kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

কলাপাতায় লিখতেন, পাহাড়চূড়ায় সেই তিনিই গড়ে তুলেছেন পাঠাগার

ম্রো ভাষার প্রথম লেখক ইয়াংঙান ম্রো। গেল ফেব্রুয়ারিতে তাঁর জীবনযুদ্ধের গল্প ছাপা হয়েছিল অবসরে পাতায়। এবার তিনি চিম্বুক পাহাড়ের চূড়ায় গড়েছেন স্বপ্নের পাঠাগার। চিম্বুকের বুকে প্রথম পাঠাগার এটি। এই পাঠাগার গড়ার পেছনের গল্প শুনিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

অনলাইন ডেস্ক   

৯ আগস্ট, ২০২২ ১৫:৫৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কলাপাতায় লিখতেন, পাহাড়চূড়ায় সেই তিনিই গড়ে তুলেছেন পাঠাগার

উদ্বোধনী দিনে সাংচিয়া তেকরা-সাংচিয়া শোনতারা কিম পাঠাগারে পাঠকরা। ছবি : সংগৃহীত

খুব অভাব ছিল আমাদের। প্রায় দিনই জঙ্গলের আলু, কলাগাছ খেতাম। তিন বেলা ভাত খেতে পারাটাই ছিল বিলাসিতা। ভাত রান্না হলে ঘরে উৎসবের আমেজ পড়ে যেত।

বিজ্ঞাপন

কাগজ কেনার টাকা ছিল না বলে কলাপাতায় লিখতাম।

ছেলেবেলায় ছুটির দিনে বয়স্কদের কাছ থেকে ম্রো রূপকথার গল্প শুনতে যেতাম। গল্পকাররা প্রতিবার গল্প শুরুর আগে সেদিন কে কী ভালো কাজ করলাম, তা জিজ্ঞেস করতেন। ভালো কাজ বলতে ঝিরি থেকে বয়স্কদের পানি তুলতে সাহায্য করা, মহিলারা জঙ্গল থেকে লাকড়ি নিয়ে এলে তাদের ঝুড়ি নামাতে সাহায্য করা, ছোট ছোট ছেলে-মেয়েকে গরু ও কুকুরের হাত থেকে দূরে রাখা, গাছ থেকে ফল পেড়ে নারী, শিশু ও বয়স্কদের খাওয়ানো, জঙ্গল থেকে পানপাতা সংগ্রহ করে বৃদ্ধদের দেওয়া, প্রতিবন্ধীদের সাহায্য করা ইত্যাদি। আমাদের মধ্যে যে ওই দিন বেশি ভালো কাজ করত, গল্পকার তার বেশি প্রশংসা করতেন। আর গল্প বলার সময় ছেলেটিকে একেবারে কাছে বসাতেন। এক দুপুরে ঘরের পাশে খেলছিলাম। হঠাৎ চিৎকার শুনলাম। আমাদের পাশের ঘর থেকে আওয়াজ আসছে। গিয়ে দেখি অনেক ধোঁয়া। উনুন থেকে আগুন ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। আর বৃদ্ধ মহিলা অন্ধ বলে কোথায় যাবেন বুঝতে না পেরে শুধু চিৎকার করতে লাগলেন। আমরা কয়েকজন কাপড় ভিজিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। এটি করতে গিয়ে আমার এবং আমার বন্ধুর পা ও হাত সামান্য পুড়ে পরে ফোসকা পড়ে গেল। রাতে মা-বাবা জুম থেকে ফিরে ঘটনা শুনে খুশি হলেন। বললেন, জীবনে এভাবে মানুষের উপকার করবে। নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষার চেষ্টা করবে। গল্পকাররাও বাহবা দিলেন। বললেন, যদি সম্ভব হয় জুমের জায়গায় একটি ঘর করবে। তোমাদের দায়িত্ব হলো আমাদের বলা গল্পগুলো মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া।

যা হোক, একদিন বাবা আমাকে ম্রো আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সেখানে হঠাৎ করেই বাংলার মুখোমুখি হলাম। অথচ গ্রামে কেউ বাংলা বলত না। ক্লাসের স্যাররা কী বলেছেন কিছুই বুঝতাম না। ভাবতাম, একটি পাঠাগার থাকলে সেখান থেকে বই নিয়ে পড়তে পারতাম। তাহলে হয়তো স্যারদের কথা কিছুটা হলেও বুঝতাম। তাই ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পাঠাগার গড়ার। ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম প্রাচ্য ভাষা বিভাগে। ক্যাম্পাসে চলার মতো টাকা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেক চেষ্টা করেছি গ্রামে পাঠাগার গড়ার। কিন্তু নিজের চলাই যেখানে দায়, সেখানে পাঠাগারের স্বপ্ন দেখা বিলাসিতা! পড়াশোনা শেষে সবাই চাকরিবাকরির পেছনে ছুটছে। আমি চেয়েছি মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে। ফলে গতানুগতিক চাকরিবাকরির দিকে পা বাড়াইনি।


২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ অবসরের সেই প্রতিবেদন

চিম্বুক পাহাড়ে ফলের বাগান করেছি। চেষ্টা করছি নিজে স্বাবলম্বী হয়ে ম্রো জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াতে। বাগান করার পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে ঘুরে ম্রোদের রূপকথার গল্প, রীতিনীতিসহ আরো অনেক কিছু সংগ্রহ করতে লাগলাম। এ পর্যন্ত ম্রো সমাজ ও রূপকথার গল্প নিয়ে আমার লেখা ২৯টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ম্রো ভাষায় ১৯টি এবং ১০টি বাংলায় লেখা। ম্রো ভাষার প্রথম ব্যাকরণ বই ‘ততোং’ও আমার লেখা। আমার জীবনযুদ্ধের গল্প নিয়ে গেল ২২ ফেব্রুয়ারি কালের কণ্ঠের অবসরে পাতায় একটি ফিচার ছাপা হয়েছিল। শিরোনাম ‘দুর্গম পাহাড়ে ইয়াংঙানের আলো’। লেখাটি পড়ে দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই ফোন করেছেন। তখন মনে হলো, আমার দায়িত্ব আরো বেড়ে গেছে, ছেলেবেলার স্বপ্নটি পূরণের এটিই বোধ হয় সবচেয়ে ভালো সময়।

বান্দরবান জেলা সদর থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে বান্দরবান-চিম্বুক-থানচি সড়কের পাশেই রামরিপাড়া। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই পাড়ার এক পাশে রামরিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আরেক পাশে ভাইট্যাপাড়া, চিম্বুক বাগানপাড়া ও যামিনিপাড়া। এখানে ম্রোদের বাস। রামরিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই একটি জায়গায় পাঠাগার করার উদ্যোগ নিলাম। জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার ৫০০ ফুট উঁচুতে। প্রথমে পাঠাগারের জন্য বাগানের বাঁশ-গাছ কাটলাম। পরে আমি আর আরেকটি ছেলে মিলে দুই রুমের একটি জুমঘর বানালাম। গত ৫ আগস্ট সেখানেই বুনলাম আমার স্বপ্নের বীজ। নাম ‘সাংচিয়া তেকরা-সাংচিয়া শোনতারা কিম’। মানে গল্প বলা, গল্প শোনার ঘর। চিম্বুক পাহাড়ের চূড়ায় প্রথম পাঠাগার এটি। ছড়া, গল্প, কবিতা, উপন্যাস মিলিয়ে পাঠাগারে এখন এক শর কাছাকাছি বই আছে। আমার তো চাকরিবাকরিও নেই, একসঙ্গে বেশি বই কেনারও সামর্থ্য নেই। নিজের যেটুকু আছে, তা দিয়েই শুরু করেছি। আমার লেখা বই বিক্রির টাকায় পাঠাগারের জন্য নতুন বই কিনব। এরই মধ্যে রোয়াংছড়ি সরকারি কলেজের শিক্ষক অমর বিকাশ তঞ্চঙ্গ্যা কিছু বই দিয়েছেন। দুই রুমের এই পাঠাগারে কেউ চাইলে থাকতেও পারবে। চেষ্টা করেছি ম্রো শিশুদের গল্পের মাধ্যমে নিজেদের সংস্কৃতির কথা কিছুটা হলেও শিক্ষা দেওয়ার জন্য।

আমাদের পূর্বপুরুষদের বলা গল্পগুলো ওদের শোনাব। ছোট পরিসরে শুরু করেছি, কিন্তু পাঠাগার নিয়ে আমার স্বপ্ন অনেক বড়।



সাতদিনের সেরা