kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

আন্তর্জাতিক যুব দিবস

দেশের তরুণ নারী ও কিশোরীরা আজও অরক্ষিত

নিখিল ভদ্র   

১২ আগস্ট, ২০২১ ১০:৪৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেশের তরুণ নারী ও কিশোরীরা আজও অরক্ষিত

বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও ‘খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তর: মানুষের জন্য যুব উদ্ভাবন’ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস উদযাপিত হচ্ছে। বিশ্বের সব দেশের সরকারের মধ্যে তাদের দেশের যুবকদের প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং তাদের প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য সচেতনতা তৈরি করাই এই দিবসের লক্ষ্য। বাংলাদেশের জন্য দিবসটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠিই তরুণ ও যুবক। তারাই উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রকৃত কারিগর। অথচ দেশের তরুণ নারী ও কিশোরীরা আজও অরক্ষিত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমান বিশ্বে ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সের মধ্যে ১৮০ কোটি (১.৮ বিলিয়ন) যুবক-যুবতী রয়েছেন যা এ যাবৎ নবীন মানুষের সর্ববৃহৎ জনসংখ্যা। তবে, এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে বর্তমান বিশ্বে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী সমস্ত শিশু এবং কিশোর-কিশোরীর অর্ধেকেরও বেশি প্রাথমিক শিক্ষা, ন্যূনতম পড়াশোনা এবং প্রাথমিক গণিতে ভয়ানক দক্ষতার অভাব রয়েছে, যদিও তাদের বেশিরভাগই বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। এই বৈশ্বিক শিক্ষার সঙ্কট মারাত্মকভাবে অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে উঠবে। তাই জাতিসংঘের পরিকল্পনায় দশটি ক্ষেত্র- শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, যুব সমাজে মাদকের অপব্যবহার, কিশোর-কিশোরী অপরাধ, অবসরের কর্মকাণ্ড, বালিকা, যুব, মহিলা এবং সমাজ জীবনে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুবকদের পূর্ণ এবং কার্যকর অংশগ্রহণ বিষয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু করোনাকালে অর্থনীতি হয়েছে বিধ্বস্ত। এর অনিবার্য প্রভাবে বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধির প্রসার ঘটেছে।

বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) এক গবেষণায় বলা হয়, ২০২০ সালে করোনার সাত মাসে দেশের ২১ জেলার ৮৪ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। ‘বাল্যবিয়ের অবস্থা দ্রুত বিশ্লেষণ: করোনাকাল ২০২০’ শীর্ষক এক জরিপে বলা হয়েছে, করোনাকালে নিম্ন আয়ের মানুষ নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিল আয় হারানো, ক্ষুদ্র ব্যবসা ধ্বংস ইত্যাদি। করোনাকালে দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও পরিবারের সদস্যদের মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা করতে না পারা বাল্যবিবাহের বড় কারণ হিসেবে বর্ণনা করে ৩০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। করোনাকালে বাল্যবিবাহের অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিদ্যমান সামাজিক নিয়ম-বিশ্বাস, স্কুল বন্ধ, বাল্যবিবাহের মাধ্যমে অভিভাবকদের কিছু সুবিধা পাওয়ার আশা, কম পরিমাণ যৌতুক দেওয়ার সম্ভাবনা। আর এতে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য। কর্মসংস্থান যুব উন্নয়ন এবং স্বায়ত্তশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার এবং লিঙ্গ সমতার সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত; জলবায়ু সংকট এবং দুর্যোগ বিশ্বব্যাপী সেবায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

বাল্যবিবাহের মতো সমস্যা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি করোনাকালে বেড়েছে নারী নির্যাতনও। বিশ্বের যেসব দেশে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারী নির্যাতনের হার বেশি, সেসব দেশের তালিকায় সম্প্রতি এসেছে বাংলাদেশের নাম। দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৫০ শতাংশই জীবনে কখনো না কখনো সঙ্গীর হাতে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশ্বের ১৬১টি দেশ ও অঞ্চলে ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নারী নির্যাতনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আলাদাভাবে করোনা মহামারির মধ্যে সর্বশেষ ১২ মাসে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারীর শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ তালিকায়ও ১৬তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। করোনাকালে দেশে ২৩ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

করোনাকালে দেশে জনসংখ্যার হার কাঙ্খিক্ষত মাত্রার চেয়ে বেড়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় গত বছর প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার অতিরিক্ত শিশুর জন্ম হয়।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএনউইমেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ নারী তাঁদের স্বাস্থ্য পরিচর্যার সামগ্রীর অপ্রতুলতার কথা বলেছেন, বিশেষ করে নারীপ্রধান পরিবারের কাছে এ সমস্যা প্রকট। ‘কভিড-১৯ বাংলাদেশ: র‌্যাপিড জেন্ডার অ্যানালিসিস’ শিরোনামে ওই গবেষণাটি ছিল জেন্ডার ইন হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ নামের একটি জোটের উদ্যোগ। নিম্ন বা স্বল্প আয়ের নারীরা কীভাবে তাঁদের মাসিককালীন ব্যবস্থাপনা করছেন, তা জানতে গত বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটারএইড বাংলাদেশ একটি গুণগত গবেষণা করে। তাতে দেখা যায়, নিম্ন আয়ের নারীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যার ক্ষেত্রে করোনার প্রভাব প্রকট।

অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি রওশন আরা বেগমের মতে, ‘করোনাকালে গর্ভপাতের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। বেড়েছে ঘরে সন্তান জন্ম দেওয়ার হার। এসবের প্রভাব নারীস্বাস্থ্যের ওপর পড়েছে। মাসিককালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যার ক্ষেত্রে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল, এরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আছে। তবে তা কতটা পড়েছে, তা বলার মতো পর্যাপ্ত গবেষণা আমাদের হাতে নেই।’

কিশোর-কিশোরী ও যুবদের নিয়ে দীর্ঘ দিন কাজ করছেন টিম এ্যসোসিয়েটসের সিইও পুলক রাহা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, তরুণরাই বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের মানবাধিকার ভিত্তিক যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা এবং তথ্যে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আইনী সংস্কারের পাশাপাশি ব্যাপক সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনে সহায়ক পদ্ধতির বিকাশের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষায় মেয়ে শিশুর প্রবেশাধিকার সুরক্ষিত এবং উন্নীত করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে পিতা-মাতা এবং অন্যান্য আইনগত অভিভাবকদের ভূমিকা, আত্মমূর্তি, আত্মসম্মান এবং মর্যাদা শক্তিশালী করতে এবং মেয়েদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ রক্ষায় উন্নতি ও সমর্থনে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। যুব সমাজ মানেই ছেলেমেয়ের সমান অংশীদারত্ব, এটি সর্বজন স্বীকৃত হতে হবে। তাহলেই যুব সমাজের অংশগ্রহণে জাতিগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।



সাতদিনের সেরা