kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

৬ দফার সংবাদ প্রকাশে গণমাধ্যমের ওপর খড়গ এবং আদালত

বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম   

৭ জুন, ২০২১ ১৬:০৯ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



৬ দফার সংবাদ প্রকাশে গণমাধ্যমের ওপর খড়গ এবং আদালত

তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণ বিশেষত বাঙালী জনগোষ্ঠিকে শোষণ-বঞ্চনা-নিষ্পেষণের হাত থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে ৫ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলের সম্মেলনে ছয় দফা দাবী উত্থাপন করেন। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগিরা ঐ দাবীসমূহের প্রবল বিরোধীতা করে এবং বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা করলেও খুব দ্রুতই ‘ছয় দফা’ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রাণের দাবীতে পরিণত হয়। ভীত-সন্ত্রস্থ হয়ে পড়ে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী। বেছে নেয় দমন-নির্যাতনের পথ। গ্রেফতার করে বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী, ছাত্র, যুবক-শ্রমিক-সহ আন্দোলনকারী ও নিরীহ জনগণকে। ৭ জুন ’৬৬ ছয় দফা আদায়ের লক্ষ্যে পালিত হয় দেশব্যাপী হরতাল। পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন নিরীহ ১১ জন আন্দোলনকারী। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে।

পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী সংবাদপত্রসমূহে ছয় দফা ও আন্দোলন সম্পর্কে এবং এর বিরুদ্ধে সরকারী পদক্ষেপ সম্পর্কে কোন সংবাদ যাতে প্রকাশিত না হয় সে কারণে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রন এবং খড়গ্ চালাতে থাকে। এ সময় গণমাধ্যমগুলির মধ্যে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা ছয় দফা প্রচার ও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিভিন্ন সংবাদ গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করতে থাকে।
ফলশ্রুতিতে পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্ণরের আদেশক্রমে ১৬ জুন ১৯৬৬ইং তারিখে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধিমালার ৫২ বিধির (২) উপ বিধিতে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে ইত্তেফাক পত্রিকা যে প্রেস হতে ছাপানো হতো অর্থাৎ রামকৃষ্ণ মিশন রোডে অবস্থিত ‘নিউ নেশন প্রিংটিং প্রেস’ তা বাজেয়াপ্ত করা হয়।

ঐ আদেশে উল্লেখ করা হয় যে-
i. গভর্ণর এই মর্মে সন্তুষ্ট হয়েছেন যে, ঢাকার দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাক বিভিন্ন শ্রেনীর নাগরিকদের মধ্যে শত্রুতা  ও ঘৃণার অনুভূতি সৃষ্টি করবে বা করতে পারে এবং জনগণকে জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ক্ষতিকর কার্মকান্ডে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করতে পারে এমন প্ররোচনামূলক মতামত, মন্তব্য, বিবৃতি ও প্রতিবেদন প্রকাশ করছে যার বিরুদ্ধে আশু ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক;

ii. গভর্ণর জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ইত্তেফাক-এর প্রকাশক ও মুদ্রাকরকে নিম্নোক্ত তফসিলে (ক) উল্লিখিত বিষয়ে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সংবাদপত্রে প্রেরিত বিষয় ছাড়া অন্য কোন বিষয় তৈরি বা প্রকাশ ৭ এপ্রিল ১৯৬৬ তারিখ থেকে তিন মাসের জন্য নিষিদ্ধ করে ৭ এপ্রিল ১৯৬৬ তারিখে আদেশ জারি করেছেন;

iii. গভর্নর এই মর্মে সন্তুষ্ট হয়েছেন যে, ঢাকার দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাক হরতাল ও পিকেটিং সম্পর্কিত খবর, মতামত, মন্তব্য, বিবৃতি ও প্রতিবেদন প্রকাশ করছে যা সরকারী কার্মচারীদের দায়িত্বপালনে হস্তক্ষেপ করতে পারে, প্রত্যক্ষ বা  পরোক্ষভাবে শিল্প-শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করতে প্ররোচিত করতে পারে, গণপরিবহন ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্থ, বিলম্বিত কিংবা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, জনগণের মধ্যে ভয় আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে এবং জননিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে;

iv. গভর্ণর ২ জুন ১৯৬৬ আরেকটি আদেশ জারি করে ইত্তেফাক-এর সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক জনাব তফাজ্জল হোসেনকে নিন্মোক্ত তফশিলে (খ) উল্লিখিত বিষয়ে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সংবাদপত্রে পাঠানো বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয় তৈরী বা ছাপানোর ওপর ২ জুন ১৯৬৬ থেকে দুই সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন;

v. গভর্ণর এই মর্মে সন্তুষ্ট হয়েছেন যে, ১৯৬৬ সালের ৭ জুনের হরতাল ও প্রতিবাদ দিবস এবং সেই ব্যাপারে গৃহীত সরকারি পদক্ষেপ সংক্রান্ত বা এর সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত খবর, মতামত, মন্তব্য, বিবৃতি, প্রতিবেদন ও আলোকচিত্র প্রকাশ জননিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে;

vi. গভর্নর ১৯৬৬ সালের ৭ জুন তারিখ আদেশ জারি করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ইত্তেফাক-এর সম্পাদক; মুদ্রাকর ও প্রকাশক জনাব তফাজ্জল হোসনেকে নিন্মোক্ত তফশিলে (গ) উল্লিখিত বিষয়ে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সংবাদপত্রে পাঠানো বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয় তৈরী বা ছাপানোর উপর ৭ জুন ১৯৬৬ থেকে দুই সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন;

vii. তফসিল (ঘ) তে উল্লিখিত বিষয়সমূহ প্রকাশনার মাধ্যমে ইত্তেফাক এর সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক উপরোক্ত নিষেধাজ্ঞামুলক আদেশ লঙ্ঘন করেছে;

viii. উপরোক্ত কারণে গভর্নর ১, রামকৃষ্ণ মিশন রোডে অবস্থিত নিউ নেশন প্রেস যা তফসিলে উল্লিখিত বিষয়সমূহে প্রকাশনার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে তা অনতিবিলম্বে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করতে সন্তুষ্ট হয়েছেন।
উপরোক্ত আদেশে নিম্নের বিষয়সমূহ তফসিল ভূক্ত ছিল:-

তফসিল-‘ক’
(ক) পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতি বিনষ্ট করে কিংবা এর সার্বভৌমত্বকে লঙ্ঘন করতে পারে বা করার আশঙ্কা রয়েছে এমন যে কোনও ধরনের মতামত, মন্তব্য, বিবৃতি ও প্রতিবেদন;
(খ) রাষ্ট্রের এক অংশ কিংবা এক শ্রেণির লাভের জন্য অন্য অংশ বা অপরাপর শ্রেনী কর্তৃক শোষণের অভিযোগ তোলে এমন মতামত, মন্তব্য, বিবৃতি ও প্রতিবেদন;
(গ) বিভিন্ন শ্রেণির মানুষদের মধ্যে শত্রুতা বা বিদ্বেষের অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে বা করার অভিপ্রায় রয়েছে এমন যে কোনও মতামত, মন্তব্য, বিবৃতি ও প্রতিবেদন;
(ঘ) ছাত্রদের হরতাল, আন্দোলন, ক্ষোভ এবং সেই ব্যাপারে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ-সংক্রান্ত কোনো মতামত, মন্তব্য, বিবৃতি ও প্রতিবেদন।

তফসিল-‘খ’
৭.৬.৬৬ তারিখে আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালন এবং সেই সংক্রান্ত বা সম্পর্কিত খবর, মতামত, মন্তব্য ও প্রতিবেদন।

তফসিল-‘গ’
১৯৬৬ সালের ৭ জুলাই তারিখে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালন এবং সেই ব্যাপারে সরকার গৃহীত পদক্ষেপ-সংক্রান্ত বা সম্পর্কিত খবর, মতামত, মন্তব্য ও প্রতিবেদন।

তফসিল-‘ঘ’
১৯৬৬ সালের ৯ জুন, ঢাকা সংখ্যার ১ ও ২ পৃষ্ঠায় ‘গুলিবর্ষণের মুলতবী প্রস্তাব অগ্রাহ্য’ শিরোনামের খবর;
১.    ৯ জুন, ঢাকা সংখ্যার ৪ পৃষ্ঠায় ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ ক্যাপশনের প্রকাশনা;
২.    ১২ জুন ১৯৬৬ তারিখের ১ ও ১০ পৃষ্ঠায় ‘৬ দফার বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচী’ শিরোনামের খবর;
৩.    ‘ছয়দফার প্রশ্নে কোনো আপোষ নাই’ শিরোনামে ১৯৬৬ সালের ১৯৬৬ তারিখের সংখ্যার খবর;
৪.    ‘সংগ্রাম চলবেই-পল্টনের বিশাল জনসমুদ্রের নেতৃবৃন্ধের ঘোষণা’ শীর্ষক ১৯৬৬ সালের ২৫ এপ্রিল সংখ্যার ১ নং পৃষ্ঠার খবর; এবং
৫.    ‘দীর্ঘসূত্রিতার ফল’ শীর্ষক ২৭.৪.৬৬ তারিখের প্রকাশনা।
উপরোক্ত আদেশ এবং তফসিলসমূহ হতে প্রতিয়মান যে, ৭ এপ্রিল ’৬৬ সরকার অপর এক আদেশ দ্বারা ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক, মুদ্রাকার ও প্রকাশক তফাজ্জল হোসেন-কে যিনি মানিক মিয়া হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত, হরতাল, আন্দোলন, জনগণের ক্ষোভ এবং সে বিষয়ে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ সংক্রান্ত কোন মতামত, মন্তব্য বিবৃতি ও প্রতিবেদন প্রকাশ না করার জন্য তিন মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। ২রা জুন ’৬৬ অপর এক আদেশে ০৭.০৬.১৯৬৬ তারিখে আওয়ামীলীগ প্রস্তাবিত ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালন এবং সেই সংক্রান্ত মতামত, মন্তব্য ও প্রতিবেদন ছাপানো ও প্রকাশের উপর দুই সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ৭ জুন ’৬৬ আরো একটি আদেশ ইত্তেফাকের সম্পাদক, মুদ্রাকার ও প্রকাশকের উপর জারী করে ১৯৬৬  সালের ৭ জুলাইয়ের পূর্বে আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত প্রতিবাদ দিবস পালন এবং সে সম্পর্কে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সংক্রান্ত খবর, মতামত ও প্রতিবেদন প্রকাশ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

নিষেধাজ্ঞা ও নিপীড়নমূলক ঐ আদেশসমূহ হতে এটা সুষ্পষ্ট যে, পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী মূলত: ছয় দফাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ছাত্র-জনতার গণআন্দোলকে দমন ও বাধাগ্রস্থ করার লক্ষ্যেই গণমাধ্যম অর্থাৎ ইত্তেফাক পত্রিকার বিরুদ্ধে উপরোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করে।

ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক, মুদ্রাকার ও প্রকাশক তফাজ্জল হোসেন উপরোক্ত আদেশসমূহ চ্যালেঞ্জ করে তৎকালীন ঢাকা হাইকোর্টে একটি রীট আবেদন দায়ের করেন প্রধানত: এই যুক্তিসমূহে যে-

i.    তর্কিত বাজেয়াপ্ত আদেশ জারী পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধিমালার ১৯৬৫ (বিধি-৫২) সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিধায় তা কার্যকরহীন ও অকার্যকর;
ii.    বাজেয়াপ্তকরণের আদেশ জারির পূর্বে কর্তৃপক্ষ দরখাস্তকারীকে কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে ‘স্বাভাবিক ন্যায় বিচারের (ন্যাচারাল জাস্টিস)’ প্রতিষ্ঠিত নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে;
iii.    সংশ্লিষ্ট আইনে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রে সুনিদিষ্ট কোন বিধি বিধান ছিল না।
চুড়ান্ত পর্যায়ে পাঁচজন মাননীয় বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে রীট পিটিশনটি শুনানী হয়। উভয় পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীদের দীর্ঘ আইনী ব্যাখ্যা-তর্কের পরে মাননীয় বিচারপতিগণ সর্বসম্মতভাবে রীট আবেদনকারীর পক্ষে উত্থাপিত আইনী যুক্তিসমূহে সারবত্তা ও ভিত্তি আছে মর্মে সন্তুষ্ট হয়ে রুলটি চুড়ান্ত করেন এবং তর্কিত বাজেয়াপ্ত করনের আদেশ বে-আইনী, অকার্যকর ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষকে তর্কিত আদেশটি বাতিল ও প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। (১৮ ডিএলআর, পৃষ্ঠা-৭৩৬)

ঢাকা হাইকোর্টের উপরোক্ত রায় ছয় দফা আন্দোলনকে যেমন করেছিল বেগবান, তেমনি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমকে করেছিল আরো সাহসী।

লেখক- বিচারপতি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ।



সাতদিনের সেরা