kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

পঞ্চগড়

শরৎ আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘা

পঞ্চগড় প্রতিনিধি   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১৬:৪৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শরৎ আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘা

ছবি: কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবিগুলো আজ সোমবার ভোরে পঞ্চগড় সদর উপজেলার মুহুরিজোত এলাকা থেকে তোলা।

শরৎ আকাশে উঁকি দিচ্ছে শ্রেত শুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা। চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য মেলে ধরে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন দুহাত বাড়িয়ে ডাকছে প্রকৃতিপ্রেমিদের। উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে এবার একটু আগেভাগেই দেখা যাচ্ছে হিমালয়ের দ্বিতীয় উচ্চতম ও পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম এই পর্বত শৃঙ্গ। গতকাল রবিবার থেকে দেখা যাচ্ছে এ পর্বত চূড়া। 

যাদের পারপোর্ট ভিসা করে বিদেশে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সুযোগ মিলেনা তাদের জন্য আদর্শ জায়গা পঞ্চগড়। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়াসহ বিভিন্ন স্থান থেকে খালি চোখেই অবলোকন করা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। সবুজের মাঝে নীল আকাশের বুকে ভেসে উঠা এই পর্বতশৃঙ্গ পঞ্চগড়ের ঘুরতে আসা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। কেবল মেঘমুক্ত ও কুয়াশামুক্ত গাঢ় নীল আকাশ থাকলেই দেখা দেয় হিমালয়ের এই পর্বত শৃঙ্গ। তবে আকাশে মেঘ বা কুয়াশা থাকলে অনেক সময় নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হয় দর্শনার্থীদের। 

জানা যায়, মাউন্ট এভারেস্ট ও কে-২ এর পরেই কাঞ্চনজঙ্ঘার অবস্থান। পর্বত চূড়াটির কিছু অংশ ভারতের সিকিম ও কিছু অংশ নেপালে অবস্থিত। মনোমুগ্ধকর এই পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সামর্থ্যবানরা ছুটেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা শহরের টাইগার হিল। দার্জিলিংয়ের টাইগার হিলই কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া দেখার সবচেয়ে আদর্শ জায়গা। আবার কেউ কেউ যান সান্দাকপু বা ফালুট। আবার কেউ কেউ সরাসরি নেপালে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। কিন্তু ঘরোয়া পরিবেশে নিজের মতো করে দেখা সুযোগ কেবল পঞ্চগড় থেকেই মিলছে। পঞ্চগড়ের প্রায় সব এলাকার ফাঁকা জায়গা থেকেই দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। তবে সবচেয়ে ভাল দেখা যায় তেঁতুলিয়ার জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর পাশ দিয়ে বয়ে চলা মহানন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে। 

বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই সময়টুকুতেই মেঘমুক্ত ও কুয়াশামুক্ত আবহাওয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেলেও এবার একটু আগেভাগেই দেখা দিয়েছে পর্বত চূড়াটি। এই মৌসুমে রবিবার থেকে উত্তরাকাশে দেখা মিলতে থাকে নয়ানাভিরাম কাঞ্চনজঙ্ঘা। খবরটি ভালোভাবে পৌছায়নি প্রকৃতিপ্রেমিদের কাছে। তাই এখনো পর্যটকদের তেমন আনাগোনা নেই। তবে কয়েকদিনের মধ্যেই পর্যটকদের ভিড় বাড়বে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা। 

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, সূর্যের আলোর সঙ্গে সঙ্গে কখনো শুভ্র, কখনো গোলাপি, আবার কখনো লাল রঙ নিয়ে হাজির হয় বরফে আচ্ছাদিত এই পর্বত চূড়া। তবে কাঞ্চনজঙ্ঘা উপভোগ করার মোক্ষম সময় হলো ভোর ও পড়ন্ত বিকেল। ভোরে আলো ফুটতেই তা গিয়ে পড়ে ঠিক কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায়। এদিকে চারপাশে তখনো আবছা অন্ধকার থাকলেও চকচক করে চূড়াটি। ভোরের আলোয় এবং বিকেলে পর্বত চূড়াটি পোড়া মাটির রঙ নেয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ঝাপসা হয়ে আসে। তখন রং হয় সাদা। দূর থেকে মনে হয় এ যেন আকাশের গায়ে এক খন্ড বরফ। পর্বত চূড়াটির নিচ দিয়ে কালো রঙে দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি এলাকা দেখা যায়। তবে কপাল মন্দ হলে আর আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে পর্বত চূড়াটির দেখা নাও পেতে পারেন। 

কাঞ্চনজঙ্ঘার সাথে সাথে নতুন মাত্রা যোগ করে পঞ্চগড়ের সমতলের চা বাগান, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, জিরো পয়েন্টের জয়েন্ট রিট্রিট সেরিমনি (করোনার জন্য বন্ধ রয়েছে), মোগল স্থাপনা মির্জাপুর শাহী মসজিদ, বোদেশ্বরী পীঠ মন্দির, দেড় হাজার বছরের পুরনো মহারাজা দিঘী, ভিতরগড় দুর্গ নগরী ও দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘরসহ পঞ্চগড়ের নৈসর্গিক প্রকৃতিক সৌন্দর্য। 

তেঁতুলিয়া মহানন্দা নদীর পাথর শ্রমিক হাসিবুল ইসলাম বলেন, গত কয়েকদিন ধরে পাহাড়টি দেখা যাচ্ছে। আমরা নদীতে পাথর তোলার ফাঁকে ফাঁকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করি। অনেক ভালো লাগে। তেঁতুলিয়া বারোঘরিয়া এলাকার আমিজ উদ্দিন বলেন, আমরা ঘর থেকে বাইরে বের হলেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাই। আমাদের পাসপোর্ট ভিসা করে বিদেশে যেতে হয় না। 

ভ্যান চালক আব্দুল বাছেদ বলেন, প্রতি বছর এই সময়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা দেয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসে এক পলক এই দৃশ্য দেখতে। অনেকে সেলফি তোলে এবং ক্যামেরাবন্দি করে পর্বত চূড়াটি। আমরা গাইড হিসেবে পর্যটকদের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাই। এতে আমাদের ভাল আয় হয়। এবার কেবল পর্যটক আসতে শুরু করেছে। আশা করি কয়েকদিনের মধ্যেই পর্যটকদের ভিড় আরও বাড়বে। 

রংপুর থেকে ঘুরতে আসা বদিউজ্জামান বলেন, স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়ার খবর পাই। তাই আজ ভোরে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে দেখতে এসেছি। ভোরে কয়েক ঘন্টা বেশ ভালই দেখা গেলো কাঞ্চনজঙ্ঘা। কিন্তু তারপরেই মেঘে ঢাকা পড়ে গেলো। 

জেলা প্রশাসক জহুরুল ইসলাম বলেন, এবার এখনই দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। আবারো খালি চোখে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করবার সুযোগ এসেছে। ভ্রমণ পিপাসুরা নিশ্চয়ই এই সুযোগ হাত ছাড়া করবে না। আমরা মনে করি এবার পঞ্চগড়ের পর্যটন শিল্পে কাঞ্চনজঙ্ঘা নতুন মাত্রা যোগ করবে। এরই মধ্যে আমরা পঞ্চগড়ের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এখানকার মানুষ অনেক শান্তিপ্রিয়। আশা করি পর্যটকরা নির্বিঘ্নে কাঞ্চনজঙ্ঘাসহ  পঞ্চগড়ের অন্যসব পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। 



সাতদিনের সেরা