kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

মায়ের জন্য রাবারের নৌকায় রনির দুর্গম যাত্রা

অনলাইন ডেস্ক   

২১ জুন, ২০২২ ১২:৩৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মায়ের জন্য রাবারের নৌকায় রনির দুর্গম যাত্রা

রাবারের নৌকায় রনির দুর্গম যাত্রা। ছবি : ভিডিও থেকে নেওয়া

জরুরি কাজে ঢাকায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই জানলেন, সুনামগঞ্জ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। প্রথমে বাবা জানিয়েছিলেন বন্যার পানি দ্রুত বাড়ছে। এরপর ৪৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

পরে ঢাকা থেকে রাবারের নৌকা আর লাইফ জ্যাকেট কিনে সিলেট রওনা হন রুবেল তালুকদার রনি। জিপিআরএস নেটওয়ার্কের ওপর ভরসা করে উত্তাল স্রোতে নৌকা ভাসান। কিন্তু বিপদে পড়েছিলেন মাঝপথে গিয়ে। লিখেছেন ইয়াহইয়া ফজল

বাড়িতে বন্যার পানি বাড়ার খবর প্রতিনিয়ত মোবাইল ফোনে জানছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) রাতে পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। এরপর আর যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। এরই মধ্যে পুরো সুনামগঞ্জ জেলাই মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তা আতঙ্কে রূপ নিতে থাকে রনির। তিনি বাড়ি রওনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। খবর পান, নৌকার তীব্র সংকট। ভাড়াও কয়েক গুণ বেশি চাওয়া হচ্ছে। ফলে ঢাকা থেকে সাত হাজার টাকা দিয়ে রাবারের নৌকা আর লাইফ জ্যাকেট কিনে সিলেটে চলে আসেন শুক্রবার। পরদিন জিপিআরএস দেখে ছাতক যাওয়ার রুট নির্ধারণ করে নৌকায় চড়ে বসেন।

রনির কথায়, ‘আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল শিবের বাজার-রানীগঞ্জের মধ্যে থেকে স্রোতের সঙ্গে ৬০-৭০ ডিগ্রি কোণে থাকা। একসময় জিপিআরএস ট্র্যাক করতে পারছিলাম না। পরে চার-পাঁচটি পরিচিত গ্রামের পাশ দিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। তাহলেই কাজ হয়ে যেত। ’

kalerkanthoঅবশ্য নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়া রনির জন্য নতুন নয়। বললেন, ‘আমি ১৩-১৪ বছর বয়সে কম্পাসের ব্যবহার শিখেছি। ছাতক পেপার মিল থেকে স্কাউট ক্যাম্পিংয়ে গিয়ে। নিয়মিত চার-পাঁচ কিলোমিটার হাঁটি। আমার ট্রাভেল ব্যাগে সব সময় একটা মিনি কম্পাস থাকে। ’

গুগল ম্যাপ দেখে রনি বুঝলেন, সিলেট সদর উপজেলা থেকে জলপথে ছাতকের দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার। এরপর তিনি সদর উপজেলা থেকে যাত্রা শুরু করেন রাবারের নৌকায়। কম্পাস আর জিপিআরএস ট্র্যাকারের সাহায্যে চার কিলোমিটার পাড়ি দিয়েও ফেলেন এক ঘণ্টায়। এর মধ্যে বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে জিপিআরএস সিস্টেমও কাজ করছিল না। রনির বর্ণনায়, ‘আমার কান্না পাচ্ছিল। কারণ চার কিলোমিটার অতিক্রম করেছিলাম মাত্র এক ঘণ্টায়। বাকি ১১.০৭ কিলোমিটার। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছিল। ছাতকও যেতে পারিনি। ’

জিপিআরএস সিস্টেম কাজ না করায় রনি বুঝতে পারেন, তিনি প্রকৃত অর্থেই বিপদে পড়ে গেছেন। কী করা উচিত ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছিলেন না। তাঁর ভাগ্য ভালো এ সময় পাশ দিয়ে একটি ত্রাণবাহী নৌকা যাচ্ছিল। তিনি হাত নেড়ে নৌকার লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু নৌকার লোকজন তাঁকে প্রথমে পাত্তা না দিয়ে চলে যাচ্ছিল। রনি তখন মরিয়া হয়ে হাত নাড়াতে শুরু করলে নৌকা তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসে।

সিলেটের সমাজসেবী আব্দুল জব্বার জলিল ত্রাণ নিয়ে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে যাচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের প্রধান আবুল কাশেম। কিভাবে রনিকে উদ্ধার করা হলো এর বর্ণনা দিলেন তিনি, ‘চলতি পথে হঠাৎ দেখি রাবারের নৌকায় করে এক লোক যাচ্ছেন। আমাদের দেখে হাত নাড়ালেন। প্রথমে ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো পানি দেখতে শখ করে নেমেছেন। তাই শুরুতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিইনি। তখন তিনি কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন চিৎকার করে। কিন্তু আমরা অন্তত ৫০০ হাত দূরে, তার ওপর নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ। কিছু শোনাও যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে যখন দুই হাত তুলে লাফালাফি শুরু করলেন, তখন বুঝতে পারি তিনি সমস্যায় পড়েছেন। তখন আমরা নৌকা ঘুরিয়ে কাছে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করি। ’

নৌকায় ওঠার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন রনি। তিনি জানান, মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে অনেকটা মরিয়া হয়েই এ চেষ্টা করেছিলেন।

আরো তিন-চার ঘণ্টা গেলে রনি মারাও যেতে পারতেন জানিয়ে আব্দুল জব্বার বলেন, ‘পানিতে ডুবে নয়। অঝোর বৃষ্টিতে ঠাণ্ডায় তিনি মারাও যেতে পারতেন। আমরা যখন তাঁকে উদ্ধার করি, তখন তাঁর হাত-পা ও শরীর ঠাণ্ডায় সাদা হয়ে গেছে। তিনি থরথর করে কাঁপছিলেন। ’

এরপর রনিকে সঙ্গে নিয়ে ত্রাণকাজ সেরে উদ্ধারকারীরা নগরের মদিনা মার্কেট এলাকায় তাঁকে নামিয়ে দেন।

গত রবিবার দুপুর দেড়টার দিকে ত্রাণবাহী একটি ট্রাকে করে ছাতকের উদ্দেশে রওনা দেন রনি। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তিনি বাড়ি পৌঁছেন। বাড়ির সবাই সুস্থ আছে দেখে স্বস্তি পেয়েছেন। বললেন, ‘এত কষ্টের পরও মায়ের মুখটা দেখে শান্তি লাগছে। ’



সাতদিনের সেরা