kalerkantho

সোমবার ।  ১৬ মে ২০২২ । ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৪ শাওয়াল ১৪৪৩  

'আমি যা হতে পারিনি তাই মাসুদ রানা'

শাহেদ ইকবাল   

২০ জানুয়ারি, ২০২২ ২০:১৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



'আমি যা হতে পারিনি তাই মাসুদ রানা'

কাজী আনোয়ার হোসেন

আশির দশকে বিটিভির একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি নিজেকে মাসুদ রানা মনে করেন কি-না। উত্তরে স্বভাবসুলভ মৃদু হাসিতে তিনি জানিয়েছিলেন, না, আমি নিজেকে মাসুদ রানা মনে করি না। আমি তাকে সৃষ্টি করেছি। আমি নিজে যা হতে পারিনি তাই মাসুদ রানা।

বিজ্ঞাপন

সেই ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে তিনি সস্ত্রীক হাজির হয়েছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী ফরিদা ইয়াসমিনের উপস্থিতিতে একটি আধুনিক গানও পরিবেশন করেছিলেন। একদা চলচ্চিত্রে প্রবল জনপ্রিয় তাঁর একটি গান 'এই যে আকাশ এই যে বাতাস' গানটির ধারণকৃত দৃশ্যও দেখানো হয়েছিল।

তিনি কাজী আনোয়ার হোসেন। বাংলা ভাষায় রহস্যসাহিত্যের জগতে কিংবদন্তিতুল্য চরিত্র 'মাসুদ রানা'র স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন। ষাটের দশকের মধ্যভাগে 'মাসুদ রানা' নামের এই গুপ্তচর চরিত্র তিনি সৃষ্টি করেন। যার পরিচয় দিতে গিয়ে প্রতিটি পর্বে একটি বাক্য ব্যবহার করতেন যা পাঠকের হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল। বাক্যটি হলো, 'টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না'। বিস্ময়করভাবে কথাগুলো মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনের বেলায়ও সত্য। তবে তিনি শুধু টানতেন না, বাঁধনেও জড়াতেন। এক জীবনে কতজনকে যে বাঁধনে জড়িয়েছেন, কতজনকে লেখক বানিয়েছেন, থ্রিলার জগতে টেনে এনেছেন, তার কোনো লেখাজোখা নেই।

কাজী আনোয়ার হোসেনের জন্ম হয়েছিল এক সম্ভ্রান্ত সংস্কৃতিবান পরিবারে। বাবা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন ও মা সাজেদা খাতুনের ঘরে ১৯৩৬ সালের ১৯ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। ডাকনাম ছিল নবাব। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট গ্রেগরি স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন। জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দুই বোন সনজীদা খাতুন ও ফাহমিদা খাতুন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী। কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেও বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। চমৎকার বাঁশি ও গিটার বাজাতেন, ক্যামেরায় ছবি তুলতেন, অবসরে ধানমন্ডি লেকে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতেন। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে শেষমেষ হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি স্পাই চরিত্র মাসুদ রানার স্রষ্টা। এই পরিচয়ই তাঁকে অনন্য এক উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করে।

মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম উপন্যাস 'ধ্বংসপাহাড়' প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালের মে মাসে। এই 'ধ্বংসপাহাড়' লিখতে গিয়ে কাজী আনোয়ার হোসেন মোটরসাইকেলে চেপে দীর্ঘ দশ মাস কাপ্তাই-রাঙামাটি ঘুরে বেড়ান। এ ঘটনা থেকে অনুধাবন করা যায় কাহিনিতে প্রাণ সৃষ্টি করার জন্য কি পরিমাণ নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন এই সাহিত্যসাধক। এরপর তাঁকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। প্রবল পাঠক চাহিদা পূরণ করতে তুমুল জনপ্রিয় এই সিরিজের সাড়ে চার শরও বেশি বই তাঁকে প্রকাশ করতে হয়। এই ধারাবাহিকতায় মাসুদ রানা যেমন হয়ে ওঠে একটি আইকন চরিত্র, তেমনি সেবা প্রকাশনীও হয়ে ওঠে একটি লেখক সৃষ্টির কারখানা। কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেও লিখেছেন, অন্যদের দিয়েও লিখিয়েছেন। মাসুদ রানা সিরিজের পাশাপাশি তিনি আরো একটি জনপ্রিয় কিশোর থ্রিলার 'কুয়াশা' সিরিজের প্রায় ৭৬টি বই রচনা করেন যা সমধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, অনুবাদক ও প্রকাশক।

কাজী আনোয়ার হোসেন এমন একটি সময়ে রহস্য সাহিত্যের হাল ধরেন, যেখানে তিনি ছিলেন প্রায় নিঃসঙ্গ সৈনিক; বলতে গেলে সংসপ্তক। কিন্তু প্রবল কল্পনাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে তিনি অবিচলভাবে লক্ষ্যে অগ্রসর হন। সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক গদ্যভাষা উদ্ভাবন করেন যা পরবর্তীতে তরুণ রহস্যলেখকদের কাছেও অনুসরণীয় রীতি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ কালপর্বে কাজী আনোয়ার হোসেনের এই উত্থান নিঃসন্দেহে ভাষা ও গদ্যের ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে থাকবে।  
বিস্ময়কর হলেও সত্য যে এই সব্যসাচী মানুষটি বাংলা চলচ্চিত্রেও প্লেব্যাক করেছেন। সুরকার রবীন ঘোষ ও সত্য সাহার সুরে অসাধারণ সব গান গেয়েছেন। কুয়াশা চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখে ১৯৭৪ সালে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেছেন। অর্জন করেছেন সিনেমা পত্রিকা ও জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কারও।

প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। গত ১০ জানুয়ারি তাঁকে বারডেম হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গতকাল (১৯ জানুয়ারি) তিনি জাগতিক সকল মায়া কাটিয়ে চলে যান না-ফেরার দেশে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

রহস্য সাহিত্যিকের জীবনটাও কি রহস্যঘেরা হয়? তা নাহলে এক জীবনে এত কাকতালীয় হবে কেন? ১৯ তারিখে যাঁর জন্ম ১৯ তারিখেই তাঁর মৃত্যু হবে কেন? কর্কট রাশির জাতক হয়ে কর্কট রোগেই তাঁর মৃত্যু হবে কেন? এটাও কি কাকতালীয়?  

কিংবদন্তিতুল্য 'মাসুদ রানা' চরিত্রের স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনের শরীরী মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে যে অমরতার সূচনা হয়েছে, সে অমরতা কখনও ঘুচবে না। যে শূন্যতা রেখে গেছেন সে শূন্যতাও আর পূরণ হবে না। বাংলা ভাষার রহস্যপাগল বিপুল পাঠকশ্রেণির হৃদয়ের মণিকোঠায় তিনি চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।  



সাতদিনের সেরা