kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন ও ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলা

মোঃ ইমরান চৌধুরী   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২০:১৩ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন ও ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলা

বাংলাদেশে বর্তমানে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যমান। বিভিন্ন সময়ে প্রণীত আইনের আওতায় এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সবশেষ ২০১০ সালে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করা হয় যেখানে বলা হয়েছে, বেসরকারিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে সেখানে উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ এর উক্ত আইনটি বর্তমানে সংশোধনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের একজন সদস্য, কমিশনের একজন সাবেক চেয়ারম্যান ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি কাজ করছে। ইতিমধ্যে এই কমিটি একটি খসড়াও তৈরি করেছে যা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

যে খসড়া আইনটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেখানে ট্রস্টি বোর্ডে তেত্রিশ জন সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে যার মধ্যে পাঁচজন শিক্ষাবিদ থাকতে হবে। এছাড়া উপাচার্য নিয়োগ সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় হবে। উপাচার্যকে সকল আর্থিক ক্ষমতা দেওয়ার বিধান রাখার কথাও বলা হয়েছে। এসব প্রস্তাবনা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের তাদের স্থাপিত প্রতিষ্ঠানে গুরুত্ত্বহীন করা অথবা বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমুহ ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়ার মত একটি নেতিবাচক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ধরা যায়।

২০১০ সালের বিদ্যমান আইনে ট্রাস্টি বোর্ড/ উদ্যোক্তাদের তেমন কোন ক্ষমতাই দেওয়া হয় নাই। এরপরও ট্রাস্টি বোর্ডের হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ এবং গুজব রয়েছে, যেমন- উপাচার্যগণ ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছুই করতে পারেনা, ট্রস্টি বোর্ড বিভিন্নভাবে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা করে থাকে, ট্রাস্টি বোর্ড ক্রয়-বিক্রয়, নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানাভাবে হস্তক্ষেপ করে থাকে, ইত্যাদি।

২০১০ সালে প্রণীত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ভুলের কারণেই এসব অনিয়ম ও অভিযোগের তীর ট্রাস্টি বোর্ডের দিকেই নিক্ষেপ করা হচ্ছে।

মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা বা স্থাপনের জন্য ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তটি ২০১০ সালের আইনের বড় একটি ভুল আইন ছিল এবং এই ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের বিধান রাখার ফলেই এমন সংকট তৈরি হয়েছে। কারণ ট্রাস্টি বোর্ড এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখান থেকে নিয়ম অনুযায়ী কোন আর্থিক বা অন্যান্য কোন প্রকার সুবিধা কেউ গ্রহণ করতে পারবেনা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে যারা শিল্পপতি তাদের কথা ভিন্ন হতে পারে কিন্ত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পপতিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যারা একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে গিয়ে নিজেদের সর্বোস্ব বিনিয়োগ করেছে, কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, জীবনের মূল্যবান সময়, মেধা ব্যয় করেছে অথচ তাদের কোন অধিকার ২০১০ সালের আইনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে যখন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ট্রাস্টি বোর্ড কোন হস্তক্ষেপ করতে যায় তখনই সেটা ২০১০ সালের আইনের চোখে অপরাধ বা আইন পরিপন্থী কাজে পরিণত হয়। ট্রাস্টি বোর্ডের নামে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরকম অভিযোগ ইউজিসি বা সরকারের নিকট রয়েছে। এসব অভিযোগ বিদ্যমান আইনের ভুলের কারণেই সৃষ্টি হয়েছে। এরকম একটি ভুল আইনের সংশোধনের মাধ্যমে আবারো ট্রাস্টি বোর্ড ব্যবস্থা বিদ্যমান রেখে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও উদ্যোক্তাদের বিভিন্নভাবে আটকানো বা গুরুত্ত্বহীণ করার নানাবিধ প্রচেষ্টা মাত্র। এতে আইনের চোখে আরও দ্বিগুণ হারে

অভিযোগ ও অপরাধ বৃদ্ধি পাবে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে।

সত্যিকারে উচ্চ শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য বাস্তব অবস্থার নীরিখে আইন প্রণয়ন অতীব জরুরী। দেশের প্রাইভেট শিক্ষা সেক্টরকে মালয়েশিয়া, ভারতের মত দেশি-বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মূখরিত করার জন্য আইনি ব্যবস্থায় অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। যাতে এ খাতেও বিদেশী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স বা গার্মেন্টস সেক্টরের মত অর্থনৈতিক বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়। এখানে নেতিবাচক চিন্তা করার কোন সুযোগ নেই কারণ সময় এখন বদলেছে। এক সময় ইউজিসি বা সরকার দূরশিক্ষণ বা অনলাইন শিক্ষা কোনভাবেই সমর্থন করতনা কিন্তু বর্তমানে দূরশিক্ষণ বা অনলাইন শিক্ষা সরাসরি সরকার এবং ইউজিসির আদেশেই পরিচালিত হচ্ছে। এটাই বাস্তবতা। যেখানে অন্যান্য দেশ তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমগ্র পৃথিবীর জন্য উম্মুক্ত করে দিচ্ছে সেখানে আমাদের দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সংশোধনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গন তো দূরে থাক দেশের অভ্যন্তরেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংকীর্ণ রুপ দানের পায়তারা চলছে।

পাশের দেশ ভারতে তিন পদ্ধতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যায়-১) বিদ্যমান সোসাইটি অ্যাক্টের আওতায় ২) বিদ্যমান ট্রস্টি আইনের আওতায় ৩) কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন আইনের আওতায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও কোম্পানি ও সংস্থার আওতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালিত হচ্ছে। একমাত্র বাংলাদেশেই ট্রাস্টি বোর্ড গঠন ব্যতিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সম্ভব নয়। কিন্তু কেন? কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন বা সংস্থার মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার বিষয়টি আইনে অন্তর্ভূক্ত করা অত্যন্ত জরুরী। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে যে, “কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন বা সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত হলে উদ্যোক্তাদের আর্থিক অনিয়ম বা স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে”। মোটেই অনিয়ম বা স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে না। যদি আইনের মধ্যেই উদ্যাক্তাদের নিয়ম মাফিক আর্থিক সুবিধা বা সম্মানি গ্রহণের ব্যবস্থা থাকে তাহলে অনিয়মের প্রশ্নই উঠেনা। তারপরও যদি কেউ অনিয়ম করে সেক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের নিশ্চয়ই সুযোগ রয়েছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সংশোধনি এমন ভাবেই হওয়া উচিৎ যাতে কেউ আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অনিয়ম করার সুযোগে না পায় এবং যুগোপযুগি আইনি কাঠামোর মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চ শিক্ষার এক একটি মজবুত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

বাংলাদেশে স্থাপিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকারি কোন সহায়তা প্রদান করা হয় না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যায়গুলোকে প্রতি বছর মোটা অংকের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, যেখানে শিক্ষার্থী প্রতি রাষ্ট্রের খরচ প্রায় তিন থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পিছনে রাষ্ট্রের কোন খরচ নাই। কিন্ত একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানের খুব বেশি তারতম্য নেই । বাস্তবতা হল, বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংয়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলো থেকে এগিয়ে আছে।

কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিকমানের শিক্ষা গবেষণা পরিচালনা শুরু করেছে, সেখানে দেশি বিদেশি শিক্ষক রয়েছে, যা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই। এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন কাঠামো দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। অবকাঠামো, ল্যাব ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এগিয়ে রয়েছে। এসব উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে কেবলমাত্র উদ্যোক্তাদের নিরলস ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। উদ্যোক্তাদের মেধা, স্বপ্ন ও বিনিয়োগের সদিচ্ছার মাধ্যমে বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক সমমানের করার সদিচ্ছা এখানে গভীরভাবে পরিষ্ফুটিত হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধণ করে যে খসড়া আইন প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে এসকল দক্ষতা সম্পন্ন উদ্যোক্তাগণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় নিরুৎসাহিত হবে এবং অদুর ভবিষ্যতে এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সমূহ অন্য কোন শিল্প কল-কারখানা বা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের কাঠামোকে ধীরে ধীরে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অনুরুপ রুপ দেয়া হচ্ছে ফলে বিশ্ববিদ্যালয় নামের অর্থই ধীরে ধীরে সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

ইতিমধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নানা রকম খড়গহস্ত নেমে এসেছে। যেমন- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়র নামের পিছনে তারকা চিহ্ন প্রদান করে দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশিত করে প্রকারান্তরে দেশের ভাবমুর্তিকে ক্ষুন্ন করা হচ্ছে। রেড ষ্টার চিহ্নিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহনে বিদেশে গমন করলে তাদের বিপাকে পড়তে হয়। আসন সংখ্যা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সক্ষমতা থাকলে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল বা সিন্ডিকেট আসন সংখ্যার বিপরীতে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারে। এক্ষেত্রে সীমিত করে দেওয়ার সাথে বিশ্ববিদ্যালয় কথা বা নাম অত্যন্ত বেমানান। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ না থাকলে বা যোগ্যতা সম্পন্ন না পাওয়া গেলে বা নিয়োগ প্রদানে বিলম্ব হলে গণমাধ্যমে সেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামসহ প্রকাশ করা হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হয় যা অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য পদ, কোষাধ্যক্ষ পদ বছরের পর বছর শুণ্য থাকে যেটা কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনা। এসব আচরণ একই দেশের জনগণের সাথে দুই নীতির বহিঃপ্রকাশ। এছাড়া আইন সংশোধন করে যে আইন করার প্রস্তাবনা প্রকাশিত হয়েছে তা প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্কুল কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সামিল।

যে সকল উদ্যোক্তা বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়লগুলো স্থাপন করেছে তারা যদি এগুলো বন্ধ করে দেয় তাহলে কি সরকার এগুলোর দ্বায়িত্ব কোনদিন নিবেন? অথবা যদি নতুন সংশোধনী আইনের কারণে উদ্যোক্তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় তাহলে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কোথায় যাবে? অথবা ভবিষ্যতে যে শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে আসবে তারা কোথায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করবে? এর উত্তর হল, এসকল শিক্ষার্থীরা তখন উচ্চ শিক্ষার জন্য পাশের দেশ ভারতে যাবে, মালয়েশিয়া যাবে, নেপালে যাবে, চীনে যাবে। তাতে লাভ কার আর ক্ষতি কার সেটা সহজেই অনুমেয়। যেখানে আশির দশকে মালয়েশিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে এসে পড়াশুনা করত সেখানে বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী মালয়েশিয়া গিয়ে পড়ালেখা করে। সরকারের দ্বায়িত্বশীলদের এব্যাপারে গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত।

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষার এই দূরাবস্থার জন্য দায়ী কারা? দায়ী তারাই, যারা এধরণের অদূরদর্শী আইন প্রণয়ন করে জাতীর উপর চাপিয়ে দেয়। খুব সুক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বারবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি আইন প্রণেতাদের নিকট মূখ্য বলে বিবেচিত তা হল উদ্যোক্তাদের ধরপাকড় করা। অথচ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে মূখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক নিয়োগ করা, শিক্ষক ও

শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন করা, গবেষণাধর্মী শিক্ষার প্রসার করা, দেশে-বিদেশে কর্ম সংস্থান তৈরি করা, শিল্প কল-কারখানা স্থাপন করা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ইমার্জিং ল্যাব স্থাপন করা, ইত্যাদি।

সত্যি কথা বলতে কি, কোন একটি জন-গোষ্ঠির উপর চাপিয়ে দেয়া আইনি শাসন বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। সেজন্যই বারবার আইন সংশোধনের প্রয়োজন হয়। সুতরাং নতুন করে একতরফা আইন করে চাপিয়ে না দিয়ে সকল পক্ষের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে শিক্ষার উন্নয়ন ও জাতির কল্যাণে আইনের খসড়া প্রণয়ন অতীব জরুরী নতুবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গণে বড় ধরণের বিশৃংখলা দেখা দেবে যা বিষফোড়া হয়ে দাড়াতে পারে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম দূর করার জন্য উদ্যোক্তাদের নিয়ে উদ্যোক্তা বান্ধব আইনের খসড়া প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরী। পাশাপাশি ঐ আইনি কাঠামোয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় কিনা সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, সরকার/ নিয়ন্ত্রন সংস্থার কঠোর তদারকি প্রয়োজন। শুধুমাত্র আইনি সংশোধনের মাধ্যমে বা উদ্যোক্তাদের হাত-পা বেঁধে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষার উন্নয়ন ঘটানো যাবেনা। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাবান্ধব আইনি কাঠামোর মাধ্যমে প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে পাঁচ বছর, দশ বছর বা বিশ বছর মেয়াদী শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতার ভিত্তিতে কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। উক্ত কর্ম পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থা বা সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

দেশে বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষার মান উন্নয়ন, গবেষণাধর্মী ও দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলনের জন্য মঞ্জুরী কমিশন ও সরকারকে উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রথমে দশ থেকে পনেরটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সরকার/ ইউজিসি “প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি উন্নয়ন পাইলটিং প্রকল্প” গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৬০% এবং সরকার ৪০% বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। অথবা সরকারি বিনিয়োগ সম্ভব না হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিনিয়োগে এধরণের পাইলটিং প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।

পাইলটিং প্রকল্পের আওতায় যেসকল কর্মকাণ্ড করা যেতে পারে তা নিম্নে তুলে ধরা হল-

১) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উন্নয়নের ক্ষেত্রে-

ক) আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি খ) অবকাঠামো উন্নয়ন গ) ল্যাবরেটরি স্থাপন, উন্নত যন্ত্রপাতি ক্রয় ও প্রশিক্ষণ ঘ) শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান তৈরি ও শিল্প কল-কারখানা স্থাপন অথবা শিল্প কারখানার সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ঙ) আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ল্যাব স্থাপন চ) টেকনোলজি উন্নয়ন ছ) নিউ ইনভেনশন এবং উদ্ভাবিত পণ্য বাজারজাত করণ ইত্যাদি।

২) সুপ্রতিষ্ঠিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমুহের দেশের প্রতি দ্বায়বদ্ধতা থেকে জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রেঃ

ক) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক অঞ্চলসমুহে গবেষণা ল্যাব স্থাপন খ) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক অঞ্চল সমুহে প্রথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, কারিগরি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন গ) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

সমুহের অঞ্চল ভিত্তিক শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া বা শিক্ষা বঞ্চিত শিশু-কিশোরদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ঘ) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক অঞ্চল সমূহে দক্ষতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি।

যেসকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তারা দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য উল্লেখিত কর্ম পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। যাদের এখনো সক্ষমতা হয়নি তারা দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। সেজন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বর্তমান আইন যুগোপযোগি করে উল্লেখিত পরিকল্পনা সমুহ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন বা সংস্থার আওতায় স্থাপন ও পরিচালনার জন্য আইন সংশোধন করতে হবে। উদ্যোক্তাদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের বিদ্যমান ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হবে। অন্যথায় উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিবাদ-বিরোধিতা লেগেই থাকবে যা শিক্ষার পরিবেশ ব্যহত করবে। শুধুমাত্র কঠোর আইন প্রণয়ন করে উদ্যোক্তাদের নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে দুরে সরিয়ে রেখে বা নিষ্ক্রিয় করে বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষার উন্নয়ন কোন ভাবেই সম্ভব নয়।

কেবলমাত্র বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উদ্যোক্তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান, উদ্দ্যেগতা ও ভবিষ্যৎ উচ্চ শিক্ষা বান্ধব আইন প্রণয়ন, শিক্ষার উন্নয়নে উদ্দ্যেগতাদের কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া এবং উদ্যোক্তাদের সাথে সরকার ও মঞ্জুরী কমিশনের সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমেই বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষার ভবিষ্যৎ সংকট মোবাবেলা করা সম্ভব হবে।

লেখক- চেয়ারম্যান, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ,ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ, বরিশাল।



সাতদিনের সেরা