kalerkantho

রবিবার । ২ অক্টোবর ২০২২ । ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চিরসুন্দর!

সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৩:০৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চিরসুন্দর!

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় সেই সব নবীনকে চিরসুন্দর বলেছেন, যারা ভেঙে আবার গড়তে জানে। যে ব্রিটিশ শাসনকাঠামোতে তারা বাস করে, তা ভেঙে আবার গড়ে প্রগতির যাত্রী হতে পারে বলেই তারা চিরসুন্দর। মহাকালের প্রেক্ষাপটে দেখলে দেখা যাবে, হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা ঠিক এই কাজটাই করেছেন। বারবার নিজেদের ভেঙে-গড়ে নতুন নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছেন, পুরো পৃথিবীকে তাঁদের করায়ত্তে এনেছেন।

বিজ্ঞাপন

আমাদের যারা প্রতিপক্ষ ছিল, তারা হয় আমাদের বশ মেনেছে, নয়তো এই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বুদ্ধির দিক দিয়ে আমাদের নিকটতম প্রাণী হোমো সোলোনসিস (Soloensis) ৫০ হাজার বছর আগেই এই ধরাধাম ত্যাগ করে। এর কিছুদিন পরই হোমো ডেলিসোভাদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। শেষ যে নিয়ান্ডারটালের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে সেটা আরেকটু পরের, ৩০ হাজার বছর আগের। এর পরও কিছু বামন আকৃতির মানুষ ছিল, তারাও ১২ হাজার বছর আগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আমরা যে টিকে আছি, জগতের যাবতীয় জীব ও জড় পদার্থকে পদানত করতে পেরেছি, তার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে আমরা কখনো নিজেদের পরিবর্তন করে, কখনো বা প্রকৃতিতে পরিবর্তন এনে ক্রমাগত আমাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছি। আমরা ভালো করেই জানি, শুধু উপভোগের জন্য নয়, টিকে থাকার জন্যও আমাদের এই ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে চলমান রাখতে হয় এবং সেটাকে চলমান রাখার অন্যতম চালিকাশক্তি হলো এই অভিযোজন করার মানসিকতা ও দক্ষতা।

তবে আমরা সবাই যে অভিযোজনে সমান সক্ষম, তা নয়। শরীর ও মস্তিষ্কের গঠনের দিক থেকে বর্ণভেদে মানুষে মানুষে পার্থক্য না থাকলেও মানসিকতায় সামান্য পরিবর্তনও অভিযোজন ক্ষমতাকে বাড়াতে-কমাতে পারে, রাজাকে ভিখারি কিংবা ভিখারিকে রাজা বানাতে পারে। এই যে ইউরোপীয়রা একসময় সারা পৃথিবীর রাজা বনে গিয়েছিল, তার মূল কারণ হচ্ছে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য যে মানসিকতা প্রয়োজন, সেটা গত মিলেনিয়ামের মাঝামাঝি এসে তারা অন্য যে কারো চেয়ে অনেক ভালোভাবে অর্জন করে ফেলেছিল।   

ইউরোপীয়দের অগ্রগতি একটু-আধটু শুরু হয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। ১৫০০ থেকে ১৭৫০ সালের মধ্যে তারা আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করে। তার পরও তখন পর্যন্ত এশিয়ার চীন, ভারত, মিসর বা পারস্য সভ্যতার কাছে তারা নস্যি। সেই সময় এশিয়ানরা বিশ্ব অর্থনীতির ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত। ইউরোপীয়রা যে সমুদ্রে কিংবা আমেরিকায় নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে পারল, তার কারণ এশিয়ার শক্তিধর দেশগুলো এদিকে নাক গলানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। ১৭৫০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে ইউরোপ অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯০০ সালের দিকে এসে সেটা খুব শক্ত ভিত্তি পায়। ১৯৫০ সালে যখন পৃথিবীর মোট উৎপদনের বেশির ভাগ পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকায় হচ্ছে, তখন চীনের উৎপদন উল্টো কমে গিয়ে ৫ শতাংশে নেমে আসে।

ইউরোপ যে এভাবে এগিয়ে গেল তার কারণ কিন্তু  শুধু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়। ১৮৫০ সালের আগে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দিক দিয়ে এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। যে প্রযুক্তি দিয়ে ক্যাপ্টেন কুক অস্ট্রেলিয়া দখল করলেন, সেই একই প্রযুক্তি দিয়ে ক্যাপ্টেন ওয়ান জেংসে বা ক্যাপ্টেন হোসেইন পাশা ওই একই কাজ করতে পারতেন। তাঁরা সেটা করেননি। কারণ কৃষির জায়গাটা যে বিজ্ঞান ও বাণিজ্য এসে দখল করে নিচ্ছে, সেটা তাঁরা বুঝতে পারেননি বা বুঝলেও নতুন পরিবর্তনের জন্য যে অভিযোজন সক্ষমতার প্রয়োজন, সেটা তাঁদের ছিল না। ১৮৫০ সালে ইউরোপে যে ৪০ হাজার কিমি রেল রোড তৈরি হয়, সেটা চীনেও হতে পারত, কিন্তু চায়নিজরা তার গুরুত্বই বোঝেনি। ১৮৭৬ সালে ২৫ কিমির একটা রেল রোড তৈরি করলেও পরের বছর তারা সেটা আবার তুলে ফেলে।    

সেই সময় ইউরোপে বিজ্ঞানের যে সামান্য অগ্রগতি হয়েছিল, চাইলে এশিয়ানরা সেটা কিনে বা নকল করে ব্যবহার করতে পারত। সেই সময় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দিক দিয়ে নয়, এশীয়দের সঙ্গে ইউরোপীয়দের পার্থক্য ছিল বিজ্ঞানমনস্কতা ও অভিযোজন সক্ষমতায়। আধুনিক যুগের সেই শুরুর সময়টায় চায়নিজ, ভারতীয়, মুসলিম বা নেটিভ আমেরিকানরাও বিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। অ্যাডাম স্মিথ কিংবা কার্ল মার্ক্স মুসলিম অর্থনীতিবিদদের অবদানে যেমন সমৃদ্ধ হয়েছেন, তেমনি ইংরেজ চিকিৎসাশাস্ত্রও নেটিভ আমেরিকান ডাক্তারদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় উপকৃত হয়েছে।

অর্থাৎ বিজ্ঞানে যে কেউ কারো চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে ছিল তা নয়, পিছিয়ে ছিল সারা পৃথিবী থেকে তা সংগ্রহ করার মানসিকতায়। রোমান, মঙ্গোল বা আজটেকরা হন্যে হয়ে দেশে দেশে শুধু ক্ষমতা ও সম্পদের পেছনে ছুটেছে। কিন্তু ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা তার সঙ্গে জ্ঞান সংগ্রহের বিষয়টাকেও মাথায় রেখেছিল। যেমন নেপোলিয়ন ১৭৯৮ সালে যখন মিসর দখল করেন, তখন তিনি ১৬৫ জন বুদ্ধিজীবীকেও সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন।

এ তো গেল মানব প্রজাতির বা সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের কথা। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ক্ষেত্রেও ওই একই কথা প্রযোজ্য। যেমন—ফটোকপি মেশিন বা ফিল্মের ব্যবসায় একসময় জেরক্স ও কোডাক কম্পানির মনোপলি থাকলেও এখন আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ তারা পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারেনি। এ কারণেই বড় বড় কম্পানির সিইওরা এখন আর তাঁদের কর্মচারী হিসেবে আর ভালো ছাত্র খোঁজেন না, খোঁজেন সৃষ্টিশীল ও অভিযোজনে সক্ষম মানুষদের।

শুধু চাকরির খাতিরে নয়, এখন শুধু একজন মানুষ হিসেবে সত্যিকারের পৃথিবীতে বাঁচতে হলেও আপনাকে অভিযোজনে সক্ষম হতেই হবে। নইলে সোশ্যাল মিডিয়া মিথ্যা ও অপ্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের প্রবল স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে আপনাকে এক অবাস্তব জগতে ডুবিয়ে রাখবে। আপনাকে দিয়ে যা খুশি খাওয়াবে, যা খুশি কেনাবে, যাকে খুশি তাকে ভোট দেওয়াবে, এমনকি আপনাকে দিয়ে সে হয়তো আপনার আত্মহননের কাজটাও করিয়ে নেবে।

ফলে এখন নজরুলের সেই ‘চিরসুন্দর’ না হয়ে আর উপায় নেই। পরিবর্তনের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে হলে কিংবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে লাখ গুণ শক্ত এই প্রযুক্তি শৃঙ্খল ভেঙে নিজেকে গড়তে হলে এই অভিযোজন সক্ষমতা অপরিহার্য।

 লেখক : মাউশি ও নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক



সাতদিনের সেরা