kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

বারবার চিল্লাইয়া কইছি, আমি আছি চিন্তা কইরো না

কাজ সেরে বাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখনই দেখেন ধোঁয়ায় দম আটকে যাচ্ছে বলে দোতলার জানালা থেকে অনেকে সাহায্য চেয়ে প্রাণপণে ডাকছে। উদ্ধারে এগিয়ে এলেন হাসেম ফুডস কারখানার ফর্ক লিফট অপারেটর দেবনাথ জিৎ রুবেল। উপস্থিত বুদ্ধিমত্তায় উদ্ধার করেন ৩০ থেকে ৪০ জনকে। পিন্টু রঞ্জন অর্ককে বলেছেন সেই সময়ের কথা

১৩ জুলাই, ২০২১ ১১:৫৩ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বারবার চিল্লাইয়া কইছি, আমি আছি চিন্তা কইরো না

রুবেল ফর্ক লিফট অপারেটর। বেতন সাত হাজার টাকা।

৫টায় ডিউটি শ্যাষে বাসায় ফিরছিলাম। চুলগুলো বেশ বড় হইছিল। ভাবলাম, সেলুনে গিয়া কাটাইয়া আসি। ৫ নম্বর কলোনিতে গিয়া দেখি সেলুন বন্ধ। সেলুনের মানুষজন নাই বইলা চিন্তা করছি আরেক দিন আইসা কাটাইব। ফেরার পথে শুনলাম আগুন লাগছে। কারখানার দিকে তাকাইয়া দেখি বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী। দৌড়াই গেছি। দেখি যে, বিশাল বড় একটা আগুন লাইগা গেছে। কারখানার সামনে গিয়া দেখি মানুষগুলা ওপরে চিল্লাচিল্লি করতাছে বাঁচনের লাইগা। বলতাছে, আমাগোরে বাঁচাও, বাঁচাও। দুইতলা আর তিনতলায় থেইক্যা। তখনো ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসে নাই। হঠাৎ কইরা মাথায় আইলো ফর্ক লিফট দিয়া তো আমরা দুইতলায় মাল ওঠাই, নামাই। এখন যদি এখানে ফর্ক লিফটটা দিয়া দিই, তাইলে মানুষগুলা এটা দেইখা বুঝতে পারব যে আমারে সাহায্য করার জন্য আইছে। এক লগে ১০ থেকে ২০ জনরে নামান যাইবো। দেরি না কইরা তখন স্টোর থেইক্যা ফর্ক লিফট বাইর করলাম। স্টার্ট দিয়া দ্রুত কারখানার সামনে নিয়া আইলাম। দুইতলার জানালা দিয়া ধোঁয়া বাইর হইতাছিল। ভিতরে আগুন। গাড়িটার (লিফটের) সামনের অংশ দুইতলা পর্যন্ত উঠাইয়া দিলাম। সেখানে কাচ ভাইঙা নিচে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করতাছিল অনেকে। এরপর শ্রমিকরা লিফটের পাটাতনে খাড়াইলে তাদের নিয়া লিফট নিচে নামাইয়া আনলাম। এভাবে কয়েকবার করলাম। একেকবার ১০ থেকে ১২ জন কইরা।

এক পর্যায়ে দেখলাম, তিনতলা থেইক্যা অনেকে লাফ দিয়া লিফটের ওপর পড়তাছে। লাফাইতে গিয়া অনেকের হাত-পা ভাঙছে, কোমর ভাঙছে। লাফাইয়া তিনতলার কেউ কেউ লিফটের ওপরে থাকা মাইনষের ওপরও পড়ছে। ওপরতলা থেইক্যা লাফ দিতে গিয়া অনেকে নিচে পইড়া মারাও গেছে। লিফটে ঠেলাঠেলি কইরাও অনেকে আহত হইছে। আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ জনরে নামাইছি। মানুষ আরো বাঁচানো যাইত যদি লাফ না দিয়া মরত। কিন্তু হেরা পিছনে আগুন দেইখ্যা আর কোনো কিছু ভাবতে পারে নাই। লাফ দিছে। বারবার চিল্লাইয়া কইছি, আমি আছি। চিন্তা কইরো না। আস্তে আস্তে নামো। কিন্তু কে শোনে কার কথা।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মানুষগুলারে নামাইতে চেষ্টা করছি। আগুনে শরীর ঝলসাইয়া যাইতাছিল। গাড়িও গরম হইয়া গেছিল। এক পর্যায়ে গা থেইক্যা জামা খুইল্যা রাইখ্যা দিছি। তখন খালি মনে হইছে, মানুষজনরে তো বাঁচাইতে হইব। মানুষ তো লাফাইয়া লাফাইয়া মরতাছে। এদের যদি না নামাই, তাহলে তো মইরা যাইব। ঘণ্টাখানেক এভাবে কাজ করছি। ততক্ষণে ফায়ার সার্ভিসের লোক চইলা আইছে। পরে দেখি আহত শ্রমিরা মাটিতে শুইয়া ব্যথায় চিল্লাইতাছে। তখনো অ্যাম্বুল্যান্স-ট্যান্স কিচ্ছু আসে নাই। পরে এই ফর্ক লিফটে কইরাই চারজনরে ইউএস বাংলা মেডিক্যাল কলেজে নিয়া গেছি। এদের মধ্যে দুইজন পুরুষ, দুইজন নারী। যারা লাফাইয়া মইরা গেছে, তাদের জন্য খারাপ লাগছে। তারা যদি আমারে আরেকটু সময় দিত!



সাতদিনের সেরা