kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১।৮ সফর ১৪৪৩

স্বর্গরথ, মৃত্যুর পরে যে গাড়ি যাত্রা করে স্বর্গের পথে

লায়েকুজ্জামান   

২৯ জুলাই, ২০২১ ১৫:২৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্বর্গরথ, মৃত্যুর পরে যে গাড়ি যাত্রা করে স্বর্গের পথে

‘মরার আবার জাতি কি? অমর কথা শিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত উপন্যাসের সেই কালজয়ী সংলাপ পড়েছিলাম কলেজ জীবনে। ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে আমাদের বাংলা পড়াতেন শমসের স্যার। মনে পড়ে শ্রীকান্ত উপন্যাসটি তিনি আমাদেরকে লাইন ধরে ধরে পড়াতেন,নিজে পড়ে শোনাতেন আমাদেরকে। স্যারের মতো এত সুন্দর উচ্চারণ জীবনে আর কারো মুখে এখনো শুনিনি। এখনো হৃদয়ে গেথেঁ আছে,যেন চোখের সামনে ভাসে স্যারের বাচন ভঙ্গি। শ্রীকান্ত যেমনি ভাবে বলেছিলেন,মৃত মানুষের কোনও জাত থাকে না। লালন সাইঁজি তাইতো বলেছেন,‘আসবার  সময় কি জাত ছিলে/ এসে তুমি কি জাত নিলে / কি জাত হবে  যাবার কালে /সে কথা ভেবে বলো না।’ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ক্ষুদ্ধ ভাষায় বলেছেন,‘জাতের নামে বজ্জাতি সব।’ সে যা হোক তবুও আমাদের সমাজে জাত পাতের বড়াই চলছে,হয় তো আরো চলবে। 

যারা আমাদের ছেড়ে,আমাদের  আগে দেহ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছেন,তারা স্বর্গবাসী হবেন,বেহশতবাসী হবেন,হ্যাভেনে জায়গা পাবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা। দুনিয়ার সকল ধর্মমত অন্তত একটি জায়গা একমত পোষন করতে পেরেছে আর তা হচ্ছে মানুষ। সকল ধর্মই মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে। ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীদের পবিত্র আল কোরানে মানুষকে বলা হয়েছে ‘আশরাফুল মাকলুকাত’মানে মানুষ হচ্ছে সৃষ্টির সেরা জীব। সনাতন ধর্মে বিশ্বাসীদের ধর্ম গ্রন্থ পবিত্র বেদে বলা হয়েছে ‘ ন মনুষ্যত্বং তরপরং বাচ্যং’ মানে মানুষই সেরা। খৃষ্টানদের ধর্ম গ্রন্থ হোলি বাইবেলে বলা হয়েছে ‘গড হ্যাজ মেইড ম্যান,আফটার হিজ ওউন ইমেজ’ অর্থাত সৃষ্টিকর্তা তার প্রতিচ্ছবি হিসেবে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। অন্যদিকে বৌদ্ধ ধর্মে মানুষের জয়গানকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কবির ভাষায় সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই। 


 স্বর্গরথের উদ্যোক্তা ড.যশোদা জীবন দেবনাথ 
সম্প্রতি ফরিদপুর গিয়ে একটি ভিন্ন ধরনের গাড়ি থেকে অবাক হয়েছিলাম। আশপাশের বন্ধুদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম এটা আবার কি। কাঁচে ঘেরা একটি গাড়ি ফুল দিয়ে মাড়ানো। ভেতরে শোয়ানো একটি মরদেহ। চালক ধীরে ধীরে গাড়ী চালিয়ে শ্মশানের দিকে এগোচ্ছেন। পেছনে মরদেহের  আত্মীয় স্বজনেরা,ধর্মীয় শব্দগুচ্ছ উচ্চারণ করতে করতে গাড়ির পেছনে পেছনে। গাড়ির সামনে লেখা ‘স্বর্গরথ’ প্রথমে মনে করেছিলাম হয় তো কোনও বিত্তবান লোকের মৃত্যুতে তার স্বজনেরা মরদহে শ্মশানে নেওয়ার জন্য এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। জানতে পারলাম না,ঘটনা তা নয়। 

স্বর্গরথ ফরিদপুরের একজন মানবিক মানুষের একটি উদ্যোগ। আগে ফরিদপুর শহরে সনাতন ধর্মাবলম্ব লোকদের কেউ মারা গেলে বাশেরঁ ওপর চাটাই বিছিয়ে ঘাড়ে করে মরদেহ নেওয়া হতো শ্মশানে। শহরের বিভন্ন মহলায় মুসলিমদের জন্য কবরস্থান থাকলেও সব মহল্লায় শ্মশান নেই। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘাড়ে করে মরদেহ আনা হতো অম্বিকাপুর শ্মশানে। বিষয়টি কম কষ্টসাধ্য ছিল না মোটেই। এ দিকটা বিবেচনা করে খ্যাতিমান ব্যবসায়ী ফরিদপুরের সন্তান ড.যশোদা জীবন দেবনাথ (সিআইপি) মহান উদ্যোগটি নিয়েছেন। নিজের অর্থে গাড়ি কিনে সজ্জিত করে দিয়েছেন। এখন শহরের কোন মহল্লায় সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী কেউ দেহত্যাগ করলে, শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে ফোন করলেই হাজির হয় গাড়ি। 

গাড়িটির একটি চমৎকার নামও দেওয়া হয়েছে‘ স্বর্গরথ’। আসলেই তো স্বর্গরথ- মানুষ তার সারাজীবনের পূন্য অর্জন করে জমিয়ে রাখে পরপারে স্বর্গবাসী হওয়ার আশায়। দেহ ত্যাগের পর সামজিক রীতি অনুসারে শ্মশানে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়,দেহটা দাহ করা হলেও আত্মাবিলীণ ঘটে স্বর্গের সুখে। সেই স্বর্গের পথে যাওয়ার জন্যই বাহনের নামে ‘স্বর্গরথ”। উদ্যোগটা ভালোই লাগলো। ধর্নবাদ যশোদা জীবন দেব নাথ। 
 



সাতদিনের সেরা