kalerkantho

বুধবার । ২০ শ্রাবণ ১৪২৮। ৪ আগস্ট ২০২১। ২৪ জিলহজ ১৪৪২

‘ভারতীয়রা যৌনতার ব্যাপারে কথা বলে না- তাই তাদের সাহায্য করি’

অনলাইন ডেস্ক   

১২ জুলাই, ২০২১ ১১:০২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘ভারতীয়রা যৌনতার ব্যাপারে কথা বলে না- তাই তাদের সাহায্য করি’

ভারতের বহু বিদ্যালয়ে এখনো যৌনতার ব্যাপারে শিক্ষা দেওয়া হয় না। ফলে ছেলে-মেয়েদের কাছে যৌনতা এবং সম্পর্ক নিয়ে কথা বলায় দায় পড়ে বাবা-মায়ের ওপর। 

কিন্তু বাবা-মা বেশির ভাগ সময় বুঝে উঠতে পারেন না- তারা কিভাবে, কতটা ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে কথা বলবেন। ভারতের যৌনবিষয়ক কোচ বা যৌন সম্পর্কের প্রশিক্ষক পল্লবি বার্নওয়াল বলেন, অতীতের দিকে তাকিয়ে আমি এখন ভাবি যে রক্ষণশীল পারিবারিক এবং সামাজিক আবহে আমি বড় হয়েছি, তার কারণেই আজ আমি একজন সেক্স কোচ। আমার নিজের বাবা-মায়ের সম্পর্ক প্রথম আমাকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে প্রভাবিত করেছে, যদিও সে সময় আমি তা বুঝতে পারিনি।

তিনি আরো বলেন, বছরের পর বছর ধরে আমার বাবা-মায়ের সম্পর্ক নিয়ে নানা কানাঘুষো, নানা গুজব শুনতাম। আমার বয়স যখন আট বছর, তখন অনেকে আমাকে এ নিয়ে প্রশ্ন করত। বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমার অনেক দূরসম্পর্কের খালা-ফুফু আমাকে কোনায় টেনে নিয়ে জেরা করত – 'তোর বাবা-মা কি এক ঘরে শোয়? দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়? অন্য কোনো পুরুষকে কি তোদের বাসায় আসতে দেখেছিস?'

'অনেক বছর পর আমার নিজের যখন বিচ্ছেদ হলো, আমার মা তার নিজের জীবনের কাহিনি আমাকে খুলে বলেছিলেন। তার বিয়ের পর এবং আমার ও আমার ভাইয়ের জন্মের আগে মা অন্য এক পুরুষের প্রতি গভীরভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই সম্পর্ক এমনকি দৈহিক সম্পর্কেও গড়ায়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করেন মা এবং সেই সম্পর্কের ইতি টানেন।'

'কিন্তু ভারতীয় সমাজের সর্বত্রই চোখ এবং কান। কিছুদিনের মধ্যে অনেক কথা আমার বাবার কানে চলে যায়। কিন্তু মায়ের কাছে সে কথা তুলতে বাবার ১০ বছর লেগে যায়। এর মধ্যে আমরা দুই ভাই-বোন জন্মেছি। বাবা আমার মায়ের কাছে প্রতিশ্রুতি দেন যে তার কোনো উত্তরই তাদের সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না।'

'ভরসা পেয়ে মা বাবাকে সব খুলে বলেন - তার প্রেমিকের সাথে সম্পর্কে যতটা না যৌনতা ছিল তার চেয়ে বেশি আবেগ। বাবা যখন দেখলেন তিনি যে গুজব বহুদিন ধরে শুনছেন তা সত্যি। মায়ের কথা শোনার পর একটি কথাও সেদিন তিনি বলেননি। চুপ মেরে ছিলেন। তার পর থেকে রাতারাতি তাদের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে।'

'আমরা বিহার রাজ্যের লোক। রক্ষণশীল একটি পরিবারে বড় হয়েছি। অন্য অনেক পরিবারের মতোই আমাদের পরিবারেও কখনো যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি কোনো কথাই হতো না। কখনো আমার বাবা-মাকে হাত ধরাধরি করতে বা আলিঙ্গন করতে দেখিনি। নিজের বাবা-মা তো বাদ দিলাম, ছেলেবেলায় আমাদের আশপাশে বা পরিচিত কোনো দম্পতিকেই শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হতে দেখিনি।'

'যৌনতা সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা জন্মে যখন আমার বয়স ১৪। এক বিকেলে গোপনে বাবার বইয়ের আলমারি ঘাঁটতে গিয়ে পাতলা একটি চটি বই চোখে পড়ল। খুলে দেখলাম নারী-পুরুষের দৈহিক সম্পর্কের রগরগে বর্ণনা দিয়ে সেটিতে বেশ কটি ছোট গল্প রয়েছে। বইটি যে কোনো সাহিত্যগ্রন্থ ছিল না তা পরিষ্কার ছিল। একটি গল্প ছিল এ রকম – উৎসুক এক তরুণী দেয়াল খুঁড়ে একটি ছিদ্র তৈরি করেছে, যাতে পাশের ঘরে বিছানায় একটি বিবাহিত দম্পতির কার্যকলাপ দেখতে পারে।'

'ওই বইটিতে প্রথম আমি চুম্বন শব্দটি পড়ে বোঝার চেষ্টা করলাম সেটা কি। বইটি পড়তে পড়তে আমার মাঝে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়, কিন্তু উত্তর দেওয়ার কেউই ছিল না। এর আগে বন্ধুদের সঙ্গেও এসব নিয়ে কোনো আলাপ আমার কখনো হয়নি।'

'নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকের কথা সেটি। তখন আমি জানতামই-না এই বই পড়ে আমি কোনো অন্যায় করিনি। আমি তখন জানতাম না যে আমার সমবয়সীরা বিশ্বের বহু দেশে যৌন সম্পর্ক নিয়ে শিক্ষা লাভ করে। বেলজিয়ামে সাত বছর থেকে যৌন শিক্ষা দেওয়া হয়।'

'কিন্তু ভারতে এখনো স্কুলে এ ধরনের শিক্ষা বাধ্যতামূলক নয়। ২০১৮ সালে প্রথম ভারতে স্বাস্থ্য এবং পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে স্কুলে যৌন শিক্ষার গাইডলাইন তৈরি হয়। কিন্তু ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ডজনেরও বেশি রাজ্য এখনো তা চালু করেনি।'

টাইমস অব ইন্ডিয়া সংবাদপত্রের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের গ্রামগুলোতে অর্ধেকেরও বেশি মেয়ের মাসিক সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই, কেন এটা হয় তারা জানে না।

'তবে সেদিন চটি বইয়ের ওই সন্ধান আমার জ্ঞানের রাস্তা খুলতে পারেনি। সত্যি কথা বলতে কি আমি লুকিয়ে পড়া বিষয়গুলো ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। ভারতের বেশির ভাগ মেয়ের মতো আমার ভেতরেও রক্ষণশীলতা পুরোদমে রয়ে গেল।'

'২৫ বছর বয়সে প্রথম আমার যৌনতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়। তার দুই বছর পর পারিবারিকভাবে অমার বিয়ে হয়। তখনো আমি আসলে অনভিজ্ঞই ছিলাম। আমার বিয়ের রাতটাও ছিল একটি প্রহসনের রাত।'

'শ্বশুরবাড়িতে ফুলশয্যার বিছানায় গোলাপের পাপড়ি ছিটানো ছিল। ঘরের ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম বিয়ে উপলক্ষে আসা স্বজনরা কথা বলছে। আমাদের ঘরের দরজার ঠিক বাইরেই তারা জোট বেঁধে শুয়ে-বসে রয়েছে।'

'আমার মা আমাকে বলে দিয়েছিলেন আমি যেন স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করি আমি তখনো কুমারী। সুতরাং আমি লাজুক হওয়ার ভান করছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না আমার কী করা উচিত। বিয়ের আগে স্বামীর সঙ্গে তেমন কোনো কথাই হয়নি, অথচ হঠাৎ এক রাতে অমি তার বিছানায় এবং স্ত্রীর ভূমিকায়। আমি কুমারী ছিলাম না, কিন্তু অনভিজ্ঞ ছিলাম।'

'এখন আমি প্রতি মাসে ডজন ডজন মেসেজ পাই, যেখানে মানুষজন জানতে চায় বিয়ের রাতে তাদের কী করা উচিত। শুধু শারীরিক সম্পর্ক নয়, তাদের আচরণ কী হওয়া উচিত তা জানতে চায় তারা।'

'আমার বিয়ে টিকেছিল পাঁচ বছর। প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম ভুল মানুষের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। ফলে যৌন সম্পর্কে কোনা আবেগ ছিল না, অনেকটা নৈমিত্তিক একটা ব্যাপার ছিল। আমরা সময় এবং দিনক্ষণ ঠিক করে রুটিন-মতো সেক্স করতাম। পরে যখন কাজের জায়গায় একজন সহকর্মীকে আমার ভালো লাগতে শুরু করল, বুঝতে পারলাম এই বিয়ের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।'

'বিয়ে একদিন ভেঙে গেল। ৩২ বছর বয়সে আমার তখন একটি সন্তান। তবে অনেক ভারমুক্ত মনে হলো, যদিও একজন ডিভোর্সি নারী হিসেবে পরিবারে-সমাজে আমার মর্যাদা কমে গেল।'

'তারপর দিল্লিতে কাজ এবং বসবাস শুরুর পর একে একে কয়েকজন পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ালেও কোনোটাই স্থায়ী হয়নি। পরীক্ষা করতে আমি বয়স্ক মানুষের সঙ্গে শুয়েছি, বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে শুয়েছি।'

'আমি যত খোলামেলা হয়েছি, আলাপ-আলোচনার বিষয়ও সেই সঙ্গে বদলেছে। আমার বিবাহিত বন্ধুরা আমার কাছে পরামর্শ নিতে শুরু করে। একসময় আমার মা – যার ভেতরও এক ধরনের বিদ্রোহী একটি সত্তা লুকিয়ে ছিল- আমার সঙ্গে এসে থাকতে শুরু করলেন।'

কেন আপনার বাচ্চার যৌনতা সম্পর্কে জানা উচিত প্রথমে সেটা অনুধাবন করুন : যৌনতা এবং যৌন সম্পর্ক নিয়ে কথা বললে আপনার বাচ্চা তার জীবনের আরো পরের দিকে নানা জটিলতা-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেতে পারে। আত্মমর্যাদার ঘাটতি, শরীর নিয়ে উদ্বেগ, যৌন নির্যাতন, অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক – এগুলো জীবনের একটা সময়ে যেকোনো মানুষকে সামলাতে হতে পারে।

তাদেরকে নিজের অভিজ্ঞতা শোনান : নিজের বাবা-মায়ের কাহিনি, অভিজ্ঞতা বাচ্চারা খুব ভালো বুঝতে পারে। কিভাবে তার বাবা-মা বড় হয়েছে তা জানতে তারা উৎসুক। তারা দেখতে চায় বাবা-মাও আর দশজনের মতো স্বাভাবিক মানুষ, যাদের অতীতে ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে। যৌনতা নিয়ে আপনার নিজের একসময় যে বিভ্রান্তি, ভুল ধারণা ছিল এবং যেসব চ্যালেঞ্জ আপনাকে পোহাতে হয়েছে তা বাচ্চাদের বলুন।

মতামত শেয়ার করুন : যৌনতা নিয়ে আপনার নিজের মূল্যবোধ ছেলে-মেয়েকে জানান। নগ্নতা, কৈশোর-তারুণ্যে যৌন সম্পর্ক, সমকামিতা, সমকামী বিয়ে, গর্ভপাত, জন্ম-নিয়ন্ত্রণ, বিয়ের সম্পর্কের বাইরে যৌনতা – এসব নিয়ে আপনার বিশ্বাস খুলে বলুন।
সূত্র : বিবিসি বাংলা।



সাতদিনের সেরা