kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

উন্নত ভবিষ্যতের জন্য চিন্তা করা দরকার

আবুল কাসেম ফজলুল হক   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০২:৫১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উন্নত ভবিষ্যতের জন্য চিন্তা করা দরকার

সমকালীন ইতিহাস নিয়ে প্রতিটি জাতির মধ্যেই বিতর্ক দেখা যায়। বিতর্ক হয় ঐতিহাসিক ঘটনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে। তথ্যকে বিকৃত করার কিংবা সত্যকে মিথ্যা দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা কমই দেখা যায়। কিন্তু আমাদের এখানে গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে মিথ্যা সত্যকে স্থানচ্যুত করে চলছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে সত্য ও মিথ্যা একাকার হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল মহান ঘটনার ইতিহাস দলীয় সংকীর্ণতা, অপরাজনীতি ও হীন স্বার্থান্বেষীদের কবলে পড়ে বিকারপ্রাপ্ত হয়েছে। ধর্মকে যেমন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও তেমনি দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। মিথ্যা প্রচারের প্রতিক্রিয়ায় সামনে আসছে নতুন মিথ্যা। মিথ্যাকে সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মিথ্যাচারীদের মধ্যে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। অতীত নিয়ে যাঁরা মিথ্যাচারী, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কি তাঁরা সত্যনিষ্ঠ? ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা কী রেখে যাচ্ছেন? লোকে মিথ্যা নয়, সত্য অবলম্বন করেই চলতে চায়। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও তা-ই চায়।

অতীতে বাঙালিকে গভীরভাবে ভালোবেসে যাঁরা বাঙালির উন্নতির উপায় সন্ধান করেছেন, তাঁদের কেউ কেউ কোনো কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালিকে বলেছেন ‘আত্মবিস্মৃত’, ‘আত্মভ্রষ্ট’, ‘আত্মঘাতী’। কোনো জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করা হলে সেই জাতির প্রাণশক্তিই বিকৃত হয়ে যায়। বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশকে উন্নতি করতে হলে সত্যই সন্ধান করতে হবে এবং সত্য অবলম্বন করেই চলতে হবে। মনে হয়, সত্যের কেমন যেন একটা অদ্ভুত শক্তি আছে। সেই শক্তির বলে কোনো না কোনো সময় সে মিথ্যার আবরণ ভেদ করে বেরিয়ে আসে। তখন তাকে আর রোধ করা যায় না। কোনো কোনো বই সামনে এলে আমার মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি—‘এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর অমোঘ কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে। ইহারা সহসা যদি বিদ্রোহী হইয়া উঠে, নিস্তব্ধতা ভাঙিয়া ফেলে, অক্ষরের বেড়া দগ্ধ করিয়া একেবারে বাহির হইয়া আসে।’ তথ্য-প্রযুক্তির একালে রবীন্দ্রনাথের এই কথাটি কি মিথ্যা বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে? বলা হয়, জ্ঞানেই শক্তি, জ্ঞানেই পুণ্য।

‘সত্য’ কথাটির নানা অর্থ আছে। ইংরেজিতে Truth-এরও আছে নানা অর্থ।

Fact ও Truth এক নয়।

 absolute truth, relative truth, whole truth, partial truth ইত্যাদি কথা চালু আছে। বাংলায়ও আছে পরম সত্য, আপেক্ষিক সত্য, পূর্ণ সত্য, আংশিক সত্য ইত্যাদি কথা। বাল্মীকিকে রামায়ণ রচনার জন্য নারদ মুনি বলেছিলেন (রবীন্দ্রনাথের ভাষায়)—

‘কবি, তব মনোভূমি

রামের জন্মস্থান অযোদ্ধার চেয়ে সত্য জেনো।’

এখানে সত্য কথাটির অর্থ কী?

আজকাল অনেকে truth-কে শাসনের প্রয়োজনে শাসকদের দ্বারা সৃষ্ট  social product বলে থাকেন। শাসকরা নিজেদের কর্তৃত্বের ও শাসনের দীর্ঘস্থায়িত্বের প্রয়োজনে কিছু ধারণা ক্রমাগত প্রচার করে জনমনকে আকৃষ্ট, আবিষ্ট ও আচ্ছন্ন করে রাখেন। স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিরন্তর প্রচার দিয়ে ভাবমূর্তি তৈরি করেন। এগুলোকে একত্রে truth বলা হয়। এগুলোতে সাধারণত সত্যের নামে মিথ্যা প্রচার করা হয়। তাই এগুলোকে ‘সত্য’ না বলে ‘শাসনের প্রয়োজনে সৃষ্ট ভাবাবর্ত’ বলা সমীচীন। সত্য থেকে—আদর্শ থেকেও—এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মনোগ্রামে লেখা ছিল— TRUTH SHALL PREVAIL. বাংলায় বলা হতো ‘সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী।’ ‘সত্য’ বলে বোঝানো হতো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভাবিত পরম ন্যায়, পরম কল্যাণ ও পরম সুন্দরের সমন্বয়ে সৃষ্ট পরম সত্তা।

Truth -এরও এই রকম অর্থই করা হতো। ‘ধর্মের জয় অবশ্যম্ভাবী’—এই কথাটিও লোকমুখে চালু ছিল।

ধর্ম বলেও বোঝানো হতো সর্বজনীন পরম ন্যায়, পরম কল্যাণ ও পরম সুন্দরের সমন্বয়ে সৃষ্ট পরম সত্তা। সুদীর্ঘ কালের ব্যবধানে পরম সত্তার ধারণাও পরিবর্তিত হয়। ধর্ম ও অধর্ম ছিল মানুষের আন্তরিক বোধের ব্যাপার, শাস্ত্রীয় কিংবা পার্বণিক ব্যাপার নয়। ‘সত্য’ ও ‘ধর্ম’ কথা দুটি ছিল সমার্থক। মানুষের নৈতিক চেতনাকে কার্যকর ও অপরাজেয় রাখার জন্য ‘সত্য’ ও ‘ধর্ম’ কথা দুটিতে সমাজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিত। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা পড়ে গেছি মিথ্যার মধ্যে।

মহাত্মা গান্ধী প্রচার করেছিলেন সত্যাগ্রহ, সেই সঙ্গে অহিংসা, সর্বোদয় ও অসহযোগ (অসত্যানুসারীদের প্রতি)। সত্যাগ্রহের সত্য ও পরম ন্যায়, পরম কল্যাণ ও পরম সুন্দরের সমন্বয়ে উদ্ভাবিত পরম সত্তা। সত্যকে গান্ধী ঈশ্বরও বলেছেন। সত্য, ধর্ম, ঈশ্বর গান্ধীর কাছে এক ও অভিন্ন। আত্মজীবনীতে গান্ধী তাঁর জীবনব্যাপী কর্মধারাকে বলেছেন—my experiment with truth. একালে সত্য নির্ণয়ের জন্য দরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। আর গণতন্ত্রের জন্য দরকার সর্বোদয় অর্থাৎ সবার উত্থান ও উন্নতি। গান্ধী মনে করতেন, মানুষ বুদ্ধিমান, বিবেকবান, চিন্তাশীল প্রাণী। তিনি আরো মনে করতেন, জেনারেশনের পর জেনারেশনের চেষ্টার মধ্য দিয়ে মানুষ ক্রমেই মানবীয় গুণাবলিতে সমৃদ্ধ, অহিংস ও সর্বজনীন কল্যাণে আগ্রহী হয়ে চলবে। সর্বজনীন কল্যাণের মধ্যেই সে নিজের কল্যাণও দেখবে। তাঁর ধারণা হয়েছিল যে ক্রমে মানুষ হয়ে উঠবে নিরন্তর প্রগতিশীল। গান্ধীর বিশ্বাস ছিল যে মানুষ সত্য বা ধর্ম বা ঈশ্বরকে অবলম্বন করে এগোতে এগোতে পৃথিবীকে স্বর্গে পরিণত করবে। জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে মানুষ সত্যের পথ পরিহার করে চলবে—এটা ভাবার সামর্থ্য গান্ধীর ছিল না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার মনোগ্রাম থেকে TRUTH SHALL PREVAIL বাতিল করে যখন একের পর এক ভিন্ন কথা গ্রহণ করতে লাগল, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ও প্রকৃতিও বদলে যেতে লাগল। বাইরে জনজীবনেও ঘটে চলল পরিবর্তন। আজকের বাস্তবতায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও আমরা কি বলতে পারি—‘সত্য অবশ্যই প্রতিষ্ঠা পাবে? আমরা যদি সত্যসন্ধ ও সত্যনিষ্ঠ হই—গান্ধীর ভাষায় সত্যাগ্রহী—কেবল তাহলেই সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠাকালীন মটো ত্যাগ করেছে সত্যকে ত্যাগ করেছিল বলেই। সত্যকে পরম লক্ষ্য জ্ঞান করে সে চলতে পারেনি, চলতে চাইছে না।

মানুষ সুন্দরের প্রতি যে আকর্ষণ বোধ করে, সত্যের প্রতিও কি তা করে? কিটসের উক্তি—

Beauty is truth, truth is beauty. সত্য ও সুন্দরকে এক করে দেখার কথা কে ভাবে? ন্যায়, কল্যাণ ও সুন্দরকে এক করে দেখার সামর্থ্য কি একালের মানুষের আছে? সেকালের মানুষে পারত না; কিন্তু বিশ্বাস রাখত, চেষ্টা করত—ভবিষ্যতে আশা রাখত। তাতে কিছু না কিছু ফল হতো। একালে সত্য পরিহারকারী ব্যক্তির, দলের, মানবজাতির লক্ষ্য কী?

সত্য নিয়ে এত কথা বলার দরকার কী? বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তি এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে কিছুকাল ধরে রাজনৈতিক মহলে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সত্য সন্ধানের প্রবল আগ্রহ, সত্য সন্ধানের বিপুল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এই আগ্রহ যদি আন্তরিক হয়, তাহলে এটা খুব ভালো। কিন্তু এই আগ্রহ যদি হীন স্বার্থবুদ্ধিজাত হয়, তাহলে তা খুবই ক্ষতিকর হবে। মিথ্যা অবলম্বন করে সাময়িক স্বার্থ হাসিল করা যায়; কিন্তু পরিণতিতে তা মিথ্যাচারীদের জন্য ক্ষতিকর হয়, জাতি ও রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর হয়। বাংলাদেশে রাজনীতি ভালো অবস্থানে নেই। দেশের রাজনীতির উন্নতির জন্য রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের সচেতন হওয়া এবং প্রগতির উপায় সন্ধান করা আজ একান্ত দরকার।

বাংলাদেশের রাজনীতির উন্নতির জন্য আজ একান্ত দরকার নতুন রাজনৈতিক চিন্তা এবং তা নিয়ে নতুন কর্মধারা। গতানুগতিক চিন্তা ও কাজ নিয়ে রাজনীতির উন্নতি সাধন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটিরই নিজেদের চিন্তা ও কাজ নিয়ে আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি দরকার। এর জন্য নিরন্তর প্রয়াস দরকার।

রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে উন্নত ভবিষ্যতের জন্য গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার। নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহ করা দরকার, জাতীয় ও আন্তঃরাষ্ট্রিক পর্যায়ে যে অবস্থা চলছে তার পরিবর্তন দরকার—উন্নত অবস্থার একটা কল্পচিত্র সামনে নিয়ে কাজ করা দরকার। অবস্থা কোনো কোনো দিক দিয়ে ভালোও আছে। প্রগতির দিকে, উন্নতির দিকে উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

লেখক : আহমদ শরীফ চেয়ার অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা