kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

৫০০ সাঁকোর কারিগর

বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার জাহিদুল ইসলাম। চরাঞ্চলের মানুষের পারাপারের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য বাঁশের সাঁকো বানিয়ে চলেছেন। এ পর্যন্ত বানিয়েছেন ৫০০-এর বেশি সাঁকো। লিখেছেন জিয়াউর রহমান

১৯ অক্টোবর, ২০২১ ১০:০৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৫০০ সাঁকোর কারিগর

ছবি : ঠান্ডা আজাদ

চার মাস আগেও কলাগাছের ভেলায় চড়ে খাল পার হতো তিন গ্রামের মানুষ। স্কুলগামী শিশুদের দুর্ভোগের অন্ত ছিল না। দুর্ভোগ লাঘবে তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন জাহিদুল ইসলাম। বললেন, ‘অনেক দিন তো কষ্ট করেছেন। এবার আমার সঙ্গে হাত লাগান। কষ্ট কমে যাবে।’ ফলাফল স্বেচ্ছাশ্রমে লোহাগড়া গ্রামের গড়াখালের ওপর নির্মিত হলো বাঁশের সাঁকো। একটি কিংবা দুটি নয়, বগুড়া ও এর আশপাশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ রকম প্রায় ৫০০ সাঁকো বানিয়েছেন জাহিদুল।

১২ বছর বয়স থেকেই
বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার দিগদাইড় গ্রামে জন্ম জাহিদুলের। তাঁর দাদা জহির উদ্দিন মোল্যা দিগদাইড় বিলে নৌকায় মানুষ পারাপার করে দিতেন। দাদা মারা যাওয়ার পর বাবা মোবারক আলী কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিল পারাপারে মানুষের ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। ১৯৮০ সালে দিগদাইড় বিলের ওপর বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে স্থানীয়রা। তখন কিশোর জাহিদুল গ্রামের মানুষের সঙ্গে ওই নির্মাণকাজে অংশ নেন। ১৯৮১ সালে জাহিদুলের বাবা মারা যান। জাহিদুল তখন বালুয়াহাট সুফিয়া হাফিজিয়া মাদরাসায় পড়তেন। বললেন, ‘বাড়ির কাছে খাল ছিল। বর্ষায় সেই খাল সাঁতরে মাদরাসায় যেতে হতো। আমার বয়স তখন ১২। বাড়িতে একটি পুরনো নৌকা ছিল। একসময় সেই নৌকায় সহপাঠীদের নিয়ে খাল পার হয়ে মাদরাসায় যাওয়া শুরু করলাম। কিন্তু খাল পারাপারে প্রতিবেশীদের কষ্ট দেখে খারাপ লাগত। চিন্তা করলাম খালের ওপর একটা বাঁশের সেতু হলে কেমন হয়। এলাকার মুরব্বিদের সঙ্গে কথা বলি। সবাই সায় দিলেন। এরপর পাড়া-প্রতিবেশী মিলে খালের ওপর বাঁশের সেতু বানিয়ে ফেললাম।’ গল্পটি প্রায় ৪০ বছর আগের। এখন জাহিদুলের বয়স ৫৪। আজও থামেননি। 

কত সাঁকো বানিয়েছেন?
প্রশ্নটি প্রায়ই শুনতে হয় তাঁকে। তাই একটি ডায়েরিতে ২০১২ সাল থেকে বানানো সাঁকোর হিসাব লিখে রাখছেন। সেই খাতায় ১৯৭টি স্থানে বাঁশ ও কাঠের সাঁকো তৈরির কথা আছে। এর মধ্যে ২০১২ সালের আগে তিনি যেসব সাঁকো বানিয়েছেন, তার যতগুলো মনে করতে পেরেছেন, সেগুলোর কথাও লিখে রেখেছেন। জাহিদুলের দাবি, গত ৪০ বছরে অন্তত ৫০০টি সাঁকো তৈরি করেছেন তিনি। ‘আগে তো লিখে রাখতাম না। অনেক সাঁকো নির্মাণের দু-তিন বছর পর নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় কয়েক বছরের মধ্যে কালভার্ট বা পাকা সেতু হয়েছে।’ জাহিদুল জানালেন, শুধু কাঠ-বাঁশের সাঁকো নয়, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ৬৫টি রাস্তা সংস্কার, চরে যাতায়াতের জন্য ১১২টি স্থানে কয়েক শ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া ১৫টি মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান সংস্কার করেছেন। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, দরিদ্র মানুষকে আর্থিক সহায়তাও করেছেন। তাঁর এই কার্যক্রম বগুড়া জেলা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে আশপাশের জেলাতে।

যেভাবে কাজটি করেন
নদী-নালা বা খাল পারাপারে মানুষের দুর্ভোগের কথা জানতে পারলে জাহিদুল ছুটে যান সেখানে। আবার অনেক এলাকার মানুষ নিজেরাই যোগাযোগ করে জাহিদুলের সহযোগিতা চায়। তারপর সংঘবদ্ধ করেন এলাকার মানুষকে। গ্রামে উঠান বৈঠক করে চান সবার সহযোগিতা। কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ বাঁশ দিয়ে, কেউ সুতলি-পেরেক নিয়ে এগিয়ে আসে। আর জাহিদুল সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বানিয়ে ফেলেন কাঠ বা বাঁশের সাঁকো। এসব সাঁকোর মাধ্যমে এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের সেতুবন্ধ গড়ে তুলেছেন। এ ছাড়া রাস্তার ধারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন জায়গায় জাহিদুল এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার তালগাছ এবং ঔষধি গাছের চারা লাগিয়েছেন।

জাহিদুল বলেন, ‘টাকার অঙ্কে ধরলে ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয় একেকটি সাঁকোতে। প্রতিটি সেতু তৈরিতে আমি ব্যক্তিগতভাবে সামান্য টাকা দিই। গায়ে-গতরে খাটি, নেতৃত্ব দিই।’

এসবের বাইরে মসজিদও সংস্কার করেন জাহিদুল। স্থানীয়রা জানায়, জাহিদুল যখন কোনো মসজিদ সংস্কারের কথা ভাবেন তখন সেখানে গিয়ে কিছুদিন ইমামতি করেন। গ্রামের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। এভাবে সবার সহযোগিতায় মসজিদ পুনর্নির্মাণ করেন। এখন তিনি লোহাগড়া পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদে ইমামতি করছেন। কিছু দিনের মধ্যে মসজিদটি সংস্কারের কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন মসজিদ কমিটির সভাপতি মোখলেছার রহমান।

করোনাকালেও থেমে নেই
গাবতলীর দুর্গাহাটা বাজার। ইছামতী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই বাজার থেকে আধা কিলোমিটার দূরে বঠিয়াভাঙ্গা গ্রাম। প্রতিদিনই বঠিয়াভাঙ্গার মানুষকে নানা প্রয়োজনে আসতে হয় দুর্গাহাটা বাজারে। বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর থাকে ইছামতী। তখন বঠিয়াভাঙ্গাসহ আশপাশের আরো ১০ থেকে ১২টি গ্রাম অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। গ্রামের বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, করোনাকালে জাহিদুলের প্রচেষ্টায় ইছামতীর বুকে সেতু হওয়ায় আমাদের ভোগান্তির অবসান হয়েছে। কিছুদিন আগে জাহিদুল গাবতলীর টিওরপাড়া-সর্ধনকুটি গ্রামের মানুষের পারাপারের জন্য গজারিয়া খালের ওপর দুটি বাঁশের সেতু নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া সোনাতলার দিগদাইড়-বাইশা দেড় কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা নির্মাণ করেছেন। সোনাতলার হাড়িয়াকান্দি, গাবতলীর কৃঞ্চচন্দ্রপুর গ্রামের আড়াই কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার করেছেন।

স্ত্রীর কাঁধে সংসার
নিজে তেমন সচ্ছল নন। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া কয়েক বিঘা জমিতে চাষাবাদ করে সংসার চলে তাঁর। তিন ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা আর সংসার দেখভাল করেন মূলত স্ত্রী শাহীন বেগম। কারণ সেবামূলক কাজে জাহিদুলকে বেশি সময় বাইরে থাকতে হয়। তাঁর স্ত্রী শাহীন বেগম বলেন, ‘অর্থাভাবে মাদরাসা থেকে উনাকে (জাহিদুল) পড়াশোনা ছাড়তে হয়েছে। সংসারের কাজেও তেমন মন নেই। এর পরও লোকটা ধান-চাল বিক্রি করে অন্যের মেয়ের বিয়ের খরচ দিচ্ছে, কোনো গ্রামে সেতুর জন্য মানুষ কষ্ট করছে জেনে বাজার খরচের টাকায় বাঁশ কিনে নিয়ে গিয়ে হাজির হচ্ছে। তার এসব কাজে ত্যক্ত-বিরক্ত হই। আবার লোকে যখন তাকে ভালোমানুষ বলে যখন ডাকে, তখন গর্ব হয়।’

তাঁরা বললেন
জাহিদুলের ছোট ভাই জুয়েল মোল্যা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ভাইয়াকে সেবামূলক কাজ করতে দেখছি। বাধা-নিষেধ করলেও শোনেননি।’ দিগদাইড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী তৈয়ব শামীম বলেন, ‘অন্যের বিপদ-আপদে ছুটে আসাই জাহিদুলের কাজ।’ সোনাতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মিনহাদুজ্জামান লীটন জানান, যেসব কাজ সরকারিভাবে করার কথা, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তা করেন জাহিদুল।

স্বীকৃতিও পেয়েছেন
২০১১ সালে গাবতলীর নেপালতলী গ্রামবাসী ও শিবগঞ্জ উপজেলার তালিবপুর বালুপাড়ার মানুষ তাঁকে সংবর্ধনা দিয়েছে। গত বছর বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তেও তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছে। সেখানে একটি মোটরসাইকেলও উপহার দেওয়া হয়েছে তাঁকে।

তিনি চান
জাহিদুল বললেন, ‘আমি নদীপারের মানুষ। মানুষের পারাপারের কষ্ট দেখে আমার কষ্ট লাগে। তাই সাঁকো বানাই। সদিচ্ছা আর আন্তরিকতা থাকলে যেকোনো ভালো কাজ করা সম্ভব। ৫৪ বছর বয়সে এসে অসহায় বৃদ্ধ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে খারাপ লাগছে। তাই সামনে একটি বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণের চিন্তা আছে।’



সাতদিনের সেরা