kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সংঘাত নয়, সংযত আচরণই কাম্য

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৩:০৪ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সংঘাত নয়, সংযত আচরণই কাম্য

বিশ্ব এখন এক টালমাটাল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে বিশ্ব চরম মন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রভাবে মানবসভ্যতা ভয়ানক এক হুমকির আশঙ্কার মধ্যে করছে। এই দুই সংকট থেকে পৃথিবীর কোনো দেশ ও জাতি এখন আর বোধ হয় মুক্ত নেই, আমরাও নেই। অর্থনীতিতে আমরা করোনা-পূর্ববর্তী ২০১৯ সাল পর্যন্ত উল্লম্ফনের এক বিস্ময়কর অগ্রগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।

বিজ্ঞাপন

২০২০-২১ সালে বৈশ্বিক করোনা মহামারির প্রভাব আমাদের কাবু করতে পারেনি। অনেক দেশই তখন ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে গিয়েছিল। সেই তুলনায় আমরা অর্থনৈতিক গতি ধরে রাখতে পেরেছিলাম। আমাদের কৃষি অর্থনীতি মানুষের খাদ্যের সংস্থান নিশ্চিত করেছিল। ফলে আমাদের জাতীয় আয় ও প্রবৃদ্ধি অন্য অনেক দেশের তুলনায় বিস্ময়করভাবে অগ্রগামী ছিল। বিশ্বের অনেক সংস্থাই বাংলাদেশের এই অর্জনকে বিশেষভাবে প্রশংসা করেছিল।

দুই বছর করোনা মহামারির অভিঘাত আমরা অনেকটাই সামলে নিতে পেরেছিলাম। চলতি বছরের শুরুতে যখন বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছিল, তখন আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর অগ্রযাত্রায় অনেকের চেয়ে এগিয়ে যেতে থাকি। কিন্তু মার্চ মাসের শেষে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো ভয়ানক এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ঘুরে দাঁড়ানোর মুহূর্তে ভয়ানক বাধার সম্মুখীন হয়। বিশ্ব এখন এমন এক বাণিজ্যব্যবস্থায় জড়িয়ে আছে, যেখানে কোথাও সামান্য কোনো বাধা-বিপত্তি, নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে সারা বিশ্বেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। প্রতিটি দেশই নিজেদের সুবিধামতো দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘ্নে করে আসছে। কিন্তু সেই আমদানি-রপ্তানি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রবাহে হঠাৎ যদি কোনো নিষেধাজ্ঞার মতো জোরজবরদস্তিমূলক কিছু চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে এর অভিঘাত শুধু এক দেশেই নয়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই স্বাভাবিকভাবে পড়তে বাধ্য। গত সাত-আট মাসে মার্কিন ও ইউরোপীয়দের কিছু দেশের তেমন নিষেধাজ্ঞা খোদ ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি ইত্যাদিতে ইউরোপ যেমন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ছিল, সেখানে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ ইউরোপকে কতখানি বিপাকে ফেলেছে, সেটি নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

রাশিয়া একটি সম্পদশালী দেশ। এর ভূখণ্ডও পৃথিবীর প্রায় এক-অষ্টমাংশ। এ ছাড়া উত্তর মেরু পর্যন্ত মহাসমুদ্র এবং পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরেও দেশটির রয়েছে বিরাট সমুদ্রসীমা। এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করার ফলে সারা বিশ্বে জ্বালানি তেল, গ্যাস, খাদ্যশস্য, সার, কাঁচামাল, খনিজ পদার্থ আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকার মানে হচ্ছে সব কিছু অচল হয়ে যাওয়া। বিশ্বে গ্যাস, জ্বালানি তেল, খাদ্যদ্রব্য, জাহাজ পরিবহন, উৎপাদিত পণ্যের কাঁচামালের অভাব এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে অনেক দেশের পক্ষেই ওই সব পণ্য এখন আগের মূল্যে ক্রয় করার মতো অবস্থা নেই। জ্বালানি তেলের সংকটে পৃথিবীর সব দেশ এখন অনেক কিছুই চালাতে পারছে না। চারদিকে সাশ্রয় অবলম্বনের উদ্যোগ দেখতে হচ্ছে। কিন্তু এর ফলে যে অর্থনৈতিক স্থবিরতা নেমে আসছে তা কিভাবে পরিবর্তন করা হবে, সেটি মস্তবড় দুর্ভাবনার বিষয়।

এখন প্রায় সব দেশেই আগের চেয়ে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। মানুষ ব্যাপক খাদ্যসংকটে পড়েছে। যুক্তরাজ্যের মতো দেশ ভয়াবহ সংকট অতিক্রম করছে। আমাদের দেশ বেশ কিছু ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর হওয়ায় আমরা পড়েছি খুব বিপাকে। ভোজ্য তেল নিয়ে আমরা এ বছর কয়েকবারই দামের ওঠা-নামায় চরম অস্বস্তিতে পড়েছি। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে আমাদের এলপিজিসহ বেশ কিছু জ্বালানি পণ্য আমদানি হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণভাবে মূল্যবৃদ্ধি ঘটাতে হয়েছে। ফলে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিতে সরকার বাধ্য হয়েছে। এর ফলে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। জনজীবনেও লোড শেডিংয়ের তীব্র প্রভাব পড়েছে, অর্থনৈতিকভাবে দেশ বড় ধরনের চাপে পড়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গোটা বিশ্ব এখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময়ের এক কৃত্রিম সংকটে নাকাল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতেই এখন মারাত্মক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করছে।

অন্যদিকে জলবায়ুর পরিবর্তনে বিশ্ব এখন আরেক মহাসংকট অতিক্রম করছে। গোটা ইউরোপ এখন উষ্ণায়নের সংকটে যেভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, তাতে বেশির ভাগ দেশেই খাদ্যসংকট আরো ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা তীব্রতর হয়েছে। প্রাচ্যের দেশ চীন, জাপান, কোরিয়া এবং সুদূরের অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকা মহাদেশ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই এখন তীব্র খরায় ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। আবার পাকিস্তান, আফগানিস্তান, চীনের কিছু অংশ ব্যাপক বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় প্লাবিত হওয়া ভূখণ্ডের অংশ খুব বেশি নয়। কিন্তু বৃষ্টিপাত না হওয়া অঞ্চল পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমাদের দেশে ভাদ্র মাস চলে যাচ্ছে। কিন্তু বর্ষাকাল নেই, বৃষ্টিও সেভাবে নেই। ফলে শত বছরের ঐতিহ্য অনুযায়ী আমন ধান রোপণ বা ফলনের ব্যবস্থাটি এবার অনেক অঞ্চলেই ব্যাহত হয়েছে। এই বর্ষাকালে কৃষক বাধ্য হচ্ছেন নদী ও খাল থেকে পানি সেচ দিয়ে কৃষিকাজ করতে। এর মধ্যে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি, সারেরও মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে কৃষি উৎপাদন কতটা নিশ্চিতভাবে করা যাবে তেমনটি যেমন বলা কঠিন, আবার বৃষ্টি যদি শেষ মৌসুমে ঝেঁপে আসে, তাহলে কৃষকের এই ফসল তলিয়ে যেতে পারে। কৃষক এই মুহূর্তে বড়ই দুশ্চিন্তায় জীবন কাটাচ্ছেন। এমন দৃশ্য কেউ কখনো আগে দেখেনি, জলবায়ুর এমন আচরণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে। পানি শুকিয়ে যাচ্ছে, মাছ চাষও করা যাচ্ছে না। ফলে মৎস্যসম্পদের চাহিদা পূরণ করা যাবে কিভাবে? পশুসম্পদও পড়তে যাচ্ছে খাদ্যের সংকটে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। বৃষ্টির অভাব, মাটিতে পলির অভাব, অন্যদিকে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জলবায়ুর এই বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় আগামী দিনের অস্তিত্ব নিয়ে চরম এক আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বছরটি শেষ পর্যন্ত কিভাবে শেষ হবে তা কারো জানা নেই। তবে আগের চেয়ে প্রান্তিক ও নিম্নমধ্যবিত্তের মানুষজন অর্থনৈতিকভাবে বেশ কিছুটা টানাটানিতে আছে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। বাজার অস্থিতিশীল, দ্রব্যমূল্যের লাগাম কিছুতেই টেনে ধরা যাচ্ছে না। পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সব মানুষেরই সীমিত আয়ে খরচ কমানোর কোনো বিকল্প নেই। সরকার নানাভাবে প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টাও করছে। কিন্তু সবাইকে সেই প্রণোদনার আওতায় আনা যাবে কি না তা বলা কঠিন।

এমন বৈশ্বিক, প্রাকৃতিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে আমাদের অবশ্যই সংযত আচরণ করতে হবে। রাজনীতিতে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কিছু সংঘাত-সংঘর্ষের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিএনপি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে আন্দোলন করার চেষ্টা করছে। দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির প্রবণতার বৈশ্বিক কারণ ও বাস্তবতা যেমন রয়েছে, একইভাবে দেশের অভ্যন্তরে বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা, লুম্পেন প্রবণতাকেও অস্বীকার করা যাবে না। সুতরাং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রবণতাকে যুক্তিসংগত পর্যায়ে আনা গেলে মানুষের স্বস্তির একটি জায়গা তৈরি হবে। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের বর্তমান ঊর্ধ্বগতি নিয়ে দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ততটা সফল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে এখন বৈশ্বিক ও প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ের বিষয়গুলো অনেকটাই জানা।

সুতরাং এই ইস্যুতে সরকার পতনের আন্দোলন চূড়ান্ত কোনো রূপ পাবে না। প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার কিছু অংশ সরকার লাঘব করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সরকার দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বরং অপেক্ষাকৃত গরিব এবং দুস্থ ও বঞ্চিত মানুষের পাশে সরকারি সাহায্যের হাত আরো বাড়িয়ে দেওয়ার কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকা দরকার। বিরোধী দলের কর্মসূচির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দলের নেতাকর্মীদের মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করার যে নির্দেশ দিয়েছেন—সেটিই সবচেয়ে উত্তম পরামর্শ। এই মুহূর্তে সংঘাত বাড়িয়ে রাজনীতিতে কেউ সুবিধা করতে পারবে না, বরং সংযত আচরণের মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করাই হবে সবচেয়ে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক কাজ।   

 লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা