kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

পর্যটনে স্থিতিশীল অর্থনীতির বাংলাদেশ

মীর মাহফুজুর রহমান   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১৬:০৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পর্যটনে স্থিতিশীল অর্থনীতির বাংলাদেশ

একটা দেশের অর্থনীতি নির্দিষ্ট একটি খাতের ওপর নির্ভর করে স্থিতিশীল হয় না। আমাদের আমদানি ব্যয় বেশি, রপ্তানি আয় কম। ডলার সংকটে মুহ্যমান অর্থনীতি, বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। আমরা যদি একটু মরিশাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখব, ৮০ এর দশকে টেক্সটাইল খাতে তাদের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

তখন তারা আইএমএফ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিয়ে পরিকল্পনামাফিক দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সেই অর্থ ব্যয় করতে লাগল এবং আশ্চর্যজনকভাবে মরিশাস দশ বছরের মধ্যে পৃথিবীর ধনী, উন্নত এবং আধুনিক সংস্কৃতির দেশে পরিণত হল। মরিশাস টেক্সটাইল দিয়ে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুরু করলেও আজকের আধুনিক ও উন্নত মরিশাসকে বিশ্ববাসী চেনে পৃথিবীর বিখ্যাত ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন হিসাবে। পর্যটন শিল্পের ধারাবাহিক উন্নতি মরিশাসের অন্যান্য শিল্পের উন্নয়নে প্রভাববিস্তার করেছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার দুই পঞ্চমাংশ মানুষ পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ১৩ লক্ষ মানুষের মধ্যে ২.৫ থেকে ৩ লক্ষ মানুষ সরাসরি পর্যটনশিল্পের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মরিশাসের পর্যটনের এই উন্নয়ন মডেলকে বাংলাদেশের পর্যটনের উন্নয়নের মডেলের খুব কাছাকাছি মনে করছি। আমাদের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এতটা হতাশাব্যঞ্জক নয় যা আমরা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে মনে করি। আমি শুরুতেই একটা শব্দ প্রয়োগ করেছি, তা হলো 'পরিকল্পনামাফিক'। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশ যে ধারায় এগিয়েছে তা খুব একটা আশাপ্রদ না হলেও বর্তমান সরকারের আমলে এই শিল্পের বিকাশে সরকারের তাগিদ ও জোর চেষ্টা আমাদের আলোর মুখ দেখাচ্ছে। পর্যটন শিল্প সার্ভিস ওরিয়েন্টেড বিধায় এই শিল্পে বিনিয়োগের হার যেমন কম, তেমনি লাভের হার অনেক বেশি। সেই হিসাবে ব্যবসা চলমান থাকলে লোকসানের ঝুঁকি যৎসামান্য। এখানে শুধু প্রয়োজন পর্যটন আনায়নে একটি সুস্থির পরিবেশ তৈরি করা। সুস্থির পরিবেশ বলতে আমি উল্লেখ করতে চাই, আমার দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ। পর্যটন শিল্পের প্রভূত উন্নয়নে এই বিষয়গুলি নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব বর্তায় শুধুমাত্র সরকারের ওপর। পর্যটনশিল্পের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক সুফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে এই সুস্থিরতার ওপর। এরপর আসে কীভাবে এই শিল্পকে সহজলভ্য ও সহজবোধ্য করার মাধ্যমে পৃথিবীর ১.৪ বিলিয়ন পর্যটককে জানান দেওয়া যে, বাংলাদেশ পর্যটকদের জন্য এক নৈসর্গিক ও আরামদায়ক গন্তব্য।  

সহজলভ্য বলতে আমি বোঝাতে চাই, বাংলাদেশকে পর্যটকদের গন্তব্য হিসাবে আকৃষ্ট করাতে আমরা তাদের ভ্রমণ খরচ কতটা কমাতে পারছি, ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে কীভাবে আমরা তাদের ভ্রমণ সুবিধা বাড়াতে পারি, বাংলাদেশের গুণমুগ্ধ আতিথেয়তায় কীভাবে তাদের বার বার কিংবা তাদের মাধ্যমে নতুন পর্যটকদের এদেশে আগমণে আকৃষ্ট করতে পারি। আর সহজবোধ্য বলতে আমরা বুঝি, সহজ কথায় একটি বিশেষ ট্যাগলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিস্তার অগণিত বৈশ্বিক পর্যটকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। মানে, 'বাংলাদেশ' নামক একটি সুদৃঢ় ব্র্যান্ড। যে ব্রান্ডের নাম শুনলেই পৃথিবীর যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষ মনে করবে বাংলাদেশ একটি ট্যুরিস্ট প্যারাডাইস।  

পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ভূ-রাজনৈতিক কারণে অস্থিতিশীল। জ্বালানি তেলের চাহিদা অনুপাতে জোগান অনেকাংশে কম। অনুন্নত, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভোগান্তি এক্ষেত্রে অনেকাংশে বেশি। বাংলাদেশেও এই অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার ব্যত্যয় ঘটেনি। যেসব শিল্পের বিকাশে লজিস্টিক্যাল সাপোর্টের জোগান দিতে আমদানি-নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়, আমরা যদি এর উল্টো চিত্র দেখি, সেক্ষেত্রে পর্যটন শিল্পের এককালীন অবকাঠামোগত উন্নয়নের পর এর জন্য কোনো আমদানি নির্ভরতা নেই। তাই পর্যটনশিল্প পুরোপুরি রপ্তানি শিল্পের সোপান হিসাবে খুবই কার্যকর।

পর্যটন শিল্প অন্যান্য শিল্পের বিকাশেও প্রভাব বিস্তার করে। কৃষি, আইসিটি, তথ্যসহ বিবিধ খাতে পর্যটনকে সম্পৃক্ত করা যায়। একটি দেশের বিরাজমান শান্তি স্থাপন, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতি পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিশেষভাবে অবদান রাখে। সর্বক্ষেত্রে একটি স্মার্ট বাংলাদেশ হতে পারে পৃথিবীব্যাপী সকল মানুষের এক মনোযোগের আকর্ষণ। আর তখনই বাংলাদেশে কোটি পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হবে।

বারো মাসে তেরো পার্বণের এই দেশে সুপ্রাচীনকাল থেকে যে জাতিগত উৎসবমুখরতা আমরা দেখতে পাই, তার বৈশ্বিক পরিচয় প্রমোট করতে হবে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যাল বা কার্নিভালের মাধ্যমে আমাদের পর্যটনশিল্পকে একটি বিশেষায়িত রূপ দিতে হবে। এই রূপে বাংলাদেশ হবে এক অনিন্দ্য সুন্দর বাংলাদেশ। সেই সুন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও গতিশীল রাখতে আমাদের দরকার টেকসই পর্যটন শিল্প। এই শিল্পের উন্নয়নে আমাদের সঠিক পরিকল্পনা করা উচিত। সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে আমাদের দরকার সর্বস্তরের সকল মানুষের অংশগ্রহণ। তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প হবে পৃথিবীর রোল মডেল।

লখেক: মীর মাহফুজুর রহমান, মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব এমিউজমেন্ট পার্ক অ্যান্ড অ্যাট্রাকশন (বাপা)।



সাতদিনের সেরা