kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

শেখ রেহানা: এক সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি

এন আই আহমেদ সৈকত    

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১৪:৫০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শেখ রেহানা: এক সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি

একদিকে শেখ রেহানার ইতিবাচক ভূমিকা, অন্যদিকে  বিশ্বব্যাপী শান্তির আলোকবর্তিকা বাহকের ভূমিকায় বড় বোন শেখ হাসিনা। বলা যায়, দেশ ও দেশের বাইরে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুজন একে অপরের পরিপূরক।

শেখ রেহানার জীবনালেখ্য নিয়ে বেশি কিছু জানা যায় না, তবে তাঁর জীবনের গভীরতা অনুধাবন করা যায় ব্যাপকভাবে। কারণ, তাঁর সাদামাটা জীবনচরিত আর অতিথিপরায়ণতা সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।

জীবনভর দুঃখ, কষ্ট আর সংগ্রামে বেড়ে ওঠা বঙ্গবন্ধুর এই ছোট কন্যার। বাবার আদর খুব একটা ভাগ‌্যে জোটার সুযোগ ছিল না। মায়ের আঁচলও আগলে থাকতে পারেননি দীর্ঘদিন। ছোট থেকেই জীবনের অবিচ্ছেদ অংশ হয়ে গেছে সংগ্রাম। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুকে থাকা সত্ত্বেও একজন নিরহঙ্কারী সাধারণ জীবনযাপনের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেনএই মহিয়সী নারী। সততার অনুকরণীয় আদর্শ এক রত্নাগর্ভা মা তিনি। দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হয়েও রাজনীতিতে আসেননি। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রামে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ সক্রিয় রাজনীতিবিদদের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা দিয়ে গেছেন। সব সময়ই ভূমিকা রেখেছেন জনহিতৈষী কাজে। বড় বোন রষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার কাছে যিনি শুধুই আদরের রেহানা।

নিজে প্রচারবিমুখ। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড় ভরসার জায়গা, তাঁর প্রেরণার উৎস। সংকটে পাশে থাকেন সাহসের ভাণ্ডার হিসেবে। সরাসরি রাজনীতিতে দেখা যায় না, তবে দলের নেতাকর্মীদের কাছে 'ছোট আপা' হিসেবেই পরিচিত তিনি। বঙ্গবন্ধু যেমন সারাজীবন কেবল মানুষের কথা ভেবেছেন, তাদের মুক্তির গান গেয়েছেন, তেমনি এদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন‌্য বঙ্গবন্ধুর সেই অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে মানুষের জন‌্য কাজ করছেন তাঁর দুই মেয়ে। একজন‌ কাজ করছেন জীবন বাজি রেখে পর্দার সামনে, অপরজন পর্দার অন্তরালে। যেমনটি বাঙালি পেয়েছিল বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কাছ থেকে।

ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও একজন সৎ, সংগ্রামী মানুষের প্রতিচ্ছবি শেখ রেহানা। অতি সাধারণ জীবনযাপন তার। নিরহঙ্কারী সাদাসিদে সধারণ জীবন তাঁর। নিজে চাকরি করে ছেলেমেয়েদের পড়িয়েছেন, বুঝিয়েছেন জীবনবোধ। সংগ্রাম করেছেন জীবনের প্রতিটি স্তরে। বড় বোন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী অথচ আচরণে তাঁর কোনো ছাপ নেই। পাবলিক গাড়িতে করে নিজের অফিসে আসা-যাওয়ার খবর সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি আমরা।

ব্রিটেনের যে কোনো বাঙালি শেখ রেহানার কাছে সহজেই যেতে পারেন। কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করার দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি তাদের কাছে পাথেয়। নিজের বোন প্রধানমন্ত্রী অথচ অন্যের অফিসে কাজ করেন ছোট বোন। সততার এমন দৃষ্টান্ত বিরল, যা স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন শেখ রেহানা। মানবিক মানুষ হিসেব তিনি অনন্য।

শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, কীভাবে সংগ্রাম করে সন্তানদের মানুষ করেছেন শেখ রেহানা। তিনি তাঁর তিন সন্তানকে সঠিক উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। তাঁদের মধ্যে টিউলিপ সিদ্দিক ইতোমধ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একজন গুরুত্বপূর্ণ এমপি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি একজন গবেষক। চিন্তাশীল ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রুপন্তী মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে এরই মধ্যে পাশ্চাত্যে সাড়া ফেলেছেন।

ছোট ছেলে-মেয়েদের প্রতি মা-বাবার আদর একটু বেশিই থাকে। কিন্তু শেখ রেহানার ভাগ‌্যে তা খুব একটা জোটেনি। বাবার সান্নিধ‌্য খুব একটা পাননি। বঙ্গবন্ধু তো জীবনটাই উৎসর্গ করেছেন এদেশের গণমানুষের জন‌্য। জীবনের সেরা সময়গুলো কাটিয়েছেন কারাগারে। পরিবারকে সময় দিতে পারেননি।

এক স্মৃতিচারণে শেখ রেহানা লিখেছেন, 'ছোটবেলায় দেখতাম, আব্বা প্রায়ই থাকতেন জেলখানায়। আমদের কাছে ঈদ ছিল তখন, যখন আব্বা জেলখানার বাইরে থাকতেন, মুক্ত থাকতেন। আব্বাও জেলের বাইরে, ঈদও এলো এমন হলে তো কথাই নেই। আমাদের হতো ডাবল ঈদ।'

বাবাকে কাছে পাবার যে আকুতি তা উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু স্মৃতিচারণেও, 'ছোট মেয়েটার (শেখ রেহানা) শুধু একটা আবদার। সে আমার কাছে থাকবে। আর কেমন করে কোথায় থাকি তা দেখবে। সে বলে, থেকে যেতে রাজি আছি।' (১৫ই জুন ১৯৬৬, বুধবার, কারাগারের রোজনামচা)

বড় বোনের সঙ্গে বিদেশে থাকায় সেদিন বেঁচে যান শেখ রেহানা। ৭৫-এর কালো অধ‌্যায়ের পর জীবন সংগ্রাম কাকে বলে তা উপলব্ধি করেছেন। জয়ীও হয়েছেন জীবন সংগ্রামে। দুই বোনই সংগ্রাম করেছেন জীবনের সঙ্গে। এতটাই সংগ্রামী ছিল তাঁদের জীবন যে টাকার অভাবে ছোট বোন শেখ রেহানার বিয়েতে দিল্লি থেকে লন্ডনে যেতে পারেননি শেখ হাসিনা। বিমানের টিকিট কেনার অর্থ তাঁর ছিল না।

শেখ রেহানার স্বামী শফিক সিদ্দিক তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেন, "৮৩ সালে তখন হাসিনা আপা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে ঢাকায় অবস্থান করছেন। ওই সময়ে আমি আমার পিএইচডি থিসিসের কাজে ঢাকা গিয়েছিলাম। একদিন হাসিনা আপার বাসায় উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলাম, উনি হাশেম ভূঁইয়া নামের একজন কর্মীর অসুস্থ মেয়েকে লন্ডন পাঠাবার ব্যবস্থা করছেন। তখন হাসিনা আপা বেশ দুঃখ করে আমাকে বললেন, 'শফিক দেখ, আজকে আল্লাহর ইচ্ছায় আমি আমার একজন কর্মীর অসুস্থ মেয়েকে বিদেশ পাঠাতে সাহায্য করতে পারি। কিন্তু সেদিন আমার একমাত্র বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দিল্লি থেকে লন্ডন যেতে পারিনি, কেবল টিকিটের টাকার অভাবে।" এর চেয়ে বড় কষ্ট ও দুঃখের ঘটনা কারও জীবনে হতে পারে না।

শেখ রেহানার বিয়ে হয় লন্ডনের কিলবার্নে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সুখ-দুঃখের সাথী, বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই মোমিনুল হক খোকার বাড়িতে ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ড. শফিক সিদ্দিকের সঙ্গে। শফিক সিদ্দিক তখন বিলেতের সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটিতে উচ্চ শিক্ষারত ছিলেন।

বিয়ের পর শফিক সিদ্দিক ও শেখ রেহানাকে নানামুখী সংকট মোকাবেলা করে অগ্রসর হতে হয়েছে। সে সময় আর্থিক কষ্টটাই ছিল প্রবল। বিয়ের পরপরই স্বামীর সঙ্গে চলে আসেন সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটিতে। মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেন আরেক বাঙালি পরিবারের সঙ্গে রুম ভাগাভাগি করে। আর্থিক অনটনের কারণে চাইলেই এককভাবে বাড়ি ভাড়া করে থাকার সামর্থ্য তাঁদের ছিল না। তাই শেখ রেহানাও বিভিন্ন জায়গায় চাকরির চেষ্টা করছিলেন।

শেখ রেহানা চাকরি করবেন সেটি নিয়ে খুব দ্বিধায় ছিলেন শফিক সিদ্দিক। পরে রাজিও হন। কারণ শেখ রেহানা প্রায়ই একা বাসায় থাকতেন এবং সার্বক্ষণিক মা, বাবা ও ভাইদের ছবি সামনে নিয়ে কান্নাকাটি করতেন। এ কারণে শফিক সিদ্দিকের সন্দেহ জেগেছিল, এভাবে একা থাকতে থাকতে শেখ রেহানার মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। সুতরাং কাজে থাকলে মানুষের সান্নিধ্যে ও ব্যস্ত থাকার কারণে পনেরোই আগস্টের ভয়াবহ স্মৃতি কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারবেন।

আজ ১৩ সেপ্টেম্বর, শেখ রেহানার জন্মদিন। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে। আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন। এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৫৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্ম।

তিনি বাঙালি নারীদের আদর্শ। কীভাবে জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়া যায়, ক্ষমতার লোভ থেকে নিজেকে দূরে রাখা যায়, কোনো পদে না থেকেও দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করা যায়, সেটি তিনি দেখিয়েছেন। তাঁর এই নির্মোহ চরিত্রই বাংলাদেশের ইতিহাসে উদাহরণ হয়ে থাকবে। সেই প্রচারবিমুখ মহিয়সী নারীর শুভ জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধা।

পরিশেষে জন্মদিনে তার একটি কথা স্মরণ করে শেষ করতে হয়। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, 'এই দিনে আমরা সবাই মিলে অঙ্গীকার করি- আমাদের যা কিছু আছে,তাই দিয়ে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাব। সুন্দর, সমৃদ্ধ এবং দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও নিরক্ষরতামুক্ত দেশ গড়ব। সোনার বাংলাকে ভালোবাসব। পরশ্রীকাতরতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখব। ঘরে ঘরে মুজিবের আদর্শের দূর্গ তৈরি করে তার আলো ছড়িয়ে দেব। কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।'

লেখক: উপ তথ্য ও যোগাযোগ (আইটি) সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ। 



সাতদিনের সেরা