kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

জলবায়ু সংকট নিরসনে ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ কপ’

অনলাইন ডেস্ক   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১৪:৫০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জলবায়ু সংকট নিরসনে ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ কপ’

‘এই বাংলাদেশ ইয়ুথ কপ নিশ্চয়ই জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান খুঁজবে। বাংলাদেশের তরুণরা সমগ্র বিশ্বের কথা ভাবছে, এটি আনন্দের। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা সমাধানে তাদের অংশগ্রহণ জরুরি। আমরা এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন সংকট দেখছি।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বাস্তবে আমরা এখনো এর কোনো টেকসই সমাধান খুঁজে পাইনি। জলবায়ু পরিবর্তন হলো তরুণদের একটি অ্যাজেন্ডা যার সমাধান তরুণদের দ্বারা এবং তরুণদের জন্যই হবে। তরুণদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত সময় এসেছে। তরুণরা জলবায়ু সমস্যা সমাধানের ফ্রন্ট লাইনার হলেও প্রায়শই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের উদ্বেগ প্রতিফলিত হয় না। তবে আমরা তরুণদের কণ্ঠস্বর এবং তাদের সুপারিশগুলোকে কপ সম্মেলনে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করি এবং তাদের সঙ্গে ক্রমান্বয়ে সম্পৃক্ত হচ্ছি’। ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ কপ ২০২২'-এর সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা-৯ আসনের এমপি সাবের হোসেন চৌধুরী এই মন্তব্য করেন।  

বৈশ্বিক স্তরে জলবায়ু আলোচনা এবং তরুণদের কণ্ঠস্বরকে উৎসাহিত করার জন্য অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ এবং ব্রাইটার্স সোসাইটি অব বাংলাদেশ ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর (শনিবার ও রবিবার) যৌথভাবে দুই দিনব্যাপী 'বাংলাদেশ ইয়ুথ কপ ২০২২' শীর্ষক ভার্চুয়াল প্রি-কপ সম্মেলনের আয়োজন করে। এই প্রি-কপ সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণরা ৬ দফা দাবি পেশ করেন। তারা বিশ্বনেতাদের কাছে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে - গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখা, জীবাশ্ম পোড়ানো বন্ধ করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান, উন্নত দেশগুলোর বাসিন্দাদের জলবায়ু রক্ষার দায়িত্ব প্রদান, জলবায়ু পরিবর্তন দ্বারা প্রভাবিত নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করাসহ অভিযোজনের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা।

সম্মেলনে জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও বিশুদ্ধ পানির সংকট বেড়েছে, যার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারীরা। নারীর জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হলে নারী অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, এই দুটি বিষয় পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকা উচিত। গত কপ-২৬ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের নিয়ে বিশেষ আলাপ ও তাদের অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। আগামী সম্মেলনে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ’

আসন্ন কপ সম্মেলনে তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এবং যুব আইকন গ্রেটা থুনবার্গ বিশেষ অতিথি হিসেবে বলেন, ‘এই বিশ্বে ক্ষমতাধর যারা তারাই এটিকে ধ্বংস করছে। গ্লোবাল নর্থের দেশগুলো ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু নিরপেক্ষ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন সীমিত। তারা উদ্যোগী হলে কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তারা অবিলম্বে তাদের নির্গমন কমিয়ে দিত। কিন্তু তারা উদ্যোগী নন, বরং তারা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলো মন্থরগতিতে বাস্তবায়ন করছেন শুধু তাদের নিজস্ব সুবিধা, ব্যবসা এবং অতিরিক্ত মুনাফার জন্য। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যদি আজকের মতো চলতে থাকি, তাহলে কপ-২৭ সম্মেলন তাদের জন্য বিশ্বকে দূষিত করার আরেকটি সুযোগ হবে। আমরা এটি আরো একবার ঘটতে দিতে পারি না। ’

বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে জাতিসংঘের নতুন আবাসিক সমন্বয়কারী জিন লুইস বলেন, ‘আমরা যখন কথা বলছি তখনো জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে। প্রশমন এবং খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রচুর পরিকল্পনা এবং জায়গা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তরুণদের কণ্ঠস্বর যেন প্রতিফলিত ও সমন্বিত হয়। এখন আলোচনার চেয়ে পদক্ষেপ জরুরি। আমাদের জলবায়ু সমস্যা সম্পর্কে অবশ্যই তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে হবে। ’ 

আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিচালক প্রফেসর সালিমুল হক বলেন, ‘‘কপ-২৭ সম্মেলন থেকে বেশি আশা করা ঠিক হবে না। বিশ্বের নেতারা সম্মেলনে একত্রিত হন, কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়; কিন্তু কিছু ছোট উদ্যোগ ছাড়া বড় কোনো পদক্ষেপ নেন না। সুতরাং শুধু কপে  অংশগ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গতকালের জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা আজকের বা আগামীকালের জন্য এক রকম নয়। আমরা ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লস অ্যান্ড ড্যামেজ যুগে প্রবেশ করেছি। আমাদের কপে এ বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। বিশ্বের দূষণকারী দেশগুলোকে অবশ্যই সম্মত হতে হবে এবং দূষণের ভুক্তভোগীদের অর্থ প্রদান করতে হবে। অন্যদের সমর্থন ও সম্পৃক্ত করার জন্য তরুণদের নেতা ও কর্মী হিসেবে কাজ করতে হবে। ’’

সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোয়ালিটি প্রগ্রাম পরিচালক রিফাত বিন সাত্তার বলেন, “আমরা একটি বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থায় বাস করছি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমাজে বৈষম্যও বাড়ছে। সঠিক তথ্য ও বিশ্লেষণের অভাব আমাদের জলবায়ু নীতিতে বিরুপ প্রভাব ফেলে। আমাদের এই শূন্যতা পূরণ করতে হবে। পুরো বাজেট প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। আমরা ইতোমধ্যে ব্যর্থ। তাই নেতৃত্বের প্রশ্নে তরুণদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। ”

উদ্বোধনী অধিবেশনে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব জিয়াউল হাসান বলেন, “যদিও আমরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছি, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় আমাদের স্বার্থ অভিন্ন। যুবসমাজকে এই প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত করতে হবে যাতে তারা তৃণমূল স্তরের জনগণ এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারে। ”

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডক্টর আইনুন নিশাত বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন আজকের সমস্যা নয়; আগামীকালের সমস্যা নয়; পরশুর নয়। ৩০ বছর পরে হয়তো আমরা এখানে থাকব না, তাই এটি আপনারই সমস্যা। সঠিক দিক ও পরিধিতে কাজ করার জন্য তরুণদের সমস্যাটি বুঝতে হবে। বহু ব্যবহার, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্ব্যবহার  এই তিনটি বিষয় নজরে নিয়ে বাংলাদেশে নিঃসরণ হ্রাস এবং প্রশমনে উপকৃত হতে পারে। তরুণরা টেকসই উন্নয়ন এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের মধ্যে যোগসূত্র বোঝে। তারা টেকসই সমাধানের জন্য উদ্ভাবক হিসাবে অগ্রগণ্য হয়ে উঠেছে। ’’

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, “বৈরী আবহাওয়া এবং আকস্মিক জলবায়ু পরিবর্তন তরুণদের ঝুঁকিতে ফেলেছে; তাই, তরুণরা বুঝতে চায় কী ঘটছে, কিভাবে তারা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করতে পারে এবং কিভাবে তাদের কণ্ঠস্বর, তাদের উদ্বেগগুলো কপ-২৭ সম্মেলনে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশে ইয়ুথ কপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। সম্মেলনের মাধ্যমে এবং নীতিনির্ধারক এবং যুব নেতৃত্বের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ স্থাপন, হবে যেখানে একটি সমস্যা উপেক্ষা করা না হয়। ’’



সাতদিনের সেরা