়াটার মেশিন : আশাব্যঞ্জক না বিপজ্জনক?

বাংলাদেশের বেশ কিছু এলাকায় প্রতিবছর অগভীর জলাধারের (বা অ্যাকুইফারের) পানিস্তর পুনর্ভরণপ্রক্রিয়া (বা রিচার্জ) বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে কৃষিকাজে পাম্প ব্যবহার করার পরও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে না। উঠানামা হলেও শুষ্ক মৌসুম শেষে একই বছরে পানির স্তর পূর্বাবস্থায় বা তার বেশ কাছাকাছি ফিরে আসে।  

সার্বিক চিত্র এমন না হলেও বিশেষত বড় নদী যথা যমুনা ও তার অববাহিকার আশপাশের বেশ কিছু এলাকায় স্বাভাবিক বন্যা, বৃষ্টিপাত ও ভূতাত্ত্বিকগত উপযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ৩০ বছরের (১৯৮৮ থেকে ২০১৮ সালের) তথ্য-উপাত্ত পর্যোলোচনায় এই চিত্র উঠে আসে।

বিজ্ঞাপন

  

দেশজুড়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১২৫০টি অগভীর পর্যবেক্ষণ নলকূপের মাঝে বাছাইকৃত ৪৬৫টির মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ পর্যবেক্ষণ নলকূপে এই ইতিবাচক ফলাফল দেখা গেছে। যেখানে বলা হয়েছে দেড় কোটি কৃষকের অবদানে প্রায় ৭৫-৯০ কিলোমিটার কিউব পানি অতিরিক্ত রিচার্জ সম্ভব হয়েছে, যা কাপ্তাই বাঁধের পানি ধারণক্ষমতার প্রায় ১২ গুণ।  

কৃষকের যন্ত্র দিয়ে অগভীর জলাধার থেকে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের এই অতিরিক্ত রিচার্জ প্রক্রিয়াকে তাই গবেষকরা নাম দিয়েছেন বেঙ্গল ওয়াটার মেশিন। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ পর্যবেক্ষণ নলকূপের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন মাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের হ্রাস এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল প্রবণতা প্রদর্শন করে থাকে।  

উল্লেখ্য, এ গবেষণা শুধু অগভীর নলকূপের তথ্য নিয়েই কাজ করেছে, গভীর জলাধার নিয়ে নয়। এখানে আরো দেখানো হয়েছে যে, যেসব অগভীর জলাধারে আশির দশকের আগে পানি জুন-জুলাইয়ের মাঝেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত আসতে পারত, তার পূর্বাবস্থায় ফেরত আসতে এখন সময় লাগছে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত। আগের চার মাসের স্থলে এখন ছয়-আট মাস লাগছে রিচার্জ হতে। যা কোনো কোনো জায়গায় ১০ মাস পর্যন্ত বর্ধিত হয়। অর্থাৎ আরো দুই-ছয় মাসের মতো অতিরিক্ত লাগছে। অতিরিক্ত পানি উত্তোলন শেষেও একই বছরেই জলাধার পুনর্ভরণের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বেশ আশাব্যঞ্জক। এই ধারণাকে পুঁজি করেই গবেষণার শুরু, ঠিক কতটুকু অতিরিক্ত এই ৩০-৪০ বছরে উত্তোলন-পরবর্তী পুনর্ভরণ সম্ভব হয়েছে, সেটাই প্রতিপাদ্য বিষয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কৃষকের পাম্প করাতে এই (পরিমাপকৃত) অতিরিক্ত রিচার্জ বলতে কী বোঝায়? 

প্রথমেই বলতে হবে, এটা কোনো নতুন ধারণা নয় যে, নদী তীরবর্তী এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্ত পানি পাম্প করা হলে, জলাধারের যে অতিরিক্ত খালি জায়গা (বা সঞ্চয়স্থান) বাড়ে, বর্ষা মৌসুমে তা ভরে উঠবে। এর জন্য ভূপৃষ্ঠ ও ভূতাত্ত্বিক গঠন অনুকূল হওয়া পূর্বশর্ত। প্রথম ১৯৭৫ সালে গঙ্গা অববাহিকার জন্য এভাবে (‘ইনডিউসড’) রিচার্জকে বাড়িয়ে বন্যার পানি হ্রাস করবার সম্ভাবনা/ধারণাটি প্রকাশিত হয়। আমাদের দেশের জন্য যেটা ঘটেছে তা হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিকাজে পানির ব্যবহার বেড়ে অ্যাকুইফারের অতিরিক্ত সঞ্চয়স্থান ক্রমবর্ধমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বর্ষার বৃষ্টি থেকে হোক, ভূপৃষ্ঠের জলাশয় অথবা/এবং বন্যার পানি থেকে হোক অতিরিক্ত মিঠা পানির ক্যাপচার (বা ধরে রাখার ক্ষমতা) বাড়িয়েছে। ঠিক কতটুকু অতিরিক্ত বাড়িয়েছে সেটাকে গণনায় নিয়ে এসে বলতে পারা (৩০ বছরে প্রায় ৭৫-৯০ কিলোমিটার কিউব) হচ্ছে এই কাজের সাফল্য।

এখন প্রশ্ন আসে, আশাব্যঞ্জক না বিপজ্জনক?  
   
বন্যা ও অতিরিক্ত বৃষ্টিতে যখন বাংলাদেশ বিপর্যস্ত, জলবায়ু পরিবর্তন বলছে এই বিপদের মাত্রা বাড়বে। সেখানে অন্তত কিছু সম্ভাবনাময় জায়গা বাংলাদেশে পাওয়া গেছে, যেখানে অতিরিক্ত বর্ষার সুফল পাওয়া যাবে ভূগর্ভস্থ পানির সঞ্চয় বাড়ানো সম্ভব হবে। কেননা ভূপৃষ্ঠে বর্ষার পানি ধরে রাখতে চাইলে বেশ বড় জায়গার প্রয়োজন হয়, টাকা দিয়ে স্ট্রাকচার তৈরি করতে হয়। অপরপক্ষে এসব সম্ভাবনাময় এলাকায় পানি উত্তোলনকে উৎসাহিত করে কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কম খরচে বর্ষার সদ্ব্যবহার সুফল বয়ে আনবে।    

এ গবেষণায় আমরা কিছু সতর্কতা রেখেছি, পানিস্তর স্বাভাবিকতায় ফিরে আসার এ চিত্র পুরো দেশের নয়; বাছাইকৃত অনুকূল পরিবেশবান্ধব বেশ কিছু এলাকার জন্য প্রযোজ্য।  

মনে রাখা জরুরি : (১) যেসব নদের আশপাশের এলাকা প্রতিনিয়ত স্বাভাবিক নিয়মেই বন্যায় প্লাবিত হয় অথবা বৃষ্টিপাতও থাকে স্বাভাবিক/প্রচুর এবং (২) (হলসিন টাইপ) মাটির গঠন এমন অনুকূল যে সহজেই অগভীর জলাধারগুলো ভরে যায়; শুধু সেসব জায়গা থেকেই (৩) অগভীর স্তরে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের এরূপ সুফল ভোগ করা সম্ভব। এমন যদি হয়, অতিরিক্ত পানি উত্তোলনে প্রতিবছর তৈরীকৃত খালি স্থান পূরণ হচ্ছে না, তাহলে বেঙ্গল ওয়াটার মেশিন চলতে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আবার নদীতে পানি মাত্রাতিরিক্ত কমে যাচ্ছে কি না তা-ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হবে।

উল্লেখ্য, এখানে গভীরের ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারকে কখনো উৎসাহিত করা হয়নি। বেঙ্গল ওয়াটার মেশিন দিয়ে বন্যা কতটুকু প্রশমিত হবে বা হতে পারে, এ বিষয়ে এখনো কোনো গবেষণা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি। পানির গুণগত মানের ওপর (যথা আর্সেনিক, লবণক্ততা) এই অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কোনো প্রভাব নিয়েও এখানে কোনো আলোচনা করা হয়নি। অতএব, লবণাক্ততার প্রভাব পড়বে এমন দক্ষিণাঞ্চল, গভীর জলাধারের ওপর নির্ভরশীল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্রসহ মহানগরগুলোর পানিস্তর নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।  

পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত?

কৃষিনির্ভর এ দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চয়তার কথা বিবেচনা করে, আমাদের আরো গভীরভাবে গবেষণা করতে হবে। ভবিষ্যতে আরো দেখা দরকার, বেঙ্গল ওয়াটার মেশিনকে প্রতিনিধিত্বকারী পর্যবেক্ষণ নলকূপের থেকে অল্প দূরত্বের মধ্যে অবস্থানকারী পর্যবেক্ষণ নলকূপগুলো কেন বেঙ্গল ওয়াটার মেশিনসদৃশ আচরণ করছে না। তার কারণগুলো চিহ্নিত করা। একে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে গেলে ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে উপযোগী জলাধার/জায়গা নির্দিষ্টকরত সম্ভাবনাময় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে পরিবেশ উপযোগী মাটিতে পাইলট প্রজেক্টের মাধ্যমে ক্লোজ মনিটরিং করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ নলকূপের সংখ্যা বৃদ্ধি ও রক্ষণাবেক্ষণ অনেক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। যেখানে বেঙ্গল ওয়াটার মেশিন অকার্যকর, সেখানে ভূগর্ভস্থ পানিস্তরে বর্ষার পানির কৃত্রিম পুনর্ভরণপ্রক্রিয়ায় উপকার পাওয়া যেতে পারে।

বিস্তারিত বলা আছে, সদ্যঃপ্রকাশিত ১৫ সেপ্টেম্বরের ‘সায়েন্স’ জার্নালের 'The Bengal Water Machine : Quantified freshwater capture in Bangladesh' -শীর্ষক গবেষণাপত্রে।  
এ কাজের সঙ্গে বুয়েট থেকে আমি ছাড়া আরো জড়িত ছিলেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে মোহাম্মদ শামছুদ্দোহা, সহযোগী অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট ফর রিস্ক অ্যান্ড ডিজাস্টার রিডাকশন; রিচার্ড টেইলর, অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ; ও মো. ইজাজুল হক, ডক্টরাল গবেষক, ভূগোল বিভাগ; বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে ড. আনোয়ার জাহিদ, পরিচালক, গ্রাউন্ড ওয়াটার হাইড্রোলজি সার্কেল; এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালইয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রফেসর ড. কাজী মতিন উদ্দীন আহমেদ। পেপারটি নিম্নলিখিত লিংক থেকে ডাউনলোড করা যাবে https://doi.org/10.1126/science.abm4730 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট, বুয়েট
[ সদ্যঃপ্রকাশিত ‘সায়েন্স’ জার্নালের “The Bengal Water Machine : Quantified freshwater capture in Bangladesh” -শীর্ষক গ্রন্থের একজন সহ-লেখক ] 



সাতদিনের সেরা