kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

এডমন্ড হিলারির জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ

পাহাড়কেই ধ্যানজ্ঞান করেছিলেন হিলারি

শায়লা বিথী   

২০ জুলাই, ২০২১ ১৮:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাহাড়কেই ধ্যানজ্ঞান করেছিলেন হিলারি

খুমজুং গ্রামে হিলারির স্থাপিত স্কুলের সামনে হিলারির প্রতিকৃতির সামনে লেখক

এভারেস্টের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যে নামটি জড়িয়ে আছে তিনি হচ্ছেন স্যার এডমন্ড পার্সিভাল হিলারি। নিউজিল্যান্ডের এই পর্বতারোহীই সর্বপ্রথম দুর্গম এভারেস্ট চূড়ায় আরোহন করতে সক্ষম হন। ইতিহাস গড়া বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী হিলারীর ১০২তম জন্মবার্ষিকী আজ। তাঁর জন্ম ১৯১৯ সালের ২০ জুলাই নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে।

কিশোর বয়সে পর্বতারোহণের প্রতি আগ্রহী হন এডমন্ড হিলারি। তিনি ১৬ বছর বয়সে তার স্কুলের টিমের সঙ্গে মাউন্ট রুয়াপেহুতে স্কি করতে গিয়েছিলেন। সেই থেকে পর্বতারোহণের প্রতি ঝোঁকেন হিলারি। তিনি অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অঙ্ক ও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক শেষ করেন।

কর্ম জীবন শুরু করেন মৌমাছি পালক হিসেবে। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ আল্পস পর্বতমালার মাউন্ট অলিভিয়া পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করার মাধ্যমে প্রথম একটি পর্বত শৃঙ্গজয় করেন হিলারি। পরবর্তীতে তার জীবনের সব কিছুই যেন ছিল পাহাড় পর্বতকে ঘিরে। পর্বতারোহণ সংক্রান্ত বিষয়ে যুক্ত থাকতে গিয়ে হিলারির জীবনে একটি অত্যন্ত বিয়োগান্তক ঘটনাও ঘটে। ১৯৭৫ সালে হিলারি হারান তার প্রিয়তম স্ত্রী ও কন্যাকে। তিনি তখন নেপালের উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে ফাফলু নামের একটি গ্রামে হাসপাতাল নির্মাণের কাজ করছিলেন। 

হিলারির স্ত্রী লুই মেরি রোজ ও কন্যা বালিন্ডা নেপালে এসেছিলেন হিলারির ডাকে। তারা কাঠমান্ডু থেকে একটি বিমানে ফাফলুতে যাবার পথে এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যান।

 

হিলারি ও তার পরিবার।

হিলারি নেপালের শেরপাদের জীবনের দুর্দশা দূর করতে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। দুর্গম হিমালয়ের গ্রামগুলোতে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা পৌঁছে দিতে গড়ে তুলেছেন হিমালয়ান ট্রাস্ট। ২০০৬ সাল নাগাদ তার এই ট্রাস্ট হিমালয়ের গ্রামগুলোতে ২৭টি স্কুল, দুটি হসপিটাল, ১৩টি ভিলেজ হেলথ ক্লিনিক, রাস্তা সংস্কার, পানির উৎসের সুব্যবস্থা করেছে।

এভারেস্টসহ হিমালয়ের বেশ কয়েকটি পর্বতচূড়া অভিযানে যেতে হয় নেপালের পাহাড়ি শহর লুকলা হয়ে। লুকলার বিখ্যাত বিমানবন্দর তেনজিং-হিলারি এয়ারপোর্ট নির্মাণের মূল ভূমিকায় ছিলেন হিলারি। তাঁর তত্ত্বাবধানে ১৯৬৪ সালে বিমানবন্দরটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। হিলারি স্থানীয়দের সমতল জমিতে এই বিমানবন্দর নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। তবে সেখানকার কৃষকরা তাদের জমি দিতে রাজি হননি। পরে তিনি ২৬৫০ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে বর্তমান লুকলা বিমানবন্দরের জমিটি ক্রয় করেন। তবে হিলারি বিমানবন্দরের রানওয়ের জায়গা কম হওয়া নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। এখনো তেনজিং-হিলারি এয়ারপোর্টকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এয়ারপোর্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সহজে লুকলা যাতায়াতের জন্য এয়ারপোর্টটি অভিযাত্রী ও স্থানীয়দের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই এয়ারপোর্টটি স্থাপনের মধ্যে দিয়ে হিলারি আকাশপথে লুকলার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন।

লুকলা থেকে এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে যেতে ফাকদিং নামের একটি গ্রাম হয়ে বিখ্যাত নামচে বাজার যেতে হয়। ফাকদিং থেকে নামচে বাজার ট্রেইলে দুধকশি নদী পড়ে। হিলারি এই নদীর উপরে একটি সাসপেনশন ব্রিজ নির্মাণ করেন। এই ব্রিজটির নাম এখন হিলারি সাসপেনশন ব্রিজ। ব্রিজটি নির্মাণের ফলে দুধকশি নদী পাড়ি দেওয়া এখন খুবই সহজ হয়ে গেছে। পাহাড়ি এলাকার মানুষ ও পর্বতারোহীদের কল্যাণে হিলারির অবদানের এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে নেপালের অনেক এলাকাতেই।

হিলারিকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে পড়ে গেলো নেপালের খুমজুং গ্রামের কথা। অনেকে এই গ্রামকে হিলারির গ্রামও বলে। খুমজুং নেপালের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সাগরমাথা জাতীয় উদ্যানের অংশ। এর উত্তরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখর এভারেস্ট বা সাগরমাতা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২ হজার ৪০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই খুমজুং গ্রাম খুম্বু অঞ্চলের সবচেয়ে বড় গ্রাম। এর পাশেই ১২ হজার ৬০০ ফুট উঁচুতে খুনদে নামে আরেকটি গ্রাম রয়েছে। এই দুই গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই পর্বতারোহণ ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত। 

২০১৫ সালে আমাদের এক অভিযানের সময়ে নামচে বাজার থেকে এই গ্রামে আসতে প্রায় ঘণ্টা তিনেক লেগেছিল আমাদের। নামচে বাজার থেকে লম্বা চড়াই। এরপর পাথুরে সমতল পথ। আমরা একপ্রকার হেলেদুলেই হাঁটছি। কেননা ওইদিন আমাদের কোনো তাড়া ছিল না। গ্রামের শুরুতেই লাল ফটক অভ্যর্থনা জানালো। ছবির মতো পথ ধরে হেঁটে চলেছি আমরা। হঠাৎ করে পিছু তাকাতেই দেখি মাইটি মনস্টার “আমাদাব্লাম” দু পাশে দু বাহু প্রসারিত করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। 

এমন দৃশ্য থেকে চোখ ফেরানো দায়। মেঘমুক্ত ঘন নীল আকাশে সাদা পাহাড়। সহসঙ্গী সামনে আগানোর তাড়া দিচ্ছিল। অগত্যা সামনে হাঁটতে হলো। পাহাড়ের ধাপে ধাপে বাড়িঘর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অন্তত শ দুয়েক ঘর তো হবেই। বাড়িগুলোতে আধুনিকায়নের ছোঁয়াও লাগছে। আমাদের গাইডের একটা পরিচিত লজে দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে আমরা গেলাম পাশেই খুনদে গ্রামে।

এই গ্রামের মানুষগুলোর উন্নত চিকিৎসার জন্য হিলারির অর্থায়নে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। এডমন্ড হিলারির এভারেস্ট অভিযানকালে অনেক শেরপাই এই দুই গ্রামের বাসিন্দা ছিল। সেখানে কিছু সময় ঘুরেফিরে আবার সেই লজে এলাম। দুপুরের খাবার শেষ করতেই দেখি মেঘ এসে ধীরে ধীরে ঢেকে দিচ্ছে খুমজুং। আমরা আর দেরি করলাম না। ফিরতি পথ ধরলাম। পথে দেখা পেলাম খুম্বু এলাকার সবচেয়ে বড় স্কুল “খুমজুং স্কুল”। যদিও এটি হিলারি স্কুল নামেই বেশি পরিচিত। তিনিই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে স্কুলটি কলেজে উন্নিত হয়েছে। বহুদূর থেকে এখানে পড়তে আসে ছাত্র-ছাত্রীরা। স্কুলের সাথেই হিলারির স্মরণে একটা ভাস্কর্য আছে। এরই মধ্যে মেঘ এসে পুরো গ্রাম ঢেকে ফেলেছে। স্কুলকে পেছনে ফেলে আমরা চড়াই ভেঙে আবার নামচে বাজারে ফিরতি পথে হাঁটছি আর ভাবছি একটা মানুষের পাহাড় প্রেমের কথা। এডমন্ড হিলারি যিনি তার জীবনকে উৎসর্গ করেছেন পাহাড়ের জন্য। পাহাড়ই ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান। আজ এই পাহাড় প্রেমী মানুষটির জন্মদিবস। তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

লেখক : পর্বতারোহী



সাতদিনের সেরা