kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

কৃষি খামারে মনকাড়া পর্যটন

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ২৩:২০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কৃষি খামারে মনকাড়া পর্যটন

জাপানের মিয়াজাকী আম আবাদ করে ভালো ফলন পেয়েছেন পটুয়াখালীর কৃষক শাহাবাজ হোসেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাছে গাছে নানা জাতের রং-বেরঙের ফল। আছে বাহারি ফুলের থোকা। বেডের মাটিতে বিছিয়ে আছে বিভিন্ন জাতের শাক। পুকুরে মাছের খলবল।

বিজ্ঞাপন

বাগানজুড়ে পাখপাখালির মাতামাতি,  রঙিন প্রজাপতির ওড়াউড়ি। সেই বাগানের আকর্ষণে প্রতিদিন আসছে শত শত মানুষ। তাদের পদচারণে মুখর চারদিক।


এভাবে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার শৌলা গ্রামকে আলোকিত করেছেন দুই ভাই মো. শাহাবাজ হোসেন খান মিল্টন ও মো. শাহাদৎ হোসেন খান নিউটন। বাগানের নাম নূরজাহান গার্ডেন।

এই নূরজাহান গার্ডেনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে পটুয়াখালী ও ভোলায়। সমন্বিত কৃষির মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি) সম্মাননা ২০২০’ পেয়েছেন মো. শাহাবাজ হোসেন খান মিল্টন।

জানা গেছে, পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের শৌলা গ্রামের ইনজত আলী খান বাড়ির আহম্মদ আলী খানের দুই ছেলে নিউটন ও মিল্টন। কৃষির প্রতি ঝোঁক থেকে ২০০৫ সালে মাত্র এক একর পৈতৃক জমির ওপর শুরু করেন মাছ চাষ ও শাক-সবজির আবাদ। প্রকল্পটি লাভজনক হওয়ায় ওই প্রকল্পের আয়ের সঙ্গে আরো বিনিয়োগ বাড়াতে থাকেন।

বর্তমানে ৪৬ একর জমির ওপর তাঁদের নূরজাহান গার্ডেন প্রকল্পটি। মাছের ঘের হিসেবে পরিচিতি পেলেও পরে তা বাগানবাড়িতে রূপ নেয়। পর্যটকদের আকর্ষণে পরিণত হয়। এখানে আরো আছে মিনি চিড়িয়াখানা। এতে রয়েছে কাকাতুয়া, বিদেশি জাতের মুরগি, লাভবার্ড, খরগোশ, বিভিন্ন জাতের কবুতর। সম্প্রতি দুটি হরিণ ও দুটি ময়ূর রাখার অনুমোদন মিলেছে।

প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থীর আগমন ঘটে নূরজাহান গার্ডেনে। দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা। কৃত্রিম সৌন্দর্য হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে পানির ফোয়ারা, ঝরনা এবং মাটির টিলা। রয়েছে প্রায় ১০০ ইট-পাথরের বাঘ, হরিণ, বক, সারস, ব্যাঙ, ঈগলসহ নানা প্রাণীর মূর্তি। নূরজাহান গার্ডেনকে কেন্দ্র করে আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছে প্রায় দেড় শত পরিবার। একটি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুলের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। স্কুলটি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বাগানে উৎপাদিত ফল, শাক-সবজি ও মাছ বিনা মূল্যে স্থানীয় অভাবী গরিব মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

দেশি-বিদেশি ফল

বাগানে রয়েছে ২২টি পুকুর। এসব পুকুরে চাষ করা হচ্ছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মাছ। বাগানে রোপণ করা হয়েছে দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফলদ গাছ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাপানের বিশ্বখ্যাত মিয়াজাকি বা সূর্যডিম আম। আছে কিং অব চাকাপাত, ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালি, হাড়িভাঙা, ফজলি, ব্যানানা ম্যাংগোসহ নানা জাতের আম।

আছে ভিয়েতনাম, কেরালা, কলম্ব নারিকেলগাছ। এ ছাড়া বিভিন্ন জাতের লেবু, আঙুরগাছ ও ড্রাগনের বাগান। দেশি-বিদেশি মাল্টা, আনার, থাই জাম্বুরা, আমড়া, সিডলেস পেয়ারা, সাদা জাম, ট্যাং ফল, পেস্তা ও কাঠবাদাম। আছে নানাজাতের কলা ও পেঁপের বাগান। স্থানীয় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে এখানে ভাসমান নানা জাতের শাক-সবজির চাষ হয়। বছরে ১০ হেক্টর জমির ওপর খনন করা পুকুরে ২০১৫ সাল থেকে প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার টন মাছ উৎপাদন হয়। এসব উৎপাদিত কৃষিপণ্য স্থানীয় বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হয়।   

এলাকাবাসী যা বলে

বাউফলের কালাইয়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য আবুল হোসেন বলেন, নূরজাহান গার্ডেনের কীর্তি এই এলাকার কৃষি ও কৃষকের জন্য দৃষ্টান্ত। তাঁরা কৃষক না হয়েও কৃষকের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। স্থানীয় হাট-বাজারে অনেক কৃষিপণ্য ও ফলের সংকট দেখা দেয়। কিন্তু তাঁদের এ বাগান গড়ে তোলার ফলে সেই সংকট এখন দূর হয়েছে। শতাধিক নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ অঞ্চলের জন্য একটি সমৃদ্ধশালী অর্থনৈতিক কৃষি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। নূরজাহান গার্ডেন এ উপজেলার একটি পরিচিত নাম এখন। ’

সাবেক ইউপি সদস্য মো. নয়া মিয়া বলেন, এই এলাকার সাধারণ মানুষ এই বাগান হওয়ার আগে ভালো জাতের আম কিনে খেতে পারত না। শাক-সবজি, মাছের অভাবে ভাত খেতে কষ্ট হতো।   

বাউফল উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ‘কৃষিক্ষেত্রে এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক প্রতিষ্ঠান। কৃষকদের নিয়ে মাঠ দিবস কিংবা বিশেষ কোনো আয়োজন থাকলে আমরা নূরজাহান গার্ডেনে আয়োজন করি। কারণ তারা সরেজমিনে ওখানের কৃষির সাফল্য দেখে যেন উদ্বুদ্ধ হয়। তাঁর সমন্বিত কৃষিটি দক্ষিণাঞ্চলের জন্য একটি বড় দৃষ্টান্ত। এ কারণে তিনি ২০২০ সালে এআইপি সম্মানে ভূষিত হন।

মো. শাহাবাজ হোসেন মিল্টন বলেন, ‘আসলে শখ থেকে শুরু এত বড় কিছু হয়ে যাবে তখন চিন্তা করতে পারিনি। কৃষিতে লাভ বেশি শুধু একটু পরিকল্পনা এবং চেষ্টা থাকলে সম্ভব। আর কৃষি যে একজন কৃষককে এআইপির মতো এত বড় সম্মান এনে দিতে পারে তা কখনো চিন্তাই করিনি। তবে আমার এ প্রতিষ্ঠানের পেছনে সাহস জুগিয়েছেন আমার বড় ভাই মো. শাহাদৎ হোসেন নিউটন।



সাতদিনের সেরা