kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

পরীমনি, রিমান্ড ও আমাদের অবক্ষয়

আর, এ শাহরিয়ার   

২৬ আগস্ট, ২০২১ ২০:৫৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরীমনি, রিমান্ড ও আমাদের অবক্ষয়

আমাদের মহান সংবিধানে ব্যক্তির গোপনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অথচ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় অপরাধের চেয়ে ব্যক্তির চরিত্র তথা একান্তই ব্যক্তিগত বিষয় ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। চিত্রনায়িকা পরীমনি মাদক আইনে গ্রেফতার হওয়ার পর মূল আলোচনার বিষয় ছিল তিনি কি করে এত অর্থ সম্পত্তির মালিক হয়েছেন, তার কার কার সঙ্গে গোপন অবৈধ সম্পর্ক ছিল, কবে কিভাবে কার জন্মদিন পালন করেছেন, এমনকি বাংলাদেশের বেশ কিছু ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াও অপরাধকে ছাপিয়ে অপরাধীর চরিত্র বিশ্লেষণে নেমেছিল।

স্বাভাবিক দৃষ্টিতে যখন কোন একটা অপরাধ সংঘটিত হয় সেই অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে সেই অপরাধের জন্য দোষী হিসেবে সমাজে হেয় করাও জঘন্যতম নৈতিক অবক্ষয়ের প্রকাশ নয় কী? যেটা বারবার নারী কর্তৃক সংঘটিত ঘটনার ক্ষেত্রে হয়ে আসছে। সামাজিক মাধ্যম হয়ে গেছে ক্যারেক্টার ব্যবচ্ছেদের তীর্থস্থান। পরীমনি কর্তৃক করা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই আমরা মূল অপরাধ থেকে সরে গিয়ে তার অর্থ-বিত্ত বৈভব এবং চরিত্র নিয়ে পোস্ট মর্টেম করে ফেলেছি। অথচ বিষয়টা হবার কথা ছিল বিপরীত, একজন অপরাধীকে তার অপরাধ প্রমাণ হবার পরে সেই অপরাধের জন্য শাস্তি দেবার কথা ছিল।

তিনি একজন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন- এফডিসি’র ভূমিকাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ নয় কী? একজন চিত্রনায়িকাও দোষ-গুণ সম্পন্ন মানুষ। তার দ্বারা যদি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোন অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তবে তার শাস্তি দেয়ার জন্য আইন আছে। নিদেনপক্ষে তার সদস্যপদ স্থগিত বা তাকে শিল্পী তালিকা থেকে বাদ দেয়ার আগে তার অপরাধ প্রমাণিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত ছিল। গত ক'বছরে পরীমনি বেশ ক'টি সফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন। একজন চলচিত্র অভিনেত্রীর জন্য যে প্রতিষ্ঠানের উচিত ছিল অভিবাকের মত আকড়ে ধরা, যতটা সম্ভব আইনী সহায়তা দেয়া, অপরাধ প্রমানিত না হওয়া পর্যন্ত যাতে কেউ তাকে অপরাধীর তকমা না দিতে পারে তার জন্য বলিষ্ঠ থাকা অথচ আমরা কী দেখলাম ? আচ্ছা, তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই যে, এই অভিনেত্রী অনেক খারাপ বা এফডিসি’র নিয়ম নীতি তোয়াক্কা করে না, তাহলে আপনার কেন কারণ দর্শানোর নোটিশ দেননি? এখন যদি বলেন দিয়েছেন, তার কপি কই? ঐ নোটিশের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী ? তারা সদস্য পদ স্থগিত হওয়ার মত তখন কী প্রমাণ আপনাদের কাছে ছিল? মনে রাখবেন অতীত কখনও কাউকে ক্ষমা করে নাই, কড়ায় গন্ডায় হিসেব চুকিয়ে, তার প্রমাণ কারও অগোচরে নয়।

যেহেতু মামলাটি বিচারাধীন তাই এটি নিয়ে কোন বাক্য ব্যয় করা অন্যায়। কিন্তু একটি বিষয় না বলেই নয়, তাহল আমাদের দেশে বিদ্যমান সিআরপিসি, বিশেষ করে ১৬৭ ধারা। এই ধারার আইনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা অনুসারে পরিস্কার হয় যে, গ্রেফতার ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপনের তারিখ থেকে ১৫ দিন পরে কোনোভাবেই এবং কোনোমতেই রিমান্ড আবেদন করা বৈধ নয় এবং মঞ্জুর করাও বৈধ নয়। সিআরপিসি ১৮৯৮ এর ১৬৭ ধারার ব্যাখ্যা ছাড়াও পি আর ১৯৪৩ এর ৩২৪ প্রবিধান এর (জে) উপ-প্রবিধান অনুসারে, একজন বন্দি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে প্রথম হাজির করার তারিখ থেকে ১৫ দিন পর কোনোভাবেই পুলিশ রিমান্ডে থাকবে না । এই পিআর ১৯৪৩ আইনটি আমাদের দেশে যতটা না বিচারক ও আইনজীবীরা ব্যবহার করে থাকেন, তারচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকেন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। কারণ পিআর ১৯৪৩-কে পুলিশের জন্য ‘বাইবেল’ বলা হয়।

এখন প্রশ্ন করতে পারেন বা প্রশ্ন আসতে পারে- গ্রেফতার হওয়ার তারিখ থেকে একজন আসামি আন্ডার ট্রায়াল প্রিজনার হবেন কি-না? এর উত্তরে বলব- হ্যাঁ, অবশ্যই। ক্রিমিনাল রুলস এন্ড অর্ডারস ২০০৯ এর ৮৪ বিধি অনুসারে, একজন ব্যক্তিকে যখন গ্রেফতার করে থানায় রাখা হয়, তখন থেকেই তার স্ট্যাটাস হয় আন্ডার ট্রায়াল প্রিজনার।

এই বিষয়ে আরও একটু গভীরে আলোচনা করলে যে বিষয়টি আসে, তা হলো পিআর ১৯৪৩ এর ২৬১ প্রবিধান। এই একই বিষয় যদিও ভিন্নভাবে আমাদের আপিল বিভাগে আলোচনা হয়েছে এবং আপিল বিভাগ সিভিল আপিল নাম্বার ৫৩ অব ২০০৪ মামলায় রায়েও বলা হয়েছে যে, গ্রেফতারের তারিখ থেকে ১৫ দিন পরে কোনো ব্যক্তিকে কোনোভাবেই ডিটেনশন কিংবা পুলিশ রিমান্ডে পাঠানো বৈধ নয় । এটিকে শুধু অবৈধ বলেই মহামান্য আপিল বিভাগ ক্ষান্ত হননি; বরং আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, এর লঙ্ঘন হলে তা সংবিধানে প্রদত্ত জনগণের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম মৌলিক অধিকার ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন হবে।

তবে এর ব্যতিক্রম দেখা গেল পরীমণির মামলায়। কেননা, পরীমণির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিডিয়া সূত্রে জানা যায়, মাদক সংক্রান্ত একটিমাত্র মামলা হয়েছে এবং যে মামলায় দুইবার রিমান্ডের পর তৃতীয়বার রিমান্ড চাওয়া হয়েছে গত ১৮ আগস্ট। পরীমণিকে গ্রেফতার করা হয়েছে গত ৪ আগস্ট। সেই সূত্রে ১৫ দিন শেষ হয় ১৮ আগস্টে এবং এই কারণে গত ১৯ আগস্ট একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার ব্যাপারটি উল্লেখিত আইন ও উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তরে ব্যতয় বললে ভুল হবে?

লেখক- আইনজীবী ও খণ্ডকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।



সাতদিনের সেরা