kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

ঢাকাকে বসবাসযোগ্য রাখতে বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা

লে. কর্নেল মো. মেহেদী হাসান

২৪ মে, ২০২২ ২১:৪৯ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



ঢাকাকে বসবাসযোগ্য রাখতে বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা

ঢাকা বাংলাদেশের প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। আজ থেকে প্রায় ১৩০০ বছর আগে, সেই সপ্তম শতাব্দীতে ঢাকায় মানুষের বসবাসের অস্তিত্ব জানা যায়। ১৬০৮ সালে ঢাকায় মুঘল বংশের শাসন শুরু হয় এবং ১৬১০ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে ঢাকার নামকরণ হয় জাহাঙ্গীরনগর। মুঘল আমলে ঢাকার আয়তন ছিল প্রায় ২৪০ বর্গকিলোমিটার।

বিজ্ঞাপন

সে সময় এখানে ১০ লাখ লোক বাস করত বলে ধারণা করা হয়।

মুঘল-পরবর্তী যুগে ঢাকা প্রায় ১৯০ বছর ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকে। ১৭৭২ সালে ঢাকা জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় আকার ও জনসংখ্যা উভয় দিক থেকেই ঢাকা ছোট হয়ে আসে। এর আয়তন মাত্র ২১ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা মাত্র ৫০ হাজারে দাঁড়ায়। তবে ১৯ শতকের মধ্যভাগে ব্রিটিশ শাসকরা ঢাকার উন্নয়নের দিকে নজর দিলে ঢাকা আবারও আয়তন ও জনসংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৪৭ সালে ঢাকা পূর্ববঙ্গের রাজধানী হিসেবে পাকিস্তানের অন্তর্গত হয় এবং ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ ঢাকাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুযায়ী ঢাকাকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
 
ঢাকা প্রাচীন শহর হলেও স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে এখানে তেমন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। ব্রিটিশ শাসনামলে রেলপথের উন্নয়ন হলেও সড়কপথ, নৌপথসহ ভৌত অবকাঠামোগত কোনো ধরনের উন্নয়ন হয়নি। আজকের এই আধুনিক ঢাকায় উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয় স্বাধীনতা-পরবর্তী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে।
 
১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়। তখন ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৬ লাখ। বর্তমানে এর জনসংখ্যা দুই কোটির বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ঢাকা শহরে ছয় লাখ ১২ হাজার মানুষ যুক্ত হয়। এভাবে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকা শহরের জনসংখ্যা হবে প্রায় তিন কোটি। বিবিএসের ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৩ হাজার ৫০০ মানুষের বসবাস। জনসংখ্যার এই ঘনত্ব অতিমাত্রায় অস্বাভাবিক।
 
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ প্রতিবছরের মতো ২০২১ সালেও ‘বৈশ্বিক বসবাস যোগ্যতা শীর্ষক জরিপ ২০২১’ প্রকাশ করেছে। বিশ্বের বড় বড় ১৪০টি শহরের মধ্যে বসবাসের উপযোগী শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম। এ ছাড়া বিশ্বের প্রধান শহরগুলোর বসবাসযোগ্যতা নিয়ে যে কয়টি জরিপ হয়েছে, সেগুলোর ভিত্তিতে ঢাকার অবস্থান বায়ুদূষণে দ্বিতীয়, জনসংখ্যা ও কম নিরাপত্তায় ষষ্ঠ, যানজটে নবম এবং উদ্ভাবনে ৫০০ শহরের মধ্যে ৪৪৯তম। এই জরিপের ফলাফলেই দৃশ্যমান হয়, এখানে বসবাসরত মানুষ সীমাহীন সমস্যায় জর্জরিত অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। এই অবস্থান থেকে উন্নতি করতে হলে ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি।  
 
বর্তমান ঢাকা : ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ায় ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়। বর্তমানে ঢাকায় গ্রাম বলতে কিছু নেই। এর প্রতিটি এলাকাই শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিস-প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাট-বাজার, শপিং মলসহ বিভিন্ন স্থাপনার বেশির ভাগই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। দেশের প্রয়োজনীয় প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত।
 
বেসরকারি স্থাপনাগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিকসামগ্রী, নিটওয়্যার, টেক্সটাইল, সিরামিকসহ অন্যান্য শিল্পের অসংখ্য কারখানা, ৫০টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ভালো মানের ৩৫টির বেশি বেসরকারি হাসপাতাল, অসংখ্য মার্কেট ও শপিং মল, বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক ও বীমার সদর দপ্তর, বিদেশি সব দূতাবাস, দেশের অন্যান্য স্থানে অবস্থিত বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর ঢাকায় অবস্থিত।
 
জনবহুল বাংলাদেশের মানুষের অধিকতর কর্মসংস্থান ঢাকায়। বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই ঢাকায় অবস্থিত। এ ছাড়া মানুষের মৌলিক চাহিদার সব উপকরণ ঢাকায় হাতের নাগালে পাওয়া যায়। এ সব কারণেই সাধারণত মানুষ ঢাকামুখী হয়। এই শহরে যারা নতুন করে আসছে তাদের বেশির ভাগই দরিদ্র। ফলে তারা আর্থিক কারণে শহরে নিজেদের নাগরিক সুবিধা গ্রহণ করতে পারছে না, আবার নগরের সামগ্রিক পরিবেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছে না। উন্নত শহরগুলোতে যেখানে ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে এক ঘণ্টারও কম সময়ের প্রয়োজন হয়, সেখানে ঢাকায় এক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঢাকা শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় ঢাকা শহর থেকে অধিক জনসংখ্যার চাপ কমানো এখন সময়ের দাবি। রাজধানী ঢাকা থেকে অধিক জনসংখ্যার চাপ কমানোর বিষয়ে নিম্নে বর্ণিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে : 
 
ক) ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা এবং বিভাগীয় শহরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন। যানজটের নগরী ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে বর্তমান সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মেট্রো রেল প্রকল্প এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা শহরের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
 
রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো নিম্নরূপ : 
► ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ সহজীকরণের জন্য নির্মিত পদ্মা সেতু একটি মেগাপ্রকল্প। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের রাজধানী ঢাকায় গমনাগমন সহজ হবে এবং তাদের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে।
 
► ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী ইন্টারসেকশন থেকে মাওয়া পর্যন্ত এবং পাচ্চর-ভাঙ্গা অংশ ধীরগতির যানবাহনের জন্য উভয় পাশে পৃথক লেনসহ চার লেনে উন্নীতকরণ।  
 
► জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা জাতীয় মহাসড়ক ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনসহ চার লেনে উন্নীতকরণ।
 
► ১৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর জাতীয় মহাসড়ক ধীরগতির যানবাহনের জন্য উভয় পাশে পৃথক লেনসহ চার লেনে উন্নীতকরণ।
 
► ২২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা (কাঁচপুর)-সিলেট জাতীয় মহাসড়ক ধীরগতির যানবাহনের জন্য উভয় পাশে পৃথক লেনসহ চার লেনে উন্নীতকরণ।  
 
সরকারের গৃহীত উপরোক্ত পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোতে যাতায়াত আরো সহজতর হবে, ফলে বিভাগীয় শহর থেকে ঢাকামুখী প্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
 
ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো হলো গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইল। এসব জেলার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার এমনভাবে উন্নয়ন ঘটাতে হবে, যাতে তাদের কর্মস্থল ঢাকায় হলেও নিজ বাড়ি বা এলাকা থেকে প্রতিদিন অল্প সময়ের মধ্যে ৪০-৬০ মিনিটের মধ্যে ঢাকায় অফিস করতে পারে। এ ক্ষেত্রে রেলপথকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
 
খ) বিভাগীয় শহর থেকে রাজধানী ঢাকার রেলওয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা : বাংলাদেশে ১,৮৩৮ কিলোমিটার মিটারগেজ এবং ৬৮২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ রয়েছে। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২,৬০৬.৫৯ কিলোমিটার রেলপথ বিদ্যমান ছিল। বাংলাদেশে বর্তমানে ২,৯৫৫.৫৩ কিলোমিটার রেলপথ (বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসহ) রয়েছে। বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নতুন করে ৪৩৫.৫৩ কিলোমিটার রেলপথ সংযোজিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৭২ কিলোমিটার পদ্মা রেলওয়ে প্রজেক্ট উল্লেখযোগ্য এবং এ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
 
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশে দ্রুতগামী ট্রেনের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে সাংহাই ম্যাগলেভ ট্রেন (Shanghai Maglev Train), জি ট্রেন (G-Series Trains (Chinese), ইউরো স্টার ট্রেন (Eurostar Train) খুবই সমাদৃত এবং জনপ্রিয়। এই ট্রেনগুলোর গড় গতিসীমা ঘণ্টায় ২০০-৩৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
 
বাংলাদেশে বর্তমানে যে রেলওয়ে অবকাঠামো আছে তা অতিসত্বর পরিবর্তন করা প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দ্রুতগামী ট্রেন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমরা ইলেকট্রিক ট্রেনকে বিবেচনায় নিয়ে রেলের অবকাঠামো পরিবর্তন করে দ্রুতগামী ট্রেন প্রতিস্থাপন করতে পারি। এ ছাড়া ইলেকট্রিক ট্রেন পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় যুগোপযোগী ভূমিকা রাখতে পারবে। বিভাগীয় শহরগুলোর সঙ্গে দ্রুতগামী ট্রেন দ্বারা যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে যাতায়াত সময় এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টায় কমিয়ে আনা গেলে ঢাকায় বসবাসের চাপ বহুলাংশে কমে যাবে।  
 
গ) ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে পরিকল্পিত আবাসনব্যবস্থা প্রণয়ন : ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে স্যাটেলাইট টাউন নির্মাণ করতে হবে। প্রতিটি স্যাটেলাইট টাউনে পরিবেশবান্ধব ইমারত তৈরি করতে হবে। এসব ইমারত তৈরিতে Horizontal Extension-এর চেয়ে Vertical Extension-এর দিকে বেশি নজর দিতে হবে। ইমারতগুলোতে কমপক্ষে ৩০-৪০ তলা ভবন তৈরি করে তার মধ্যে ২০০-৩০০ ফ্ল্যাট নির্মাণ করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এসব স্যাটেলাইট টাউন থেকে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অতি অল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য উন্নতমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাব্যবস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
 
ঘ) এলাকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সরকারি দপ্তরকে ঢাকা থেকে ওইসব এলাকায় স্থানান্তর করতে হবে। যাতে ওই দপ্তরে কর্মরত জনবল সরেজমিনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।  
 
ঙ) রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিকসামগ্রী, নিটওয়্যার, টেক্সটাইল, সিরামিকসহ অন্যান্য ভারী শিল্প-কারখানা বাধ্যতামূলকভাবে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে স্থানান্তর করতে হবে। কেননা এসব ভারী শিল্প-কারখানার বেশির ভাগই রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত। এসব শিল্প-কারখানায় কর্মরত সব শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা তাদের কর্মস্থলের আশপাশেই পরিবার-পরিজনসহ বসবাস করেন। বর্তমান ঢাকা শহরে বসবাসরত জনসংখ্যার বেশির ভাগই এসব শিল্প-কারখানায় কর্মরত। তাই এসব শিল্প-কারখানা ঢাকা থেকে স্থানান্তর করা হলে ঢাকার জনসংখ্যাও হ্রাস পাবে এবং ঢাকাকে আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সহজ হবে।
 
চ) ভালো মানের সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তর :   বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৮টি, যার মধ্যে ৯টি ঢাকায় অবস্থিত এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭৩টি, যার মধ্যে ৫০টি ঢাকায় অবস্থিত। সরকারি এবং বেসরকারি মিলে সর্বমোট ১৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৯টি (সরকারি ৯+বেসরকারি ৫০) বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকায় অবস্থিত, যেখানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়া করেন। যদিও বেশির ভাগ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সারা দেশে বিরাজমান রয়েছে, কিন্তু বেসরকারি ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয় রাজধানী ঢাকার বাইরে নেই বললেই চলে। ভালো মানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা অথবা অন্য কোনো জেলা অথবা বিভাগীয় শহরে স্থানান্তর করা যায়, তাহলেও রাজধানী ঢাকা থেকে কিছুটা জনসংখ্যা হ্রাস করা সম্ভব।  
 
ছ) প্রধান প্রধান হাসপাতাল ঢাকায় : ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় পঙ্গু হাসপাতালসহ বড় বড় সরকারি হাসপাতাল ঢাকায় অবস্থিত। বেসরকারি বড় হাসপাতালের প্রায় সবই (যেমন―স্কয়ার হাসপাতাল, সিটি হাসপাতাল, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, ইউনাইটেড হাসপাতাল ইত্যাদি) ঢাকায় অবস্থিত। ভালো মানের সব হাসপাতাল ঢাকায় অবস্থিত হওয়ায় রোগ নির্ণয়ের বড় বড় যন্ত্রপাতি ঢাকায় এবং নামকরা ডাক্তাররা সব ঢাকায় অবস্থান করেন। ফলে রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবার ভালো চিকিৎসার আশায় ঢাকামুখী হয়ে থাকে। এসব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ঢাকার বাইরে স্থানান্তর অথবা ওই মানের হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যদি দেশের অন্য বড় শহরগুলোতে স্থানান্তর অথবা নির্মাণ করা সম্ভব হয়, তাহলেও ঢাকা শহরের জনসংখ্যার আধিক্য থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।
 
জ) বিমানবন্দর : বাংলাদেশে মাত্র তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং  সিলেটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।  এর মধ্যে ঢাকায় অবস্থিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাংলাদেশের প্রধান বিমানবন্দর। দেশের প্রধান বিমানবন্দর হওয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশির ভাগ ফ্লাইট এই বিমানবন্দরে ওঠানামা করে। ফলে আকাশপথে বিদেশগামী এবং দেশে আগত বেশির ভাগ মানুষই এই বিমানবন্দর ব্যবহার করে থাকে। ফলে ঢাকায় মানুষের অবস্থান বৃদ্ধি পায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাশাপাশি যশোর ও সৈয়দপুরে অবস্থিত অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে উন্নত করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করতে পারলে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপর থেকে কিছুটা চাপ কমবে। ফলে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।
 
ঝ) জাতিসংঘের সংস্থা ইউএন হ্যাবিটেটের (বসতিবিষয়ক সংস্থা)  হিসাবে একটি আদর্শ শহরে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ সবুজ গাছপালা, ১৫ শতাংশ এলাকায় জলাভূমি এবং ২০ শতাংশ এলাকায় সড়ক থাকতে হবে। যেখানে ঢাকা শহরে মাত্র ২ শতাংশ সবুজ গাছপালা রয়েছে, যা দিন দিন আরো কমছে। আর সড়ক আছে মাত্র ৮ শতাংশ এলাকাজুড়ে। ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে মানুষের বসবাস উপযোগী করতে সবুজ বনায়ন বাড়াতে হবে। নদ-নদী এবং খালগুলো খননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং যানজটমুক্ত শহর গড়ার লক্ষ্যে সড়কপথের আয়তন বৃদ্ধি করতে হবে।
 
উপসংহার : ঢাকা শহরকে বসবাসের উপযোগী শহর হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। জেলা-উপজেলা শহরগুলোতে সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমাতে হবে। মানুষের কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। নতুনভাবে নির্মিত শিল্প-কারখানাগুলো আঞ্চলিক শহরে নির্মাণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হলেও রাজধানী ঢাকাকে বসবাস উপযোগী করে গড়ে তোলার দিকে আমাদের সবাইকে নজর দিতে হবে।
 
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুদক্ষভাবে দেশ পরিচালনা করায় বাংলাদেশ ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে (এলডিসি) উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রাথমিক সুপারিশ পায়। ২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করে এবং গত ২৪ নভেম্বর ২০২১ তারিখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশ সম্পর্কে সিডিপির সুপারিশ গ্রহণ করেছে। ফলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ হবে পুরোপুরি উন্নয়নশীল দেশ। এখন উন্নয়নশীল দেশ হতে আরো সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেখানে রাজধানী ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা ব্যতীত সামনে অগ্রসর হওয়া সম্ভবপর হবে না।
 
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ‘গ্রাম হবে শহর’―এ স্লোগান নিয়ে গ্রামকে শহরে রূপান্তরের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা সত্যিই সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে রাজধানী ঢাকাকে বসবাস উপযোগী করে তোলা আরো সহজতর হবে এবং সমৃদ্ধিশালী এক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।


সাতদিনের সেরা