kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

ফজিলাতুন নেছা ও বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম

মাসুমা সিদ্দিকা   

৩ আগস্ট, ২০২১ ১৭:৩৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ফজিলাতুন নেছা ও বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম

অনেক জগদ্বিখ্যাত মানুষের পেছনে এমন একজন থাকেন, যার সহযোগিতায়, অনুপ্রেরণায় তাঁরা এগিয়ে চলেন সামনে। কিন্তু পর্দার আড়ালে থাকা এসব মানুষের কথা সেভাবে আমরা জানি না বা তাঁদের তেমন করে স্মরণ করা হয় না । এমনই একটি নাম বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, যিনি ছিলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী। বঙ্গবন্ধুকে যিনি অনেক উচ্চ স্থানে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি তাঁর কর্মের দ্বারা আমাদের বঙ্গমাতা হয়ে উঠেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকেছেন সব সময়, ছায়ার মতো সঙ্গী হয়ে সাহস জুগিয়েছেন, বাংলাদেশকে স্বাধীন করবার জন্য আত্মোৎসর্গ করেছেন । কিছু রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে, কিছু দিবসে তাকে নিয়ে কিছু আলোচনা করা হয় বটে, কিন্তু তাঁর অবদান নিয়ে যথার্থ কোনো গবেষণা হয়নি বললেই চলে।

বঙ্গবন্ধুর জীবনের অনেক বড় বড় অর্জনের পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছেন এই মহীয়সী নারী। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ যে বইটি আমরা পাই, সেটি লেখার পেছনেও ফজিলাতুন নেছার রয়েছে এক বিশাল অবদান। বঙ্গবন্ধু যখন জেলে ছিলেন তখন তিনি বঙ্গবন্ধুকে আত্মজীবনী লেখার জন্য পরামর্শ দেন এবং লেখার জন্য সব কিছুর উপকরণও জোগাড় করে দেন তাঁর স্বামীকে যেন তিনি জেলের এই সময়টাকে কাজে লাগাতে পারেন ভবিষ্যতের জন্য। আর তখন বঙ্গবন্ধু তাঁর অনুপ্রেরণায় লেখেন তার বিখ্যাত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, ফজিলাতুন নেছা বলেছিলেন, 'বসেই তো আছো, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।' (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ১)

স্বামীর সুখে নিজের সুখ মনে করেছেন তিনি। রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক সময় বঙ্গবন্ধুর কাছে যা টাকা থাকত তার সব খরচ হয়ে যেত। আর রাজনীতির বাইরে অন্য কোনো পেশায় জড়িত না থাকা বঙ্গবন্ধুকে তখন টাকার জন্য শরণাপন্ন হতে হয় তাঁর বাবা-মায়ের কাছে। আর কখনো তাঁদের কাছে টাকা না পেলে তার সহধর্মিণীর কাছে পেতেন, যিনি কিনা নিজের শখ না মিটিয়ে টাকাগুলো জমিয়ে রাখতেন তাঁর প্রাণপ্রিয়র জন্য। একজন মহিলার স্বামীর প্রতি কতখানি ভালোবাসা থাকলে, বিশ্বাস থাকলে নিজের শখ না মিটিয়ে স্বামীকে অবলীলায় টাকা দিতে পারেন তা আমরা সহজেই বুঝতে পারি।

বঙ্গবন্ধু জীবনের বেশির ভাগ অংশই জেলে বসে কাটিয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু যখন জেলে থাকতেন ফজিলাতুন নেছা তখন একাই অম্লান বদনে শুধু যে সংসার সামলেছেন তা কিন্তু নয়, তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক বন্ধুবান্ধবদের তিনি নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন, রাজনীতির খবর নিয়েছেন; দিয়েছেন তাদের প্রয়োজনমতো পরামর্শ; করেছেন আর্থিক সহায়তাও। কেউ বিপদে পড়লে তিনি সাধ্যমতো সাহায্য করেছেন। কোনো সংসারের কর্তা ব্যক্তিটি যদি বাড়িতে না থাকেন তবে গৃহকর্ত্রীর ওপর যে কী ভীষণ চাপ বয়ে যায় সব দিক সামলাতে, সেটা আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি। কিন্তু আমাদের বঙ্গমাতা এই কাজটা কত অনায়াসেই সুচারুরূপে না করে গেছেন। কাউকে বুঝতে দেননি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি। কোনো দিন অভিযোগ কিংবা অনুযোগ করেছেন বলে শোনা যায় না। বঙ্গবন্ধুও তাঁর স্ত্রীর এই অবদানের কথা সব সময় স্বীকার করে গেছেন।

বেগম ফজিলাতুন নেছা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে অনেক দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন। ১৯৬৯ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান যখন বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে লাহোরে সমাবেশের অনুমতি দেন, তখন ফজিলাতুন নেছা বলেন, যদি সমাবেশে যোগ দিতেই হয় তবে মুক্তভাবে, বন্দি হয়ে নয়। শেখ মুজিবও রেনুর কথা শুনেছিলেন এবং প্যারোলে মুক্তি নিয়ে সমাবেশে যোগ দেননি। আর যার ফলে প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় এবং বঙ্গবন্ধু নিঃশর্ত মুক্তি পান। সাধারণ একজন গৃহিণী হয়েও তিনি যে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে, তা সত্যিই দুর্লভ। ৬ দফা আন্দোলনের সময় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ না দেওয়ার জন্য পরামর্শ, ভুট্টোর সাথে ছয় দফা নিয়ে সমঝোতা না করার পরামর্শ সত্যিই তার দূরদর্শিতার পরিচায়ক। বঙ্গবন্ধু যখন ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দিতে যাবেন, তখনো তিনি ফজিলাতুন নেছার পরামর্শ শুনেছিলেন। স্বামীকে ডেকে তিনি অন্য নিত্যদিনের মাড়ানো পথ ব্যবহার না করে অন্য পথ দিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং তার সাথে আর কে কে যাচ্ছেন সেটাও তিনি শুনেছেন। তিনি তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর যা ইচ্ছা হয়, নিজের বুদ্ধিতে যেটা ভালো মনে হবে সেটাই যেন তিনি বলেন।  অনুমান করা দুঃসাধ্য নয়, স্ত্রীর এই অটুট আস্থা, অনুপ্রেরণা ও পরামর্শ বঙ্গবন্ধুকে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে অটল থাকতে অনেক সাহায্য করেছে। বঙ্গবন্ধুর সমসাময়িক আওয়ামী লীগের আরেক নেতা শামসুল হকের বিয়ে এবং বিয়ে-পরবর্তীতে স্ত্রীর বিভিন্ন চাপে ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথে তুলনা করলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি ফজিলাতুন নেছার দূরদর্শিতা ও আত্মত্যাগ।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে যখন মুজিবকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ফজিলাতুন নেছা তাঁর ছোট দুই ছেলে রাসেল ও জামালকে নিয়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ তারিখে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে হানা দেয় এবং লুটপাট করে অনেক কিছুই, ভাঙচুরও করে। সেই বাড়িতেই বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘরের সাথে একটা ড্রেসিংরুম ছিল। যেখানে একটা আলমারির ওপরে এক কোণে বঙ্গবন্ধুর জেলখানা জীবনের খাতাগুলো যত্ন করে রাখা ছিল, যা রেখেছিলেন তার সহধর্মিণী। তিনি এমনই গোছালো, যত্নময়ী ছিলেন যে স্বামীর সমস্ত কিছু অনেক যত্নে আগলে রাখতেন ভবিষ্যতের জন্য। তাই হয়তো বা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, ভবিষ্যৎ বাঙালিদের কথা চিন্তা করে তিনি এই বইগুলো সংরক্ষণ করে গেছেন। 

বঙ্গবন্ধু স্ত্রী সম্পর্কে কখনো কোনো অভিযোগ করেননি। রেনু সব সময় স্বামীকে আগলে রাখতেন। স্বামীর খাবারদাবারের প্রতি ভীষণ রকম যত্নবান ছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকে বঙ্গবন্ধু একটু রোগা পটকা ছিলেন। তাই সব সময় ফজিলাতুন নেছা নিজের হাতে স্বামীর জন্য রান্না করতেন। তিনি স্বামীর জন্য ননী, ছানা, দুধ, ঘি এসবের আয়োজন রাখতেন সব সময়ে। নিজের খাবারের প্রতি মনোযোগী না থেকে স্বামীর খাবারের প্রতি খুব মনোযোগী ছিলেন। যখন শেখ মুজিব জেলে থাকতেন তখনো তিনি নিজ হাতে মুজিবের পছন্দের রান্নাগুলো করে পাঠিয়ে দিতেন। শুধু যে খাবারের প্রতি যত্নবান ছিলেন তা কিন্তু নয়। তিনি তার স্বামীর জামাকাপড়ের প্রতিও তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। সব সময় ফজিলাতুন নেছা স্বামীকে পরিপাটি করে জনসভায় পাঠাতেন আর তাতে আমরা ফজিলাতুন নেছার আদর্শ রুচিবোধেরই  পরিচয় পাই। একজন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হয়েও তিনি সাধারণ জীবন কাটিয়েছেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অলংকার, আসবাবপত্র কিছুই তার ছিল না। অনেক সময় তিনি নিজের অলংকার-আসবাবপত্র বিক্রি করেও দলের নেতাকর্মীদের সাহায্য করে গেছেন। 

বঙ্গবন্ধুর যে দীর্ঘ সংগ্রামের কথা আমরা জানি, তার ক্ষুদ্র পরিসরেই আমরা ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে পাই।  তাঁর সম্বন্ধে আলোচনা যেন বঙ্গবন্ধুর সংসারে অবদান নিয়েই সীমাবদ্ধ থেকেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাঁর কথা তো আরো বৃহৎ পরিসরে জানার, আলোচনার ছিল; কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। আজ বাংলাদেশে তার নামে অনেক ছাত্রাবাস, কলেজ স্থাপিত হলেও তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানানোর জন্য সেগুলো যথেষ্ট নয়। তাঁকে জানবার জন্য, তাঁর প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য আমাদের আরো গবেষণা দরকার, আরো বৃহৎ পরিসরে তাঁকে জানার ব্যবস্থা করা দরকার। একজন নারী, যিনি তাঁর সারাটা জীবন দিয়ে শেখ মুজিবকে নিরলসভাবে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, নিজের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন তাঁর জীবনের শেষদিন অবধি, তাঁর সেই জীবন ও দর্শনকে আরো বিস্তারিতভাবে অধ্যয়ন করার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক মহীরুহ হয়েও  তিনি প্রদীপের আলোয় থাকেননি, তাই বঙ্গবন্ধু ও এ দেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে হলে অবশ্যই ফজিলাতুন নেছাকে নিয়েও যথাযথভাবে গবেষণা করতে হবে। ফজিলাতুন নেছাকে শুধু বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী হিসেবে না দেখে বরং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর ও উপদেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করে তাঁর জীবন নিয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনা করা - এই জাতির  মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের স্বার্থেই প্রয়োজন।

রন্ধনশিল্পী ও কলাম লেখক



সাতদিনের সেরা