kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

দৃঢ়চেতা নেতৃত্বের উদ্দীপ্ত সম্ভার পদ্মা সেতু

ড. প্রভাষ কুমার কর্মকার    

২৬ জুন, ২০২২ ১০:৫৫ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



দৃঢ়চেতা নেতৃত্বের উদ্দীপ্ত সম্ভার পদ্মা সেতু

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র উপহার দিয়ে যে ঋণের দায়ে আমাদের আবদ্ধ করেছেন, সেই অবদান জাতি হিসেবে কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করতে হবে প্রজন্ম পরম্পরায়। একইভাবে বর্তমানে উন্নয়নের কষ্টসাধ্য চাকাকে সচল করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগানো দূরদর্শী নেতা জননেত্রী শেখ হাসিনা এই অনন্যসাধারণ অর্জনের মাধ্যমে বাঙালিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করলেন, তা মূল্যায়নপূর্বক স্মরণ করতেই হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাফল্যমণ্ডিত পদক্ষেপের বহুল প্রশংসনীয় অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী পদ্মা সেতু বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই। স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র তার পথচলায় বঙ্গবন্ধুর পরে জননেত্রীর শাসনামলের আগ পর্যন্ত স্বাভাবিক কিংবা অস্বাভাবিক সে যে পথেই হোক অনেক নেতৃত্বকে দেখলেও এমন অসাধ্য উত্কর্ষ সাধনের নজির দেখেনি এই বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সার্থক পদক্ষেপ—বহুল প্রশংসনীয় অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী পদ্মা সেতু বিষয়ে কিছু বলার আগে কিভাবে এমন অর্জন সম্ভব তা একটু খতিয়ে দেখা বাঞ্ছনীয়।  

ইংরেজিতে প্রচলিত প্রবাদ ‘Necessity is the mother of invention’, যার বঙ্গার্থ ‘অভাব আবিষ্কারের জননী’ হলেও তা কিন্তু ছোটবেলায় অনেকের কাছেই সেভাবে অনুধাবনযোগ্য হয় না। কারণ, একটি প্রশ্ন মনে আসে অভাব আবার কিভাবে আবিষ্কারের হেতু হয়? তবে বিদ্যাদেবীর দয়া-দাক্ষিণ্য ও বয়োবৃদ্ধির কারণে বোধশক্তির কিছু তো উন্নতি ঘটেই থাকে, যে কারণে মর্মার্থ উপলব্ধিতে কিঞ্চিৎ ফারাক পরিলক্ষিত হয়। যে কারণে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে কারো মননে অভাববোধ না জাগলে, তাকে দিয়ে আর যা-ই হোক সৃজনশীল কল্যাণকর বিকাশভাবনা ও সে বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ যে একেবারেই অসম্ভব, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রমাণ দিতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না জানি। তবু একবাক্যে এইটুকু বলে রাখি যে গত হাজার বছরে বাঙালির দুর্দশা লাঘব করতে সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃজনবোধ বঙ্গবন্ধু ছাড়া কারো হয়নি। আর প্রতিক্রিয়াশীলতাকে পুঁজি করে ভুঁইফোড় শক্তির অনেক আস্ফাালন এ জাতি দেখেছে, দেখেছে বঙ্গবন্ধুকে বর্বরোচিতভাবে হত্যার পর ২১ বছরে ‘ভিক্ষার চাল কাঁড়া আর আকাঁড়া’ বিচারের অপেক্ষায় না থাকা শাসকদের দেশের মেরুদণ্ড বিকিয়ে প্রভুত্ব স্বীকারের ঘৃণিত ভাবনাবোধ। সুতরাং চেতনশক্তি অত সোজা নয়—শুধু মননে অভাববোধ পজিটিভ অর্থে কাজ করলেই আবিষ্কারার্থক ভাবনা আসে। বাস্তবতার নিরিখে এখন সে বিষয়েই দৃষ্টি নিষ্পন্ন করব।  

প্রকৃতপক্ষে জনগণের সেবক হয়ে তাদের কল্যাণে একটানা গত প্রায় দেড় দশককাল কাজ করা জনবান্ধব ও হিতকর নেতা জননেত্রী শেখ হাসিনা নিজের জীবন বাজি রেখে যেভাবে সৃষ্টিশীল ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে ব্রতী হয়েছেন, সেসব বিকাশমান ভাবনা ও সফলতার অনেক উদাহরণের মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘পদ্মা সেতু’ নিয়ে দুটি কথা বলার অভিপ্রায়ে আজকে এই কলম ধরা।  

আজকের এই শুভক্ষণে জাতির পিতার বলিষ্ঠ কণ্ঠের উচ্চারণ, ‘বাঙালি জাতিকে আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না’ খুব ভীষণভাবে মনে পড়ছে। হে পিতা! তুমি এসে দেখে যাও তোমার বাঙালি জাতি আজ তোমারই কন্যার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে জেগেছে, তোমার স্বপ্নের বাস্তবায়ন আজ তিনি তোমারি চেতনায়, তোমারি দেখানো পথে শুরু করেছেন।

বাংলাদেশের অহংকারবোধ পুনর্জাগরণের পুরোধা ব্যক্তিত্ব হয়ে শুধু দেশ নয়, গোটা পৃথিবীকে উন্নয়নালোকে অবাক করে দিতে তিনি তাঁর আত্মপ্রত্যয়ী দৃঢ়চেতা মননের যে ছাপ রাখলেন, তাতে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার পঙক্তিই মনে করিয়ে দেয়।  

‘সাবাস, বাংলাদেশ,
এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়:
জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়। ’

তবে কি কবি মনের কোনো এক কোণে জননেত্রীর এমন অভিপ্রায় যে এ দেশের ভবিতব্য হয়ে শোষিত-বঞ্চিত দেশবাসীর ভাগ্য পরিবর্তনের অবলম্বন হবে, হবে সব অশুভ বিদায়ের মূল—তা তিনি ভেবেছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর যে এই প্রজন্মকে খুঁজতেই হবে, কারণ এই বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর কন্যা বাংলার নয়নমণি জননেত্রী শেখ হাসিনার তুল্য আর কেউ হতে পারেন না।  

এখন পদ্মা সেতুর ওপর মনোনিবেশ করতে চাই—পদ্মা সেতুর অফিশিয়াল নাম ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’। যার নির্মাণশৈলী ও আকর্ষণীয়তা, নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিতকরণ, জনদুর্ভোগ লাঘব, জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও পণ্য পরিবহন, কৃষিবান্ধব ভূমিকা ও উপযোগিতা এবং পরিকল্পনা থেকে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন অবধি সব ষড়যন্ত্র ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কারণে হয়তো বহুমুখী নামের যথার্থতা মিলবে। সংক্ষিপ্ত পরিসরের কারণে এই আলোচনায় আরো অনেক দিক রয়েছে, যা তুলে আনা সম্ভব হচ্ছে না, হয়তো অন্য কোনো সময়ে বিস্তারিতভাবে আরো নানাবিধ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা যাবে।  

তবে পদ্মা সেতুর ওপর যেকোনো পরিসরে যত সংক্ষিপ্ত আলোচনা আর পর্যালোচনাই হোক, সর্বাগ্রে দুটি অবশ্যম্ভাবী বিষয়কে গুরুত্ব না দিলে চরম অকৃতজ্ঞের তালিকাতে পড়তে হবে, পড়তে হবে প্রতিক্রিয়াশীলতার দুষ্টচক্রের সারিতে!

যার প্রথমটি, নিজস্ব অর্থায়নে আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী পদক্ষেপমূলে অর্জন, যে গুণসম্ভারের কৃতিত্ব শুধুই দেশরত্ন শেখ হাসিনার। আর এই অনন্যসাধারণ অমিয়গুণ থাকলেই শুধু সামগ্রিক অবদান থাকার পরও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রেরিত সেতু উদ্বোধনী সারসংক্ষেপে প্রস্তাবকৃত ‘শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু’ নাকচ করে ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’ রাখা যায়। এমনটি শুধু জননন্দিত ও নিজ স্বার্থের প্রাধান্য না দেওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যার পক্ষেই সম্ভব। তাইতো তিনি গণতন্ত্রের মানসকন্যা, তারুণ্যের আস্থাভাজন মানবিক প্রধানমন্ত্রী। এমন জনহিতৈষী কল্যাণকামী প্রধানমন্ত্রী দেশসেবার ব্রতে এগিয়ে গিয়ে দেশের উন্নয়ন পতাকা বিশ্ব পরিমণ্ডলে  তুলে ধরবেন—এটিই বাস্তব।  

এই সেতুতে ব্যবহূত উপকরণ কিংবা পদ্ধতি নিয়ে তথ্য উপস্থাপনের খুব বেশি ইচ্ছা ছিল না।  কিন্তু সেতু নির্মাণের প্রারম্ভিক পর্যায়ে হতচকিত করা পরিস্থিতি ও গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত অতি উৎসাহী কিছু সমালোচক-প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ’ করায় ওস্তাদ দুষ্টচক্রের প্রখর শ্যেনদৃষ্টি ছিল, যাতে এই গর্বিত কর্মকাণ্ড কোনো মতেই সার্থক না হয়। এ কারণে শুরু থেকে আজ অবধি শুধু দেশবাসীই নয়, বিশ্ববাসী তথা উত্সুক মানুষের কাছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পদ্মা সেতুর শক্ত ভিত, অবয়ব ও গঠন প্রকৃতি নিয়ে সংক্ষেপে দুটি কথা বলা উচিত বলে মনে করি।  

খরস্রোতা এবং পানিপ্রবাহের দিক দিয়ে পেরুতে অবস্থিত আন্দিজ পর্বতমালার নেভাদো মিসমি পর্বতশৃঙ্গ থেকে উত্পত্তি হওয়া পৃথিবীর দ্বিতীয় দীর্ঘতম খরস্রোতা নদী আমাজনের পরই পদ্মা নদীর অবস্থান। যার মূল প্রবাহে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। এই নদীর তলদেশের মাটির প্রকৃতিও ভিন্নতর। কাজেই স্থাপত্যশৈলীতে দক্ষ স্থপতিদেরও চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় নদীর তলদেশে সেতুর পাইলিং নিয়ে। তথ্য মতে, বিশ্বে আর কোনো সেতুতে পদ্মা সেতুর মতো নদীর তলদেশের মাটি থেকে প্রায় ১২২ মিটার গভীরে পাইলিং করা হয়নি। অর্থাত্ দ্বিতল এই সেতুতে নদীর তলদেশে মাটির গভীরে প্রায় ৪০-৪১ তলা ভবনের সমান পাইলিং বিদ্যমান। সেতুর প্রতিটি পিলারের জন্য পাইলিং সংখ্যা ছয়টি এবং পিলার সংখ্যা ৪২টি-এর প্রতিটি পিলার প্রায় ৫০ হাজার টন ভার বহন করতে পারবে। চার হাজার ডেড ওয়েট টনেজ সক্ষমতার জাহাজের অনাকাঙ্ক্ষিত ধাক্কা সামাল দিতে সক্ষম এই সেতু। পাইলিয়ের জন্য ব্যবহূত স্টিলের পাতের ব্যাস প্রায় ১০ ফুট এবং এই পাত বসাতে তিন হাজার কিলোজুল ক্ষমতাসম্পন্ন হ্যামার ব্যবহার করা হয়, যা বিশেষভাবে জার্মানি থেকে তৈরি করে আনা হয়। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পেও টিকে থাকার ক্ষমতা এই সেতুর রয়েছে। ব্যবহূত স্প্যানের একেকটি বেয়ারিং প্রায় ১০ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন, যা বিশ্বে ব্যবহূত হেবি বেয়ারিংয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। সড়কপথের নিচ দিয়ে রেল চলাচল, ৬.১৫ কিলোমিটারের মূল সেতুতে ৪১৫টি সড়কবাতির আলোক ঝলকানিতে পদ্মার পানিতে আলোর রোশনাই, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রক মনোমুগ্ধকর বাঁক, ১৫০ মিটার দূরত্বে পিলারের কারণে সেতুর একেবারে তলদেশে জলরাশিতে জাহাজ চলাচলের সুব্যবস্থা, লোড ক্যাপাসিটি এই পদ্মা সেতুর নির্মাণশৈলীর অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং আকর্ষণীয়তার নিয়ামক।

আপাতদৃষ্টিতে পদ্মার দুপার মুন্সীগঞ্জ এবং শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হলেও এর মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সরাসরি যাতায়াত দ্বার অবমুক্ত হলো। এই অঞ্চলের ২১টি জেলা এই পদ্মা সেতুর মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলো এবং এসব জেলার রাজধানীর সঙ্গে গড় দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার কমল। বরিশাল বিভাগের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের চাবিকাঠি বলে পরিগণিত হবে এই সেতু। এ অঞ্চলে গার্মেন্টসহ হালকা ও ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক নদীর দুপারে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে, দেশের সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বাতায়ন উন্মুক্তকরণের কারণে পর্যটনশিল্প আরো বিকশিত হবে। সঙ্গে সঙ্গে খুলনা বিভাগের জন্যও এটি আশীর্বাদ। যোগাযোগ ব্যবস্থা শিল্পোন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতির অনুঘটক। এই সেতু আজ এতদাঞ্চলের দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে, কষ্টের ফেরি পার হতে মুক্তি দিল—বাংলার প্রচলিত প্রবাদ ‘সারা পথ দোড়াদৌড়ি, খেয়া ঘাটে গড়াগড়ি’ হার মানল আজ শেখ হাসিনার ইস্পাত কঠিন পদক্ষেপের কাছে। দেশের মোট এলাকার প্রায় ২৯ শতাংশ অঞ্চলের মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে। আঞ্চলিক ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে যোগাযোগ হাব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই সেতু। রেলের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন ত্বরান্বিত হবে এবং পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাসলাইন পৌঁছে যাবে দ্রুত। জাইকার জরিপ অনুযায়ী দেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো বিনিয়োগ থেকে বছরে কমপক্ষে ১২ শতাংশ রিটার্ন এলেই শুধু তাকে আদর্শ বিনিয়োগ বলা যায়। সেই বিবেচনায় বছরে পদ্মা সেতুর সম্ভাব্য রিটার্ন বিনিয়োগের ১৯ শতাংশ বলে পূর্বাভাস করা হচ্ছে।  

দেশের অভ্যন্তরীণ নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত হবে, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও পণ্য পরিবহনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হবে। কৃষি অর্থনীতির ভিত শক্ত করতে এবং শিল্পপ্রসার ত্বরান্বিত করে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, মোংলা বন্দর এবং বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী হয়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করার সেতুবন্ধ গর্বের এই পদ্মা সেতু। এই সেতুর মাধ্যমে এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। সরাসরি সংশিষ্ট অঞ্চলের প্রায় ছয় কোটি মানুষের ওপর উন্নয়ন আভা পড়বে, তাতে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। দেশের পণ্য পরিবহনসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পণ্যও এই পথে আনা-নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে।  

সুতরাং দেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও সামগ্রিক অর্থনীতির সূচকে বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রগতি যারপরনাই ত্বরান্বিত হবে। সুতরাং আর্কিওলজিক্যাল ও অর্থনৈতিক ভ্যালু প্রতিষ্ঠিত হবে। সঙ্গে সঙ্গে মানবজীবনের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ ‘সময়’ সাশ্রয়ী হয়ে উঠবে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনে।  

এই পদ্মার বুকে সেতুর অভাবে ফেরি পারাপারের কারণে যাত্রীদের অপেক্ষার প্রহরের শেষ ছিল না। অনেক সময় মানুষকে কয়েক দিন-রাত ধরে এই পদ্মার পারে কাটাতে হয়েছে, অনেক আশঙ্কাজনক রোগীকে প্রাণপাত করতে হয়েছে ফেরির অভাবে। কত যে কাঁচামাল ও পচনশীল দ্রব্য নষ্ট হয়েছে—সেই সাক্ষী শুধু তারাই যাদের সেই ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে। বিরূপ আবহাওয়ায় নৌযান ডুবি হয়ে কত তাজা প্রাণ ঝরেছে—সেই খবর কে রেখেছে? অসংখ্য নজির আছে এই ঘাটে অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব হয়নি শিক্ষার্থীদের। পদ্মাপারে অপেক্ষাতে কর্মঘণ্টা বেড়েছে, বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। আজ থেকে এই পদ্মা সেতুর কারণে পূর্বোল্লেখিত জনদুর্ভোগ লাঘবের অবলম্বন হয়ে কাজ করবে। বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগে সুপার কানেক্টিভিটির আওতায় উপনীত হলো। জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান, কৃষিবান্ধব ভূমিকা ও উপযোগিতা অন্য কোনো পরিসরে বিশদ আলোচনা করার আশাবাদ ব্যক্ত করে এখন সবচেয়ে আলোচিত, কথিত দুর্নীতি প্রসঙ্গে কিছু না বললে এই লেখাও যেমন পূর্ণতা পাবে না, তেমনি স্বস্তিও মিলবে না—দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের উন্মোচিত মুখোশও সামনে আসবে না।

পরিকল্পনা থেকে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন অবধি সব পর্যায়ে এই কুচক্রীদের লাগাতার ষড়যন্ত্র মোকাবেলার বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ ছিল এই মহাপ্রকল্পে। এই সেতু প্রকল্পের জন্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হলেও পরামর্শক নিয়োগে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে একে একে ২০১৬-২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা তা প্রত্যাহার করে। এই দুর্নীতির ধুয়া তুলতে এবং বাঙালির এই অহংকারের পথে খড়গাঘাত করতে এ দেশের কিছু মতলববাজ উন্নয়নবিরোধীর যে হাত ছিল, তাঁরা যে বিদেশিদের কাছে ধরনা দিয়ে ফায়দা লুটতে চেয়েছিলেন—তা কি আর চাপা থাকে? নিশ্চয় না! 
উন্মোচিত মুখোশ বলেছি এই কারণে যে, দেশি-বিদেশি চক্রের হোতারা কথিত দুর্নীতির কথা বলে যেভাবে সরব হয়ে বিনিয়োগ বন্ধ করেছেন, তা ধোপে টেকেনি। এবং তাঁদের সেই অশুভ তত্পরতা, ষড়যন্ত্র ও কথিত দুর্নীতিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন কানাডার আদালত। কানাডার মহামান্য আদালত স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে এই প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি। আর কোনোরূপ অর্থই যেখানে বরাদ্দ হয়নি, সেখানে দুর্নীতি কিভাবে সম্ভব? তবে এ কথা বললে হয়তো খুব একটা অত্যুক্তি হবে না যে বহুমাত্রিক এই সেতু প্রকল্পে সরকারবিরোধী তথা দেশবিরোধী দুষ্টচক্রের বহুমুখী ষড়যন্ত্র কখনো থেমে থাকেনি। যখন দুর্নীতির ধুয়া বন্ধ হলো বিদেশি আদালতে, তখন নানা ধরনের গুজব সৃষ্টি করা হলো। কখনো মাথা নেওয়ার গুজব তুলে মানুষকে রাগান্বিত করা। অনেকের মতে, পাগলের বেশে এক ধরনের ঘোলাটে পরিবেশ তৈরি, জমি অধিগ্রহণে বাধা দেওয়ার তত্পরতাও কম নয়। সর্বশেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাশকতার ষড়যন্ত্র কিংবা তা বানচাল করার অপতত্পরতার কথা শোনা যাচ্ছে জোরেশোরে। বাইরে এমন বিঘ্নসৃষ্টিকারী অপতৎপরতা থাকলেও এই দুষ্টচক্রের মনে একটা ভীতি ছিল, তারা জানত যে নেতৃত্ব বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করেছে, এমডিজি অর্জন করেছে, এসডিজি অর্জনের পথে, যার ধমনিতে বঙ্গবন্ধুর রক্তধারা প্রবহমান, তিনি কোনো কল্যাণমূলক কাজে হাত দিয়ে পিছু হঠবেন না।  

আর শুধু তারা কেন, দেশবাসীসহ সারা বিশ্ব জানে বঙ্গবন্ধুকন্যা সত্য সুন্দর কল্যাণের পথে থেকে দেশের উন্নয়নে কাজ করেন, তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, নিষ্ঠা ও জবাবদিহি অতুলনীয়। যে কারণে সব উন্নয়নবিরোধী (ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দল যে-ই হোক) অপতত্পরতা সৃষ্টিকারীদের পরোয়া না করে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের কাণ্ডারি জননেত্রী শেখ হাসিনা আত্মপ্রত্যয়ী মননে দীপ্তকণ্ঠে সেদিন ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমরা নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু তৈরি করব। ’ বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ হাসিনা সময়োচিত সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন, আজ তাঁর দৃঢ়চেতা বলিষ্ঠ কণ্ঠের উচ্চারণ ও সঠিক কর্মপরিকল্পনার আকর স্বপ্নজয়ের পদ্মা সেতুর শুভ যাত্রাক্ষণ।    

আসুন, যাঁর দৃঢ়চেতা সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তের ফসল এই পদ্মা সেতু, সেই মহান বিশ্বনেতা দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রত্যয়ের ওপর আস্থাশীল হয়ে তাঁর জনবান্ধব সব কাজের প্রতি সমর্থনজ্ঞাপনপূর্বক তাতে শামিল হওয়ার মাধ্যমে চলমান উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণযুদ্ধে বর্তমান প্রজন্ম অংশ নিয়ে তাদের সত্যান্বেষী মননের প্রতিফলন ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারার আক্ষেপ দূর করি। আর এর মাধ্যমেই আগে অনুক্ত প্রখর শ্যেনদৃষ্টির দুষ্টচক্র ও তাদের ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙা জবাব হবে বলেই দেশবাসী মনে করে। সুতরাং আজকের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আসুন আমরা নিন্দুক-ষড়যন্ত্রকারী-বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী ও দেশের বিকাশে ঈর্ষান্বিত কুচক্রী মহলকে শেখ হাসিনার চোখ-ধাঁধানো উন্নয়ন দেখানোর মাধ্যমে তাদের হীন কাজের প্রতি শুধুই অনাস্থা ও ধিক্কার জানাই।

আমরা বিশ্বাস করি, দেশের সাড়ে সতেরো কোটি মানুষের চাওয়ার সঙ্গে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতার স্বপ্নসাধের সঙ্গে যুক্ত করে সংযুক্তায়নের যে অন্বয় একের পর এক সৃষ্টি করে চলেছেন শোষিত-বঞ্চিতের জন্য নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্বের পরিপূর্ণ গুণাবলিতে সমৃদ্ধ দূরদর্শী বিশ্বনেতা উন্নত আধুনিক বাংলাদেশের সফল রূপকার জনগণনন্দিত বঙ্গরত্ন শেখ হাসিনা তা অনুকরণীয় হয়ে থাকবে এই বাংলাদেশ যত দিন টিকে থাকবে।  
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। জয়তু শেখ হাসিনা।

লেখক : অধ্যাপক. পরিসংখ্যান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও সভাপতি, বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা



সাতদিনের সেরা