kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

আমিই সেই মা

পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে মিরপুরের এক কিশোরীর ঠাঁই হয়েছিল ভারতের যৌনপল্লীতে। নিজেকে বিক্রি করে সেখান থেকে কিভাবে মেয়েকে ফিরিয়ে আনলেন মা, সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা শুনেছেন এস এম আজাদ

অনলাইন ডেস্ক   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১১:২২ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



আমিই সেই মা

শিল্পী : প্রসূন হালদার

একদিন ভাইয়ের বাসা থেকে ফিরে দেখি বড় মাইয়া ঘরে নাই। মাইয়ার বয়স মোটে ১৭। নানা জায়গায় খবর নিলাম। পাইলাম না। পরদিন ওর বাপের মোবাইলে অচেনা নাম্বার থেইক্যা কল আইল। ধরার পরেই মাইয়ার কণ্ঠ, ‘আব্বু, আমি সাতক্ষীরায়। সোহাগ আর কালু নিয়া আসছে। ভারতে লইয়া যাইতাছে। বিল্লাল বর্ডার পার কইরা দিতাছে। নৌকার মাঝির মোবাইলে তোমারে কল দিছি।’ আমরা কিছু বলার আগেই লাইন কাইটা গেল। পরে ফোন বন্ধ। ১৭ জানুয়ারি। ওর বাপরে লইয়া পল্লবী থানায় গেলাম। জিডি করলাম।

উপায় নাই  
থানা থেইক্যা ফিইরা সোহাগ আর কালুর ব্যাপারে খোঁজ নিলাম। তাগো বাড়ি বাউনিয়া বাঁধ এলাকায়। কদিন পর পুলিশ জানাইল, ভারতে থাকা মেয়েকে ফেরানো কঠিন। হেগো তেমন কিছু করার নাই। পরে র‌্যাব-১ ও ৪ ব্যাটালিয়ন অফিসে গিয়ে অভিযোগ করলাম। এভাবে এক মাস কাইটা গেল। মাইয়ার চিন্তায় ঘুম আসে না। দেখলাম, পুলিশের আশায় বইসা থাকলে লাভ হইব না। আমারেই কিছু করন লাগব। একদিন পরিচয় গোপন কইরা কালুর লগে দেখা করলাম। ‘ভাই, স্বামী মারধর করে। সংসারে অভাব। বাচ্চা নিয়া বিপদে আছি। একটা কাজ দরকার। শুনছি আপনি বিদেশে লোক পাঠান।’

শুইনা খুশি হইল কালু। কইল, ‘করোনার কারণে সৌদির ভিসা নাই। ভারতে শপিং মলে কাম আছে। টাকা-পয়সা লাগব না। কাগজপত্র আমি বানাইয়া দিমু। যাইবা?’ আমি রাজি হইলাম। কালু কইল, ‘কাউরে কওনের দরকার নাই।’ 

ঘর বেচলাম
তবে ঘরে ফিইরা মাইয়ার বাপরে জানাইলাম। মাইয়ার বাপ কখনো বাসের হেলপারি করে, কখনো রিকশা চালায়। অনটনের সংসার। ভারতে গিয়া মাইয়াকে উদ্ধার করে আনার মতো টাকা নাই। ১৪ বছর আগে বস্তিতে ঋণের টাকায় ঘর তুলছিলাম। পরে মনির নামে একজনের কাছে ৮০ হাজার টাকায় ঘরের দুইটা রুম বেইচা দিলাম। টাকা কিভাবে নিব, সেইটা একটা বুদ্ধি করলাম। চুলের বড় খোঁপার মধ্যে সেলাই কইরা লুকাইয়া টাকা লগেই রাখছিলাম। কেউ বোঝে নাই। 

যাইতে পারবা?
একদিন গাবতলী থেইক্যা কালুর লগে বাসে সাতক্ষীরায় গেলাম। সেখানে বিল্লালের বাসায় আছিলাম। রাইতে বর্ডারে নিল আমারে। লগে আরো দুই মহিলা। বর্ডারের এ পাশটায় একটা বড় খাল (ইছামতী নদী) ছিল। খাল পার হইয়া ওপারে ওঠার সময় বিএসএফ মোটা লাঠি দিয়া বাড়ি দিল। পানিতে পইরা গেলাম। ভয়ে সাঁতরাইয়া এ পারে আইলাম। যাইতে পারলাম না। বুকে, কোমরে ব্যথা পাইলাম। মাথা থেইক্যা রক্ত ঝরছিল। পরে বিল্লাল ও তার লোকজন আমারে একটা বাড়িতে নিয়া রাখে। ওষুধ দেয়। পরদিন সকালে জিগাইল—যাইতে পারবা? তখনো শরীর অনেক খারাপ। তবু কইছি—সমস্যা নাই।

পথ শেষ হয় না
সকালে হাঁইটাই সীমান্ত পার হইলাম। ওই পারে একটি বাড়িতে নিয়া বসানো হইল আমাগো। পরে অটোরিকশা করে ভিন্ন দুজনের কাছে নেওয়া হইল। এরপর ট্রেনে কলকাতায়। সেখান থেইক্যা বাসে হাওড়ায়। যাইতেছি আর ভাবতেছি, হয়তো এর পরের স্পটে গেলেই মাইয়ারে পামু। কিন্তু পথ শেষ হয় না।

হাওড়া থেইক্যা দুইজন নেপালি আমারে নিয়া ট্রেনে উঠল। ট্রেন থেইক্যা নামার পর সাইনবোর্ড দেইখ্যা জানলাম, নয়াদিল্লি আইসা পড়ছি। স্টেশন থেইক্যা নেপালিরা আমারে অটোতে তুলল। পরে জিবি রোডের একটা বাড়িতে নিল। বাড়ির প্রতিটি সিঁড়ির সামনে লোহার গেট (কলাপসিবল)। ছোট ছোট রুম। লম্বা লম্বা ব্যাটালোক পাহারায়। আরো কয়েকটা মাইয়া আছে সেখানে। দেইখ্যা গায়ের লোম খাড়াইয়া গেল। বুঝলাম, আন্ধার দুনিয়ায় আটকাইয়া গেছি।

খালি কানতাম
প্রতিদিন কানতাম। খালি চিন্তা করতাম, কিভাবে এখান থেইক্যা মুক্তি পাওন যাইব। একজনরে দিয়া ইন্ডিয়ার একটা  সিম নিছিলাম। পরে আমার মোবাইল থেইক্যা সিম কার্ড খুইলা রাখছিল ওরা। একদিন একটা বুদ্ধি বাইর করলাম। ঠিক করলাম, সিম কার্ড না দিলে খাওনদাওন বন্ধ কইরা দিমু। প্রথমে ওরা রাজি হয় না। এক পর্যায়ে রাজি হইল। রাইতে লুকাইয়া মাইয়ার বাপরে কল দিলাম। হে একটা মোবাইল নাম্বার দিয়া কইল—‘ইন্ডিয়ার এই লোক মাইয়ার খবর জানে।’ মিঠুন নামের ওই লোক আগেই মাইয়ার বাপেরে ফোনে খবর দিছিল। রাইতে টয়লেটে গিয়া ওই নাম্বারে কল করলাম। মিঠুন কইল, ‘আপনের মেয়েরে তো কিশানগঞ্জের পাঞ্জিপাড়ায় (পশ্চিম দিনাজপুরে) বেচে দিছে।’

সাড়ে চার মাস পর
একদিন এক নেপালি খদ্দের আইল। দেইখ্যা কম খারাপ মনে হইছিল তারে। পরে লগে থাকা ৮০ হাজার টাকা তারে দিলাম। বিনিময়ে হে ১৭ হাজার রুপি দিল আমারে। তত দিনে সেই পল্লীতে সাড়ে চার মাস পার হইয়া গেছে। এরই মধ্যে আমার ওপর শুরু হইল নির্যাতন। ওরা আমার চুল কাইটা দেয়। কান্নাকাটি করি। লাভ হয় না। একদিন বলে, আমারে বোম্বে নিবে। ওদের সামনে কানলেও মনে মনে খুশি হইছি—পালানোর চান্স পামু।

ট্রেন থেকে ঝাঁপ
একদিন দুজন আমারে নিয়া রেলস্টেশনে গেল। ওদের লগে ট্রেনে উঠলাম। ট্রেন চালু হইতেই দরজা দিয়ে বাইরে লাফ দিলাম। ব্যথা পাইলেও সব ভুইলা দৌড় দিয়া টার্মিনালের বাইরে গেলাম। সামনে একটা অটো। ড্রাইভাররে কইলাম, ‘ভাই, বিপদে আছি। একটু দূরে নিয়া নামান।’ মিরপুরে বিহারিপল্লীর কাছে বাসা আমার, তাই হিন্দি ভাষা জানি অনেকটা। এইটা কাজে লাগছে। কিছু দূর গিয়া ড্রাইভাররে ৭০০ রুপি দিলাম। পরে একটু হাঁইটা আবার একটা অটো নিলাম। কইলাম, বাসস্ট্যান্ডে যামু। বাসস্ট্যান্ডের কাউন্টার থেইকা কইল কিশানগঞ্জে যাইতে হইলে আগে গৌরকপুর যাইতে হইব। সেখান থেকে আরেক বাসে কিশানগঞ্জ। কিশানগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে যখন পৌঁছালাম তখন অনেক রাইত। স্ট্যান্ডেই রাইত পার করলাম। সকালে ফোন দিলাম মিঠুনরে।

চেয়ারম্যানের কাছে
মিঠুন আমারে বাসস্ট্যান্ডেই থাকতে কইল। আইল ঘণ্টাখানেক পরে। সব শুইনা কইল, ওই এলাকার চেয়ারম্যান ভালো মানুষ। সে আপনারে সাহায্য করতে পারব। মিঠুন ঠিকানাও দিল। বাসস্যান্ড থেইক্যা অটোরিকশায় করে চেয়ারম্যানের অফিসে গেলাম। সব কইলাম হেরে। কইলেন, ‘ওই এলাকায় আমার সাড়ে চার শ ভোট! কিছু করার নেই!’ হের কথা শুইনা চোখের জল ধইরা রাখতে পারি না। হাউমাউ কইরা কানতে কানতে কইলাম, ‘আমি এত কষ্ট করে এত দূরে আসলাম। এখন কি কইরা মেয়েরে রাইখা দেশে যামু?’

অনেকক্ষণ পরে চেয়ারম্যানের মন গলল। ফোন করে কয়েকজনকে ডাইকা আনলেন। মনে হয় পুলিশের লোক। আমারে ওদের সামনে আবার ঘটনা কইতে কইলেন। আবারও কান্নাকাটি কইরা বলি সব কিছু।

সোনামণি রে আমার
পরে আমারে লইয়া চেয়ারম্যান ও অন্যরা পাঞ্জিপাড়ার পল্লীতে যায়। তখন সন্ধ্যা হইয়া গেছে। তিনতলা একটি বাড়ির দুই তলায় গিয়া মাইয়ারে পাইলাম! কী চেহারা হইছে আমার সোনামণির! আমারে দেইখাই জড়াইয়া ধইরা কানতে শুরু করল। সেই পল্লীর কর্তা নজরুল চেয়ারম্যানরে কইল, ‘আড়াই লাখ টাকায় মেয়েটাকে কিনেছি। দেব না।’ চেয়ারম্যান কইল, ‘বাংলাদেশ থেকে মা’টা এত কষ্ট করে আসছে। দিয়ে দে।’ নজরুল কথা শোনে না। চেয়ারম্যান আগেই আমারে কইয়া দিছে, ‘মাইয়ারে পাইলে শক্ত করে হাত ধরবা, আর ছাড়বা না।’ কথামতো মাইয়ার হাত শক্ত কইরা ধইরা রাখছি।

সারা রাইত গাড়িতে
এক পর্যায়ে চেয়ারম্যান রাইগা গেল। কইল, ‘তোমরা হাঁটো। দেখি কে আটকায়?’ আমি দ্রুত মাইয়ারে নিয়া বাইরে চইলা আসি। এমন সময় একটা মাইক্রোবাস আইসা দাঁড়াইল। আমি ভয়ে উঠি না। চেয়ারম্যান কইল, আমিই গাড়ি আনতে কইছি। উইঠা পড়ো। তাড়াতাড়ি এলাকা ছাড়তে হইব। আমাগো লগে গাড়িতে আরো দুজন ওঠে। গাড়ির পিছনে একটা মোটরসাইকেলও ছিল। সারা রাইত গাড়ি চলল। মোটরসাইকেলটা অনেক দূর আসে। এরপর আর দেখি না। আমাগো একটু ঘুম আইসা পড়ে। হঠাৎ গাড়ি থামল। ড্রাইভার কইল, তেল শেষ। হের কাছে শুনলাম জায়গাটা মল্লিকপুর। বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি। ড্রাইভার জানাইল, চেয়ারম্যানের নির্দেশে এত দূর আনছে তারা। বর্ডার পার করা লোক ধরলেই পার হওন যাইব। কইলজায় পানি পাইলাম।

রুখো
মাইক্রোবাস থেইক্যা নাইমা ড্রাইভারের কথামতো একটা অটোরিকশায় বাটা সিগন্যাল নামে একটা জায়গায় গেলাম। একজনরে জিগাইলাম ‘পার করা’ লোক কই আছে। কইলেন, চলো, একটু দূরে গিয়া কথা কই। একটু আড়ালে নিয়া কইলেন, ১১ হাজার রুপি দিলে বর্ডার পার কইরা দিমু। রাজি হইলাম। হে আমাগোরে একটা বাগানের মধ্যে নিয়া গেল। কইল, বাগানের মাঝখান দিয়া দৌড় দাও। তার কথামতো দৌড় দিলাম। একটু পর শুনলাম—‘রুখো’। দেখলাম, বিএসএফ আমাগো দিকে বন্দুক তাক কইরা রাখছে। খাঁড়াইয়া গেলাম। 

অবশেষে ঘরে
বিএসএফের কাছেও পুরো ঘটনা খুইলা বলি। একজন অফিসার বাংলাদেশে পল্লবী থানায় খোঁজ নেয়। তারপর বলে, এমন কেইস হইলে নাকি ছাড়ে না। কিন্তু আমাদের ঘটনা শুইনা ওদের মন খারাপ হইছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছাইড়া দিবে। তবে একদিন ক্যাম্পে থাকতে হইব। বৈঠক হইব। পরদিন সকালে করোনা টেস্ট কইরা আমাগোরে যখন ক্যাম্পে হাজির করা হইল, দেখলাম বিজিবি আর বিএসএফ মিটিং করতেছে। কিছুক্ষণ পরে বিএসএফ সদস্যরা আমাগোরে বিজিবির হাতে তুইলা দিল। ভাবলাম এবার বুঝি মুক্তি মিলল। কিন্তু না, ঝিনাইদহের মহেশপুর মহিলা কলেজে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হইল। এরই মধ্যে জানলাম, আমাদের নামে মামলা হইছে। অনুপ্রবেশের দায়ে। একসময় জামিন পেলাম। ১৮ জুলাই মাইয়াকে নিয়া ঘরে ফিরলাম।’

গত ১৬ আগস্ট কালু, সোহাগ ও বিল্লালকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। সেই মায়ের করা মামলায় রিমান্ড শেষে আসামিরা এখন জেলহাজতে। মামলার তদন্ত চলছে।



সাতদিনের সেরা