kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

এ জাতীয় হামলার ঘটনা সাদা চোখে দেখলে হবে না

লায়েকুজ্জামান   

৩ জুলাই, ২০২২ ১৯:৫৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এ জাতীয় হামলার ঘটনা সাদা চোখে দেখলে হবে না

মুন্সীগঞ্জের বিজ্ঞানবিষয়ক শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের কথা নিশ্চয় মনে আছে! চলতি বছর এপ্রিল মাসের ঘটনা। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে তারই ছাত্রদের লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমনানার মামলা করেছিলেন স্কুলের ইলেকট্রিশিয়ান। সে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

মামলার বাদী ইলেকট্রিশয়ানকে এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল কিভাবে ধর্ম অবমাননা করেছেন? তিনি আসলে ধর্মের বিরুদ্ধে কী বলেছিলেন? জবাবে ইলেকট্রিশিয়ান বলেছিলেন, 'আমি সেদিন স্কুলেই ছিলাম না, ওই সব কিছু জানি না। হেডস্যার মামলা করতে বলেছেন তাই করেছি। ' 

প্রিয় পাঠক, এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের হত্যাকারীর সেই বিখ্যাত উক্তি―আদালতের বিচারক হত্যাকারীর কাছে জানতে চাইলেন, 'তুমি কী কারণে আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করলে?' হত্যাকারী জবাব দিল, 'আনোয়ার সাদাত দেশটাকে সেক্যুলার বানাতে চেয়েছিল। ' বিচারক আবার প্রশ্ন করলেন, 'সেক্যুলার মানে কী?' হত্যাকারী জবাব দিল, 'তা আমি জানি না। ' যুগে যুগে এভাবেই কতিপয় জ্ঞানপাপী, ধর্ম ব্যবসায়ী মূর্খ লোকদের দিয়ে ধর্মের নামে অপকর্মগুলো ঘটিয়ে থাকে। এরা সাধারণ ধর্মপ্রাণ-ধর্মভীরু মানুষগুলোর অনুভূতিকে ব্যবহার করে, নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে।  

বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলের একটি ঘটনা বলি। ঘটনাটি রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার। পাংশা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ পদটি পাওয়ার জন্য ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিল। সে সময় ওই এলাকার বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যোর ভাই কলেজ অধ্যক্ষের পদটি দখল করতে চান। সে জন্য বাধা ছিলেন একজন সংখ্যালঘু শিক্ষক। ওই সংখ্যালঘু শিক্ষক ছিলেন এমপির ভাইয়ের চেয়ে সিনিয়র। সিনিয়র সংখ্যালঘু শিক্ষক কলেজে টিকে থাকলে বিধান অনুসারে তিনিই পরবর্তী অধ্যক্ষ হবেন। সংখ্যালঘু শিক্ষক ছিলেন একজন দার্শনিক, উচ্চ নৈতিকতার মানুষ। এমপির ভাই কলেজের ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের তার বাসায় ডাকলেন, অপ্যায়ন করলেন। আসার সময় কানে কানে পড়িয়ে দিলেন ওই সংখ্যালঘু শিক্ষক ইসলাম ধর্মের অমাননা করেছেন বলে কলেজে একটি মিছিল করতে হবে এবং এটাকে পাংশা উপজেলা এলাকায় ছড়িয়ে দিতে হবে। ছাত্রদলের ক্যাডাররা সফলভাবে কাজটি করতে পেরেছিল। শেষ পর্যন্ত জীবন বাঁচাতে চাকরি ছেড়ে এলাকা ছাড়তে হয় ওই সংখ্যালঘু শিক্ষককে। এরপর যা ঘটার সেটাই ঘটেছিল।  এমপির ভাই নির্বিঘ্নে কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে গেলেন। সে সময়ও অনেক অনুসন্ধান করে পাওয়া যায়নি, সংখ্যালঘু শিক্ষক কিভাবে ধর্ম অবমাননা করেছিলেন।  

গত কয়েক বছরে বড় ধরনের তিনটি সাম্প্রদায়িক লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে সুনামগঞ্জ, ভোলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনটি ঘটনার ধরন ছিল এক। বলা হয়েছিল সংখ্যালঘু পরিবারের ছেলেরা ফেসবুকে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করে স্ট্যাটাস দিয়েছে। পরে পুলিশি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, তিনটি ঘটনায়ই ফেসবুক হ্যাক করে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে লেখা হয়েছে। অথচ ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কয়েক শ বাড়ি লুটপাট হয়ে গেল। কুমিল্লার ঘটনা সবার জানা। এক মুসলমান ছেলে পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআনের পাতা রেখে উসকানি দিয়েছিল।  

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন সামনে রেখে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা হয়েছে। ধর্মকে ঢাল বানানোর চেষ্টাও কম হয়নি। সিলেটে এক চা শ্রমিকের ছেলের ফেসবুক হ্যাক করে ‘নুপূর শর্মার পক্ষে লিখে’ ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা হয়েছিল। অতিদ্রুততার সঙ্গে পুলিশ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করায় ঘটানা এগোতে পারেনি। নড়াইলে একটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের ঘটনা ঘটানো হয়েছে ১৮ জুন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের একেবারে উষালগ্নে। স্বপন বিশ্বাসকে জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হয়েছে। সেখানে পুলিশ ছিল। তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি বা উদ্যোগ নেয়নি। স্বপন বিশ্বাসের দোষটা কী? এক ছাত্র নুপূর শর্মার পক্ষে লিখেছিল, তিনি তার বিচার করতে পারেননি। এই দোষে একজন শিক্ষককে গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হলো। এ লজ্জা রাখব কোথায়! এ ঘটনারও বড় রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ তৎপর হওয়ায় ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যর্থ হয়েছে। তবে স্বপন বিশ্বাসের ঘটনা একেবারে সাদা চোখে দেখলে হবে না, খুঁজলে হয়তো ভেতরে 'ডাল মে কুচ কালা হ্যায়' পাওয়া যাবে।

ভারতের বিজেপি নেত্রী নুপূর শর্মার বিষয়টি এখন বিশ্বব্যাপী আলোচিত। ভারতের বিবেকবান মানুষও নুপূর শর্মার বিষয়টি সমর্থন করে না। সেদিন কলকাতার জনসভায় দেখলাম বিভিন্ন মন্দিরের পুরোহিতরা এসে মুসলামনদের আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। একটি দেশের রাজনৈতিক দল, সরকার ও জনগণ এক নয়। রাষ্ট্রক্ষমতা পেতে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কুপন্থা বেছে নেয়। ক্ষমতার কাছে ধর্ম-অধর্ম কোনো বিষয় নয়। ক্ষমতাই তাদের শেষ কথা। নৈতিকতা তাদের কাছে তুচ্ছ।

বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে যারা খোঁজ রাখেন তারা নিশ্চয় জানেন, ভারতের বিজেপি সরকারের আমলে বাংলাদেশের উগ্র ধর্মবাদী দল জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীকে পাঁচ বছরের জন্য ভিসা দিয়েছিল বিজেপি সরকার। আমাদের দেশে একটি অপশক্তি, ধর্ম ব্যবসায়ীরা যেমন বেছে বেছে সংখ্যালঘুদের হামলার শিকারে পরিণত করে, একইভাবে ভারতের ওই অপশক্তিও সেটাই করে। এটা হচ্ছে দুনিয়ার সব দেশের ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনীতিকদের চরিত্র। এরা যে দেশেই থাকুক এদের চরিত্র এক ও অভিন্ন। বিশেষ স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করলে সহজে দুটি কাজ হয়ে যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিটি শায়েস্তা হয় আবার ক্ষমতা দখল বা সহায়-সম্পত্তি দখলের বিষয়টিও সহজ হয়ে যায়।  

ধর্মকে পূজি করে রাজনীতি করলে, রাষ্ট্র পরিচালনা করলে দেশের কী বারোটা বাজে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে পাকিস্তান। ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার গড়ের মাঠে বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতায় পাকিস্তানিদের তিনটি আদর্শের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এক, কাশ্মীর কো ফতে কারনে পাড়ে গা; দুই. ইসলাম খতম হ্যায়; তিন. হিন্দু হামারা দুশন হ্যায়। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বর্তমান সভ্য দুনিয়ায় এ জাতীয় বর্বর আদর্শ চলে না। দেখুন ধর্মের নামে রাজনীতি চালাতে গিয়ে আজ পাকিস্তানের কী দশা। দেশের অর্থনীতি এখন তলানিতে। মানুষ খাবার পায় না। বর্তমান বিশ্বের মানচিত্র হিসেবে আমাদের চেয়ে ভারতের কাছের প্রতিবেশী হচ্ছে পাকিস্তান। এখন ভারতকেও বুঝতে হবে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ চালালে পরিণাম কী হয়? আমরা বাংলাদেশের মানুষ বিভাজিত হতে চাই না মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানে। আমাদের ভাগটা হোক ভালো মানুষ আর খারাপ মানুষে। ঘুষখোর আর সৎ মানুষে। মিথ্যবাদী এবং সত্যবাদীর মধ্যে। এ দেশটার যেমন আমার তেমনি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানেরও।  

লেখক : সাংবাদিক।  (মতামত লেখকের নিজস্ব)



সাতদিনের সেরা