kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাহাঙ্গীর আলমের কৃষি জাদুঘর

যেন কৃষকের বিশ্ববিদ্যালয়

ফরিদুল করিম, নওগাঁ   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১৫:১৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যেন কৃষকের বিশ্ববিদ্যালয়

নওগাঁর কালিগ্রামে জাহাঙ্গীর আলমের কৃষি জাদুঘরে পাঠরত কিষান-কিষানি। ছবি : কালের কণ্ঠ

চারদিকে গাছগাছালিতে ঘেরা বিশাল এক মাটির বাড়ি। আঙিনাসহ বাড়ির চারপাশে রয়েছে অন্তত ২০০ প্রজাতির ফল, ফুল ও ঔষধি গাছ। বাড়ির পাশে এক একর আয়তনের একটি পুকুর। এতে চলছে মাছের চাষ।

বিজ্ঞাপন

কৃষকদের হাতে-কলমে শেখানোর আয়োজন রাখা হয়েছে এখানে। বাড়ির চালার সঙ্গে ঝোলানো রয়েছে গরুর গাড়ির চাকা, ছই, জমিতে সেচ দেওয়ার জোতসহ কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্র।

মাটির বাড়িটির পূর্ব-দক্ষিণ কোণের ঘরে রয়েছে বিশাল লাইব্রেরি। সাত হাজারেরও বেশি বই ও ম্যাগাজিন আছে তাতে। বাইরে বারান্দায় মাথার ওপরে টাঙানো সারা দেশের বিভিন্ন ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতি ও উপকরণ। জাদুঘর কর্নারে রয়েছে বিভিন্ন মডেলের মাথালের সারি আর কৃষিকাজের নানা উপকরণ।

অতীত ঐতিহ্যের ধারক পালকি, দড়ি পাকানোর ঢ্যারা, ঢেঁকি, আম পাড়ার জালি, লাঙল, জোয়াল, মাছ ধরার চাঁই থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ঢঙের কৃষি উপকরণে ঠাসা জাদুঘরটি। জাদুঘরের বাউন্ডারি ওয়াল ঘেঁষে লাগানো আছে বিরল ‘বুদুম’ বাঁশ। চট্টগ্রাম বন গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে কঞ্চি কলম সংগ্রহ করে বাঁশের এ জাত তৈরি করা হয়েছে। চার বছরের পরিচর্যায় এখন বাঁশের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০। আগামী দিনে এই জাত স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

নওগাঁ জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার এবং মান্দা উপজেলা থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে কালিগ্রামে পৈতৃক বাড়িতে জাহাঙ্গীর আলম শাহের এই কৃষিতথ্য ও পাঠাগার বা কৃষি জাদুঘর। কী নেই এই কৃষি জাদুঘরে? স্থানীয় লোকজনের কাছে এটি কৃষকের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে।

নিভৃত পল্লীতে কৃষকদের জাগিয়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের সহকারী শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম শাহ ২০০৮ সালে কৃষিতথ্য ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে নিজের বাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ সংরক্ষণ করেন বসতবাড়ির পশ্চিম ভিটার ঘরে। আশপাশ থেকেও একটু একটু করে সংগ্রহ শুরু করেন কৃষি যন্ত্রপাতি। একসময় তা নেশায় পরিণত হয়। এরপর এলাকা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত উপকরণ যোগ হতে থাকে তার সংগ্রহশালায়।

জাহাঙ্গীর আলম শাহ বলেন, ‘নিজের প্রয়োজনে ২০০৮ সালে পৈতৃক মাটি নির্মিত বাড়িতে কৃষির ওপর লেখা বিভিন্ন ধরনের বই সংগ্রহ শুরু করি। একসময় উপলব্ধি করি, এলাকার চাষিদেরও কৃষিকাজে দক্ষতা বৃদ্ধি ও পরামর্শ প্রয়োজন। এই চেতনাবোধ থেকে লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর দিই। লাইব্রেরি সমৃদ্ধ হলে কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহের নেশা পেয়ে বসে। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়, শুধু মানুষের কল্যাণের জন্য করেছি। ’

প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে এই জাদুঘর। প্রজেক্টরের মাধ্যমে কৃষকদের উপকারী পোকা চেনানো, কৃষিবিষয়ক নানা তথ্য উপস্থাপনসহ পাঠাগারের পক্ষ থেকে সন্ধ্যাবেলায় নিরক্ষর কৃষকদের পড়ালেখা শেখানো হয়। জাদুঘরটি ৫০টি কর্নারে এবং লাইব্রেরি ৭০টি কর্নারে বিভক্ত করা হয়েছে। ছবি কর্নারে রয়েছে কৃষিকাজে অবদান রেখেছেন দেশি-বিদেশি এমন ৪০ জন গুণী ব্যক্তির ছবিসংবলিত নাম ও পরিচয়। ’

এই জাদুঘরে বিভিন্ন ধরনের নিড়ানি, হারিকেন, কুপিবাতি সাজানো রয়েছে থরে থরে। সারির পর সারিতে টাঙানো শাবল, বেলচা, খোন্তা, ওয়াসার, লাফনা ইত্যাদি। রয়েছে কাঠ কাটার জন্য বিভিন্ন ধরনের করাত ও কাস্তের সামাহার। মাটির ঢেলা ভাঙার বিভিন্ন ধরনের হাতুড়ি, লাঙল, ধান ও তেল মাপার পরিমাপক-নিক্তি, কাঠা ও বাঁশের চোঙ। এ ছাড়া আছে হাতে টানা প্রাচীন পাখা, যা এখনো সচল।

এখানে কুল চাষে করণীয়, বীজ উৎপাদনের কৌশল, ফসলের মাঠ নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ওলবীজ বিতরণ ও প্রশিক্ষণ, কলেজ পর্যায়ে বই বিতরণ, ভেজাল সার চেনার উপায় নিয়ে কর্মশালা করা হয়। সেই সঙ্গে জাতীয় কৃষি দিবসে কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য ভালো কৃষক, ভালো হালচাষি, ভালো শ্রমিক, ভালো বীজ প্রস্তুতকারক, ভালো কীটনাশক ছিটানোসহ ১৩টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সদরুল আমিন বলেন, ‘যা শুনেছি ও দেখেছি এখানে পেয়েছি তার চেয়ে অনেক বেশি। ’ এ ধরনের অসংখ্য মন্তব্য, যা সত্যিই অবাক করার মতো।

মান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শায়লা শারমিন বলেন, এটি অসম্ভব ভালো লাগার একটি কৃষি জাদুঘর। যান্ত্রিকীকরণের ভিড়ে বিলুপ্তপ্রায় কৃষি যন্ত্রপাতি এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কৃষির প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করতে জাদুঘরটি সহায়ক হিসেবে কাজে লাগবে। এলাকার কৃষকরা লাইব্রেরিতে এসে বই পড়ে উপকৃত হচ্ছেন। গবেষণার কাজেও শিক্ষার্থীদের কাজে লাগবে জাদুঘর ও লাইব্রেরি। একক প্রচেষ্টায় গ্রামাঞ্চলে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটি মান্দাবাসীর সম্পদ।



সাতদিনের সেরা