kalerkantho

শুক্রবার । ১ জুলাই ২০২২ । ১৭ আষাঢ় ১৪২৯ । ১ জিলহজ ১৪৪৩

পদ্মা সেতু, বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাস

কাজী সুফিয়া আখ্তার    

২২ জুন, ২০২২ ১৪:৪৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পদ্মা সেতু, বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাস

ভাবতে ভালো লাগছে আর মাত্র কয়েক দিন পর সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করা হবে। এখন প্রতি সন্ধ্যায় চারপাশ আলো করে পদ্মা সেতুতে ৪১৫টি বাতি জ্বলছে। সেই আলোতে পদ্মার জলের বুকে অলৌকিক সৌন্দর্যের ঝিলিমিলি ঝিলিমিলি খেলা অপার্থিব আনন্দ আনে সবার অনুভবে। হৃদয়ে, মনে মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে দুই পারের মানুষ।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা থেকে গাড়ি নিয়ে প্রতিদিন অতীব উৎসাহে কত নাগরিক, ছেলে-মেয়ে, মা-বাবা, পরিবারের সবাই মিলে পদ্মা সেতু দেখতে গেছে। গর্বে তাদের বুক ভরে ওঠে। অবিশ্বাস্য চোখে পদ্মা সেতুর সৌন্দর্য দেখেছে তারা। চোখে-মুখে উপচেপড়ে হাসি। আহ বাংলাদেশ! সোনার বাংলাদেশ। সাহসী মানুষের বাংলাদেশ। কারো কাছে কখনো মাথা নোয়ানোর নয়।   

কৃতজ্ঞচিত্তে মনে পড়ে, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের একটি জাতি-রাষ্ট্র দিয়েছেন; স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক আমরা। বাঙালি জাতিসত্তার স্বীকৃতি মিলেছে আমাদের। পদ্মা সেতু বঙ্গবন্ধুকন্যা মানবতাবাদী, জনদরদি নেত্রী শেখ হাসিনার অটল সংকল্পের অবদান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। সেই সরকারের সময়েই যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৮ সালে পদ্মা নদীতে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। সম্ভাবনা যাচাই ও প্রয়োজনীয় সমীক্ষা শেষে ২০০১ সালের ৪ জুলাই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় আসার কারণে স্বভাবতই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ এগোয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আবার পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজ গতি লাভ করে। কিন্তু পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রধান অর্থ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক কাজ শুরুর আগেই দুর্নীতির অভিযোগ তোলে এবং ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করে। বাংলাদেশ সরকার প্রথম থেকেই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণের মেগাপ্রকল্প থেকে সরে যাওয়ার পরপরই অদম্য সাহসী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের দুঃসাহসী ঘোষণা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কঠোর ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। আজকের পদ্মা সেতু বঙ্গবন্ধুকন্যার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ফসল। কিন্তু পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে শুরু থেকে সম্ভব- অসম্ভবের যত কল্পনা-জল্পনা, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে এ দেশের মানুষ দুলেছে—এমনটি আর কখনো হয়নি। অনেক স্বদেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরিশ্রম, সব ধরনের কারিগরি ঝামেলা, শঙ্কা কাটিয়ে এই পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ বাস্তবায়িত হয়। তাই পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এই পদ্মা সেতু বাঙালির, বাংলাদেশের অহংকার, বাংলাদেশের গৌরব; আমাদের বর্তমান সরকারের সক্ষমতা।  

আদিকাল থেকে বাংলাদেশের মানুষের মন ও মনন, বাঙালির ভাঙা-গড়ার ইতিহাসজুড়ে যেমন পদ্মা বহমান, তেমন রয়েছে সাহিত্যের পাতায় কবিতা, গানে, উপন্যাসে, ছোটগল্পে পদ্মা নদীর উজ্জ্বল উপস্থিতি; দুই পারের মানুষের জীবনসংগ্রামের, দুঃখ-কষ্টের কাব্যগাঁথা। পদ্মা নদীর ওপর বোটে বসে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন গান, ছোটগল্প, অসামান্য ছিন্নপত্রাবলি। গভীর দৃষ্টিতে দেখেছেন শ্রমজীবী মানুষের জীবন, কৃষকের জীবন, নদীর ভাঙন, গ্রাম প্লাবিত করা বন্যা। সেই ভালোবাসার নদী, মানুষের বিত্ত-বৈভব নাশ করার কীর্তিনাশা নদীকে শাসন করে, তার বুকে সেতু নির্মাণ, ভাবা যায়! অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, বাস্তবে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তাঁর একনিষ্ঠ একাগ্রতা দিয়ে। এই কাজ তিনি শুধু আত্মসম্মানে তাড়িত হয়ে করেননি, পদ্মার ওপারের সাধারণ মানুষের আর্থিক উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনার অভিপ্রায়ে ছিলেন অনড়। এই সেতু নির্মাণের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি ২.৩ শতাংশ বাড়বে। রাজধানীর সঙ্গে অনেক জেলা ও নৌ বন্দর এবং স্থলবন্দরের সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে।   

সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘পদ্মার বুক কেউ কখনো দেখেনি। ’ বহু বছর ধরেই একূল ভেঙে ওকূল গড়ার বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি ছিল। কত গ্রাম, জনপদ, ঘরবাড়ি, মসজিদ, মন্দির, পুকুর, গাছপালা সুশ্রী পদ্মার বুকে বিলীন হয়ে গেছে, কত মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেছে, তার সঠিক তথ্য বা খবর কে দিতে পারে? পদ্মার একটি অংশের নাম কীর্তিনাশা। প্রমত্ত পদ্মার বুকে একদিন চর জাগবে বা জাগতে পারে—এমন ভাবনা সেই সময় সমাজের কারো চিন্তায় আসেনি। আর উত্তাল পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের কথা কারো মনে কখনো আসেনি। পৃথিবীতে আমাজন  নদীর পরে পদ্মা নদী দৈর্ঘ্যে এবং জটিল চরিত্রের কারণে দ্বিতীয়। প্রাকৃতিক ও কারিগরি প্রতিকূলতা জয় করে পদ্মা সেতুর প্রতিটি খুঁটির নিচে ১২২ মিটার গভীরে স্টিলের তিন মিটার ব্যাসার্ধের পাইল বসানো হয়েছে। পৃথিবীতে আর কোনো নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য এত গভীরে পাইলিং করার প্রয়োজন হয়নি। এত মোটা পাইল বসানো হয়নি। নিবিড় তদারকিতে এই পদ্মা সেতু ১০০ বছর পর্যন্ত মানুষের মানবিক এবং আর্থিক ও অন্যান্য বহুবিধ উপকারে আসবে, সমৃদ্ধি আনবে।

পদ্মা সেতু নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে উত্সাহ-উদ্দীপনার অন্ত নেই। প্রধানমন্ত্রী সঠিকভাবেই সাধারণ মানুষের আশা এবং আবেগ ধরতে সক্ষম। পদ্মা সেতু বাঙালির আত্মবিশ্বাস।  

লেখক : গবেষক ও লেখক, নারী অধিকার আন্দোলন কর্মী



সাতদিনের সেরা