kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

মাদকের ভয়াবহতা এবং নির্মূল কৌশল

কর্নেল মো. এমরানুল হাসান বিপিএম (সেবা)

২৯ মে, ২০২১ ১২:৩০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



মাদকের ভয়াবহতা এবং নির্মূল কৌশল

মাদক সম্পর্কে জানেন না বিশ্বের এমন কি কেউ আছে? মাদকের ভয়াবহতা লিখে বা বলে শেষ করা যাবে না। মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদকের সর্বাত্মক আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হয়েছে। মাদকের স্বর্গরাজ্য গোল্ডেন ক্রিসেন্ট আমাদের দেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এবং আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য উৎপাদনকারী অঞ্চল মিয়ানমার, লাওস এবং থাইল্যান্ডের সমন্বয়ে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের দক্ষিণ-পূর্ব কোনে অবস্থিত। এসব দেশ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে মাদক পাচারের জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ট্রানজিট ব্যবহার করার কারণে মাদকের বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। নতুন বছরে আমরা মাদকমুক্ত একটি সমাজ প্রত্যাশা করি। আশার কথা এই যে বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও জিরো টলারেন্সের নীতি গ্রহণ করেছেন এবং সব বাহিনী মাদক নিমূর্লে একসঙ্গে কাজ করছে। 

মাদক কী?
মাদক এমন একটি দ্রব্য, যা খেলে নেশা হয়। গাঁজা, ফেনসিডিল, চরস, ভাং, গুল, জর্দা, হেরোইন, প্যাথেড্রিন, মদ, ইয়াবাসহ সবই মাদকের অন্তর্ভুক্ত। যখন কেউ এসব দ্রব্যাদির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখনই তাকে মাদকাসক্ত বলা হয়। ১৯৮৯ সালে প্রণীত বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মাদকাসক্ত বলতে, শারীরিক বা মানসিকভাবে মাদকদ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি বা অভ্যাসবশে মাদকদ্রব্য ব্যবহারকারীকে বোঝানো হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এভাবে মাদকাসক্তির সংজ্ঞা দিয়েছে— Intoxication is detrimental to the individual and the society produced by the repeated consumption of a drug (Natural and Synthetic.)

কেন এই আসক্তি?
মানুষকে মাদকাসক্তির দিকে পরিচালিত করার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা, সামাজিক অস্থিরতা, উত্তেজনা, একঘেয়েমি, একাকিত্ব এবং পারিবারিক কাঠামো পরিবর্তনের পরিবেশে ব্যর্থতার সঙ্গে লড়াই করতে অক্ষমতা। তবে মাদকাসক্তদের সংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ হলো মাদকের সহজলভ্যতা।

দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ব্যাপক উন্নয়ন এবং ইন্টারনেট ও তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার, সামাজিক সচেতনতার অভাব ইত্যাদিও মাদকের সমস্যা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। পারিবারিক কলহ, ডিভোর্সের কারণে ভেঙে যাওয়া পরিবার, প্রেম ও চাকরিতে ব্যর্থতা থেকে হতাশার কারণেও মাদকাসক্তের হার বাড়ছে। বেশির ভাগ মাদক ব্যবহারকারী ‘পিয়ার প্রেশার’ বা বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়াকে প্রধান ‘পুল ফ্যাক্টর’ হিসেবে দোষারোপ করেছেন। প্রথমবারের মতো মাদক গ্রহণের জন্য কৌতূহল অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করে।

এক নজরে বাংলাদেশে মাদকের পরিসংখ্যান
বাংলাদেশে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন মানুষ মাদকাসক্ত। দেশের বেকার জনসংখ্যারও বেশ বড় অংশ মাদকাসক্ত। মোট মাদকাসক্তদের ৪৮ শতাংশ শিক্ষিত এবং ৪০ শতাংশ অশিক্ষিত। মাদকাসক্তদের প্রায় ৫৭ শতাংশ যৌন অপরাধী, যাদের ৭ শতাংশ হলো এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত। সারা দেশে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার মাদক ব্যবসায়ী তাঁদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন, যাঁদের মধ্যে ২৭ হাজার ৩০০ জন মহিলা।

২০১৯ সালে গড়ে প্রতিদিন ১১৪ জন রোগী সরকারি ও বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০৪ এবং ২০১৭ সালে ৬৯। এটাও অবাক করার মতো বিষয় যে ২০১৯ সালে মহিলা মাদকসেবীদের সংখ্যা চার গুণ বেড়েছে। ২০১৮ সালে ৯১ জন মহিলা সরকারি সুযোগ-সুবিধায় চিকিত্সা পেয়েছিলেন। এই সংখ্যা বেড়ে ২০১৯ সালে ৩৬০ হয়েছে। (১৩ জানুয়ারি, ২০২০-এ দ্য 
ফিন্যানশিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত)। 

মাদক ব্যবহারকারীরা একাধিক উৎস থেকে মাদক সংগ্রহ করে। তাদের বেশির ভাগকেই বন্ধুবান্ধব-সহপাঠী মাদক সরবরাহ করে। কেউ কেউ মাদক ব্যবসায়ী-চোরাচালানকারীদেরই উত্স হিসেবে ব্যবহার করে। অল্পসংখ্যক পথশিশু-টোকাইয়ের মাধ্যমে মাদক সংগ্রহ করে এবং অনেকে ডমেস্টিক হেল্পের (সার্ভেন্ট, সিকিউরিটি গার্ড ইত্যাদি) মাধ্যমে ও মাদক পেয়ে থাকে। 

মাদকের ভয়াবহতা
মাদকের হাতছানি সারা দেশে। শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। তার বিষাক্ত ছোবল শেষ করে দিচ্ছে তারুণ্যের শক্তি ও সম্ভাবনা। সর্বনাশা মাদক ধ্বংস করে একটি মানুষের শরীর, মন, জ্ঞানবিবেক ও তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তার পরিবারের সব স্বপ্নকে এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যেক। শুধু পরিবারকে নয়, মাদকের কালো থাবা ধ্বংস করে একটি সমাজকে, একটি জাতিকে এবং পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এটি বৃহত্ আকার ধারণ করে একটি ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। তরুণ তাজা প্রাণের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ায় পিছিয়ে পড়ছে সমাজ। বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন পথে, মাদক ঢুকে পড়ছে আমাদের সমাজে। আর ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের অবক্ষয়, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির অসামঞ্জস্যতা, হতাশা এবং মূল্যবোধের অভাবের সুযোগ নিয়ে মাদক তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তরুণসমাজের প্রতি। 

মাদকে তরুণসমাজ ধ্বংস
বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ অন্যান্য সূত্রে আমরা প্রতিনিয়ত খবর পেয়ে থাকি, রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী ও বারিধারায় সর্বনাশা ইয়াবা সেবনের ফলে ধনী শ্রেণির দুলাল-দুলালিরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। গুলশান, বনানী, বারিধারায় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সর্বনাশা ইয়াবা সেবনের ফলে তাঁদের সন্তানরা পৌঁছে যাচ্ছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শুধু গুলশান, বনানী নয়, মিরপুর. টোলারবাগ, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদসহ বেশ কিছু এলাকায় দেখা যাচ্ছে মাদকের করাল গ্রাস। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত ২৪ ধরনের মাদক উদ্ধার করেছে। আর এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে—ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ ও বিদেশি মদ, প্যাথেড্রিন, ডিনেচার্ড স্পিরিট, ভাং, বিয়ার, তাড়ি, বুপ্রেনরফিন (টিডি জেসিক ইঞ্জেকশন), কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বায়োজেসিক ইঞ্জেকশন), মরফিন, আইস পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাসিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন। 

মাদকদ্রব্য সেবনের ক্ষতিকর দিক 
একবার আসক্ত হয়ে পড়লে তাকে মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এ ব্যাপারে পরিবারকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। একটি পরিবারে বা সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিই যথেষ্ট। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি শারীরিক, মানসিক, আর্থিক, পারিবারিকসহ নানা ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। শারীরিক প্রভাবের মধ্যে রয়েছে—মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া, হঠাৎ চোখে কম দেখা, মুখ ও নাক লাল হওয়া, যৌনশক্তি কমে যাওয়া, মুখমণ্ডলসহ সারা শরীরে কালশিরে পড়া, হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া, বুক ও ফুসফুস নষ্ট হওয়া, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, চর্ম ও যৌন রোগ বৃদ্ধি পাওয়া, সংক্রামক রোগ বৃদ্ধি, স্মৃতিশক্তির কোষ ধ্বংস করা। মাদক গ্রহণে শারীরিকভাবে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেমন—অনিয়মিত মাসিক, জরায়ুর বিভিন্ন প্রকার রোগ, নারীর প্রজননক্ষমতা হ্রাস পাওয়াসহ বিভিন্ন যৌনরোগ দেখা দেয়। সম্প্রতি মাদকাসক্তদের মধ্যে এইডস দেখা দিচ্ছে বলে মনে করেন চিকিসৎকরা। মানসিক ক্ষতির একটা বড় রূপ রয়েছে, যা সব সময় বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয় যেমন—পাগলামি করা, মাথা ঘোরা ও খিটখিটে মেজাজ, অলসতা ও উদ্বেগ, হতাশাগ্রস্ত হওয়া, স্নেহ-ভালোবাসা কমে যাওয়া ইত্যাদি।

মাদকাসক্তির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে। কারণ যে পরিবারে মাদকাসক্ত ব্যক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, সে পরিবারে কোনো সুখ-শান্তি থাকে না। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের অলংকার ও টাকা-পয়সা চুরি করে আর সেটা না পারলে আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে জোর করে অস্ত্র দেখিয়ে অর্থ নিয়ে তার চাহিদা মেটায়। সমাজে চলে চরম বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক। বর্তমানে দেশের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেও এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার ও সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে।

মাদকের নিত্যনতুন ট্রেন্ড বা ধারা
পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে সীমান্ত পথে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক দেশে ঢুকছে অভিনব পদ্ধতিতে। পেঁয়াজের ভেতরে ইয়াবার চালান আনা হচ্ছে কুমিল্লা থেকে। দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তে মৌসুমি ফল বহনকারী পরিবহন ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য চোরাচালানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

নতুন এক উদ্বেগের বিষয় হলো, মাদকের অপব্যবহার ও চোরাচালানের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ ব্যবহার হচ্ছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সন্ত্রাসের প্রসারে। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার সীমান্তে ছোট-বড় কারখানা গড়ে উঠেছে। ফান্ড সংগ্রহে এখন জঙ্গিরা মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, ডাকাতি ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়ছে। 

বর্তমানে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। প্রেসক্রিপশন ড্রাগ একটি ফার্মাসিউটিক্যাল ড্রাগ, যা আইনিভাবে একটি মেডিক্যাল প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে বিতরণ করার নিয়ম। প্রেসক্রিপশন ড্রাগগুলো মদ্যপান এবং গাঁজার পরে (কোকেইন, হেরোইন এবং মেথামফেটামিনের আগে) তৃতীয় সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত মাদক। এই ওষুধের অপব্যবহার করে সহজেই যে কেউ আসক্ত হয়ে উঠতে পারে। অনেকেই আরেকজনের প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করে বা নির্ধারিত ডোজের বেশি গ্রহণ করে এতে আসক্ত হয়ে পড়ে। 

মাদকের বিস্তারে নারী ও শিশুদের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা ইয়াবার আমদানি, সরবরাহ ও বেচাকেনার জন্য নিরাপদ হিসেবে নারী ও শিশুদের বেছে নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষরা ব্যর্থ হওয়ায় তাদের পরিবারের ভাড়া করা নারী ও শিশুদের নামাচ্ছে এ ব্যবসায়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের নারী ও শিশুরা অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জন্য জড়াচ্ছে মাদক ব্যবসায়। বর্তমানে দেশে ইয়াবার প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় নারী মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে নারীরা একসঙ্গে অনেক ইয়াবা তাদের দেহের বিভিন্ন স্পর্শকাতর অংশে সহজেই বহন করতে পারে। কিছুদিন ধরে নারীরা ইয়াবার বিশেষ ধরনের থলে পেটের মধ্যে বহন করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। শিশুদের স্কুলব্যাগে করেও পাচার করা হচ্ছে মরণনেশা ইয়াবার চালান। 

মাদক নির্মূল কৌশল ও সফলতা 
মাদক নির্মূলে সাধারণত তিনটি পদ্ধতিতে মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়—চাহিদা হ্রাস, সরবরাহ হ্রাস ও ক্ষতি হ্রাস। চাহিদা হ্রাস কৌশলের অংশ হিসেবে মাদকবিরোধী ডিজিটাল প্রচারের নতুন সংযোজন এলইডি কিওস্ক ডিসপ্লে ডিভাইস, যা প্রতিটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তিনটি করে স্থাপন করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্যবিরোধী সরকারি বা বেসরকারি যাবতীয় কাজের সমন্বয় সাধন, তত্ত্বাবধান, পরামর্শ প্রদান ও মাদকবিরোধী জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য জাতীয় জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রচার কমিটির রয়েছে। সব কমিটির কার্যক্রম জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড পবীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন করে থাকে। জাতীয় মাদকবিরোধী কমিটির জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জেলা পর্যায়ে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ প্রচারণা কমিটি রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে উপজেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম পর্যালোচনা সমন্বয় সাধনের জন্য প্রতি তিন মাস পর পর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রধান কার্যালয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সরবরাহ হ্রাসের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফে ইয়াবা পাচারবিরোধী টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের স্থায়ী স্বয়ংসম্পূর্ণ কার্যালয় চালু হয়েছে। এ অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিশ্বমানের ইন্টারোগেশন ইউনিট স্থাপন, ক্রিমিনাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুকরণ, উন্নত গোয়েন্দা যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং মোবাইল ট্র্যাকার স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে এ পর্যন্ত মহাপরিচালক পর্যায়ে ছয়টি ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি ইয়াবা পাচার রোধকল্পে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে এ পর্যন্ত তিনটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষমতার বৃদ্ধি আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের ফলে মাদক চোরাচালান ও মাদকের অপব্যবহার তথ্য আদান-প্রদান করা উল্লেখযোগ্য। 

ক্ষতি হ্রাসের অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি জেলায় পর্যায়ক্রমে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র নির্মাণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মাদকাসক্তদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারিভাবে দেশের চারটি নিরাময়কেন্দ্র আছে। এ ছাড়া ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত বেসরকারি পর্যায়ে ৩০৪টি মাদকাসক্তি চিকিত্সা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, যাতে তিন হাজার ৭৯০টি বেড রয়েছে।
 
টেকসই মাদক নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আন্তর্জাতিক ড্রাগ কনভেনশনগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকারসহ জাতিসংঘের কার্যপরিকল্পনা অনুসারে অভ্যন্তরীণ মাদক পলিসি প্রবর্তন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক দেশ ও সংস্থার সঙ্গে বেশি বেশি আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ ফলপ্রসূ হতে পারে। দেশের সীমান্তসহ মাদক প্রবেশের যত রুট রয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের উদ্যোগে ভারত-মিয়ানমার-বাংলাদেশকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ আঞ্চলিক কাঠামো করা মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নতুন করে যেন কোনো শিশু-কিশোর কিংবা উদ্বেলিত তরুণ-তরুণী মাদকের জালে জড়াতে না পারে, তারা যেন কৌতূহল কিংবা এক্সপেরিমেন্টেশন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে এবং বন্ধুবান্ধব নির্বাচনে যেন সজাগ থাকে, এ জন্য মাদকের পরিণতি সম্পর্কে আগেই খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। এ ছাড়া খেলাধুলাসহ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সৃজনশীল বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে। ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এখন থেকেই সব অভিভাবক তথা আমাদের সবাইকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। 

লেখক : সাবেক র‍্যাব কর্মকর্তা



সাতদিনের সেরা