kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

জোট অপশাসনকালের এক কালো দিন

এম নজরুল ইসলাম   

২০ আগস্ট, ২০২১ ০২:৫৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জোট অপশাসনকালের এক কালো দিন

২১ আগস্ট, ভয়াল দুঃস্বপ্নের দিন। গা শিউরে ওঠা, থমকে যাওয়া একটি দিন। বাংলাদেশের ইতিহাসে রচিত হয় এক রক্তাক্ত অধ্যায় এই দিনে।

কী ঘটেছিল সেদিন? মিছিল উপলক্ষে বিকেল ৪টা থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষে ভরে ওঠে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। ৫টার দিকে বুলেটপ্রুফ গাড়িতে করে সমাবেশস্থলে পৌঁছান শেখ হাসিনা। বক্তৃতায় তিনি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং দেশব্যাপী বোমা হামলা বন্ধে সরকারকে হুঁশিয়ার করেন। প্রায় ২০ মিনিট বক্তৃতা শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল শুরুর ঘোষণা দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে শুরু হয় গ্রেনেড হামলা। একে একে ছোড়া হয় ১৩টি আর্জেস গ্রেনেড। পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এরপর শেখ হাসিনার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। নিক্ষিপ্ত গ্রেনেডগুলোর মধ্যে তিনটি অবিস্ফোরিত থেকে যায়। আহত মানুষের আর্তচিৎকার, ছড়িয়ে থাকা ছিন্নভিন্ন দেহ, রক্ত আর পোড়া গন্ধ—সব মিলিয়ে বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি হয় পুরো এলাকায়। আহতদের সাহায্য করার বদলে বিক্ষুব্ধ এবং আহত মানুষের ওপর বেপরোয়া লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে তৎকালীন সরকারের পুলিশ। মুহূর্তের মধ্যে দোকানপাট ও যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করে সবাই। সেদিনের গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মারা যান ২৪ আগস্ট। ওই দিন নিহত হন মোস্তাক আহমেদ সেন্টু, ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, রফিকুল ইসলাম আদা চাচা, সুফিয়া বেগম, হাসিনা মমতাজ রীনা, লিটন মুন্সী ওরফে লিটু, রতন সিকদার, মো. হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মামুন মৃধা, বেলাল হোসেন, আমিনুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, আতিক সরকার, নাসিরউদ্দিন সর্দার, রেজিয়া বেগম, আবুল কাসেম, জাহেদ আলী, মমিন আলী, শামসুদ্দিন, আবুল কালাম আজাদ, ইছহাক মিয়া ও অজ্ঞাতপরিচয় আরো দুজন।

হামলায় আহতের মধ্যে ছিলেন জিল্লুর রহমান, আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, কাজী জাফর উল্যাহ, ওবায়দুল কাদের, ড. হাছান মাহ্মুদ, আবদুর রহমান, আখতারুজ্জামান, অ্যাডভোকেট রহমত আলীসহ পাঁচ শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে অনেকে কিছুটা সুস্থ হলেও পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে অনেক নেতাকর্মীকে। সেদিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাঁদের।

শেখ হাসিনার ওপর এটাই প্রথম আক্রমণ নয়। এর আগেও একাধিকবার তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়েছে। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পর থেকেই একের পর এক চক্রান্তের শিকার হয়েছেন তিনি। রাজনীতির কঠিন ব্রত সাধনা থেকে তাঁকে বিরত রাখতে না পেরে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রথম সরাসরি তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। লালদীঘি ময়দানে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি বর্ষণ করা হয়েছিল। নেতাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে সেবারও প্রিয় নেত্রীর জীবন বাঁচিয়েছিলেন। সেদিন নিহত হয়েছিলেন সাত নেতাকর্মী। আহত হয়েছিলেন তিন শতাধিক। ১৯৮৯ সালের ১১ আগস্ট দ্বিতীয়বারের মতো হামলা হয় তাঁর ওপর। ফ্রিডম পার্টির একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সহায়তায় ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে মধ্যরাতে গুলিবর্ষণ করে। গ্রেনেড হামলা চালায়। প্রিয় নেত্রী তখন ওই বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। ঘাতকদের অপচেষ্টা সেখানেই থেমে থাকেনি। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আবার আক্রান্ত হন তিনি। উপনির্বাচনের ভোটের পরিস্থিতি দেখতে গ্রিন রোডের ভোটকেন্দ্রে গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির সন্ত্রাসীরা গুলিবর্ষণ ও বোমাবর্ষণ শুরু করে। এরপর বছর তিনেক থেমে থাকা। ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আবার আক্রমণ করা হয় তাঁকে। নাটোর রেলস্টেশনে তাঁকে বহনকারী রেলগাড়ির কামরা লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। ১৯৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর রাসেল স্কয়ারের সমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তখন বিরোধী দলের নেতা। ওই সমাবেশেও তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়া হয়। এরপর ১৯৯৬ সাল। সেদিন ছিল ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের স্মারক বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সভামঞ্চ লক্ষ্য করে একটি মাইক্রোবাস থেকে গুলি চালানো হয়।

বাংলাদেশে আগস্ট মাসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্টে সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অন্যদিকে বিগত জোট সরকারের আমলে, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জঙ্গিরা তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছিল একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়ে। জানিয়ে দিয়েছিল, বিএনপির প্রত্যক্ষ মদদে ও পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে উঠলেও জঙ্গি আদর্শের মৌলবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতে গিয়ে বিএনপিকেও ছাড় দেবে না তারা।

অপশাসন কী, অপশাসনের ফল কী হতে পারে, বাংলাদেশের মানুষ তা প্রত্যক্ষ করেছে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। একটি উদারনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অসাম্প্রদায়িক সমাজকাঠামোকে বদলে দেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র দেখা গেছে ওই সময়ে। আমরা দেখেছি, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসের সঙ্গে কেমন করে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় মৌলবাদ ও সরকার। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিস্তারও তো আমরা বিগত জোট সরকারের শাসনামলে প্রত্যক্ষ করেছি। ২০০১ থেকে শুরু করে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জামায়াত-বিএনপি অপশাসনকালে বারবার প্রমাণিত হয়েছে মানবিক নয়, একটি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী কী করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে রং বদল করে। কেমন করে মানুষের মুখ হয়ে যায় ঘাতকের মুখ। কী করে হীন স্বার্থে রাজনীতি থেকে নীতি ও নৈতিকতা চিরতরে বিসর্জন দেওয়া হয়। একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল কল্যাণমুখী ব্যবস্থা কী করে নষ্ট করা যেতে পারে, তারও উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে জামায়াত-বিএনপি জোট অপশাসনকালে। ১৯৭৫ সালের কালরাতের পর বাংলার ইতিহাসের আলোহীন জোট অপশাসনকালের এক কালো দিন ২১ আগস্ট। সৌম্য বিকেলে সেদিন অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছিল ঢাকার রাজপথে। দিনের আলো যেন নিভে গিয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই।

কেন বারবার এই হত্যাচেষ্টা? উত্তরও খুব সহজ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় একটি আদর্শ ধারণ করে। ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্রের আদর্শে বাংলাদেশের গড়ে ওঠার বিপক্ষে যাদের অবস্থান ছিল, তাদের ষড়যন্ত্রেই ১৯৭৫ সালে সপরিবারে হত্যা করা হয় বাংলাদেশের মহান স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তাঁকে হত্যা করলেও হত্যা করা যায়নি তাঁর আদর্শ। তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে তাঁরই আদর্শের পথ ধরে। মুজিবাদর্শের বাংলাদেশ যারা চায় না, তারাই বারবার জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা কিংবা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা একই সূত্রে গাঁথা। এর নেপথ্যে কাজ করেছে আদর্শ হত্যার চেষ্টা। বাংলাদেশকে প্রগতির পথ থেকে, মুজিবাদর্শের পথ থেকে সরিয়ে দিতে চায় যারা, তারাই বারবার এই অপচেষ্টা করেছে। এ চেষ্টা যে তারা আরো করবে, এ আশঙ্কা অমূলক নয়।

লেখক : সর্ব ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী

[email protected]



সাতদিনের সেরা