kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

[সুপ্রভাত বাংলাদেশ]

১০ টাকায় স্বাস্থ্যসেবা

দরিদ্র মানুষের চিকিত্সাসেবার জন্য একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন ঢাকার দোহার উপজেলার দক্ষিণ জয়পাড়ার আব্দুল হাকিম মিয়া। মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে চিকিত্সাসেবা ও ওষুধ পেয়ে থাকে রোগীরা। লিখেছেন শওকত আলী রতন

২৪ আগস্ট, ২০২১ ১১:৪৫ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



১০ টাকায় স্বাস্থ্যসেবা

রোগী দেখছেন ডা. জালাল উদ্দিন

২০০৮ সালের কথা। জয়পাড়ার আব্দুল হাকিম মিয়ার হঠাৎ শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। কাছাকাছি কোনো হাসপাতাল না থাকায় চিকিৎসার জন্য আনতে হয় ঢাকায়। পথে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল সেবার। শেষমেশ একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ভাবলেন, কাছাকাছি যদি একটা হাসপাতাল থাকত তাহলে হয়তো তাঁকে এত কষ্ট করে শহর পর্যন্ত আসতে হতো না। তিনি না হয় আসতে পেরেছেন। কিন্তু অনেকের তো এটুকু সামর্থ্যও নেই। ঠিক করলেন সুস্থ হওয়ার পর একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নির্মাণ করবেন, যেখানে সেবা পাবে সাধারণ মানুষ।

২০০৯ সাল। নিজ বাড়ির কাছে ১৩ শতাংশ জমির ওপর ভবন নির্মাণকাজ শুরু করেন। বছরখানেকের মাথায় মোট ছয় কক্ষবিশিষ্ট ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এরই মধ্যে আব্দুল হাকিম মিয়া আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিনকে দিন তাঁর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। হাসপাতালে মানুষজনের সেবা পাওয়ার দৃশ্য দেখে যাওয়ার খুব শখ ছিল তাঁর। স্বজনরাও চাইলেন সেই ইচ্ছা পূরণ করতে। ফলে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি একজন এমবিবিএস ডাক্তার, একজন করে মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, হিসাবরক্ষক ও অফিস সহকারী এবং নৈশ প্রহরী দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে আল হাকিম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। এটি উদ্বোধনের কিছুদিন পরই ইহকালের মায়া ত্যাগ করেন আব্দুল হাকিম মিয়া। তাঁর এক ছেলে, তিন মেয়ে। ছেলে জার্মানিপ্রবাসী। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। মৃত্যুর আগে বড় মেয়ে সেলিনা হাইকে বুঝিয়ে দিয়ে যান কিভাবে চলবে তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানটি। সেলিনা হাই এখন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সপ্তাহে ছয় দিন সেবা পেয়ে থাকে মানুষ। ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি মানুষ সেবা পেয়েছে এখান থেকে। দোহারের রাইপাড়া, খাড়াকান্দা, ইউসুফপুর, উত্তর জয়পাড়া, দক্ষিণ জয়পাড়া, কাটাখালী, নিকড়া, বানাঘাটা, ইসলামপুর, খালপাড়, চরমাহমুদপুর, বটিয়া ও চরলটাখোলা এলাকার মানুষজন সেবা নিয়ে থাকে। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে দৈনিক ৩০ জন রোগী চিকিত্সাসেবা ও ওষুধ পেয়ে থাকেন। কোনো রোগীর উন্নত চিকিত্সার দরকার হলে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এককালীন আর্থিক সহযোগিতাও প্রদান করা হয়। যেমন জয়পাড়ার মানিক আহমেদ ভুগছিলেন কোমরের হাড় ক্ষয়জনিত সমস্যায়। কিছুদিন আগে তাঁকে ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে। নিকড়া এলাকার জুলেখা আক্তার বলেন, ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর থেকে অসুস্থ হলে এখানে ডাক্তার দেখাতে আসি। ডাক্তার সময় নিয়ে দেখেন আমাদের।’

শুরু থেকেই চিকিত্সক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. জালাল উদ্দিন। এখানে যোগদানের আগে তিনি খুলনা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বললেন, ‘সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই এখানে কাজ করছি।’ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপান্তর করার কাজ চলছে। কিছুদিনের মধ্যে ১০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানালেন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সেলিনা হাই। বললেন, ‘বাবা ছিলেন উদার মানুষ। ১১ বছর ধরে তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় ব্যয় বহন করছি আমরা। যত কষ্টই হোক আব্বার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাব। সবাই সহযোগিতা করলে ভবিষ্যতে এটিকে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপান্তর করতে চাই।’



সাতদিনের সেরা