kalerkantho

শনিবার । ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১২ জুন ২০২১। ৩০ শাওয়াল ১৪৪২

সালমা এখন উদাহরণ

তিনি দেশের একমাত্র বেসরকারি প্রাণী চিকিৎসা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের চেয়ারম্যান। বিজ্ঞান গবেষণায় অবদানের জন্য এশিয়ার শত বিজ্ঞানীর তালিকায় যে তিনজন বাংলাদেশি নারী জায়গা করে নিয়েছেন, সালমা সুলতানা তাঁদের একজন। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী এশিয়ান সায়েন্টিস্টের করা এই তালিকায় তাঁর অবস্থান অষ্টম। লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

অনলাইন ডেস্ক   

২৫ মে, ২০২১ ১৬:১১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সালমা এখন উদাহরণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন; কিন্তু মায়ের ইচ্ছা মেয়ে ডাক্তার হবে। হোক না সেটা পশুর ডাক্তার, ক্ষতি কী! ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া হয়নি। ভর্তি হয়েছিলেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশে পশুপাখির চিকিৎসকদের ‘খুব একটা সম্মানের চোখে দেখা হয় না’ বলে ক্যাম্পাসের শুরুর দিনগুলোতে হতাশা কাজ করছিল সালমার মনে। কিন্তু একটা ঘটনা তাঁর চিন্তা-ভাবনা বদলে দেয়। তখন তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। হঠাৎ একদিন তাঁর পোষা খরগোশটি ভীষণ অসুস্থ হয়ে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে স্থানীয় পশু হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ডাক্তার রোগ ধরতে পারেননি। শেষমেশ মারা যায় আদরের খরগোশটি! এই ঘটনা সালমাকে ভীষণ নাড়া দেয়। ঠিক করলেন, লোকে যা বলে বলুক, পশু চিকিৎসকই হবেন। ওদের নিয়ে গবেষণা করবেন।

 

পাস করলেন

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিভিএম (ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন) সনদ লাভ করেন ২০১২ সালে। একই প্রতিষ্ঠান থেকে ফার্মাকোলজিতে মাস্টার্স করেন ২০১৪ সালে। মাস্টার্সে পড়ার সময়ই তিনি ঔষধিগাছের অ্যান্টি-মাইক্রোবায়াল অ্যাক্টিভিটি এবং তাদের পরজীবী দমনের কার্যক্ষমতার ওপর গবেষণা শুরু করেন। পরে ক্লিনিক্যাল ট্রেনিংয়ে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করেন তামিলনাড়ুর ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

 

শুরুটা ভেটেরিনারি অফিসার হিসেবে

স্নাতক শেষে চাকরি খুঁজছিলেন। একদিন পত্রিকায় দেখলেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কমিউনিটি বেইজড ডেইরি ভেটেরিনারি ফাউন্ডেশন লোক নেবে। আবেদন করলেন। চাকরিটাও হয়ে গেল। ভেটেরিনারি অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করলেন চট্টগ্রামের পটিয়ায়। ওই কাজ করতে করতেই দেখলেন, মাঠ পর্যায়ে পশু চিকিৎসকের সংকট এবং গবাদি পশু নিয়ে খামারিদের অসহায়ত্ব। ঠিক করলেন পশু চিকিৎসার জন্য ব্যক্তি উদ্যোগেই একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট খুলবেন। সালমা বললেন, ‘পশু চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরুর পর গ্রাম ও উপশহর পর্যায়ে পশু স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ফাঁক খুঁজে পাই। গবাদি পশুর ওপর অনেকটা নির্ভরশীল গরিব কৃষকরা হাতুড়ে ডাক্তারদের কাছে নিজেদের পশু নিয়ে যান। কিন্তু সঠিক সেবা পান না। কোথাও পশু চিকিৎসক থাকলেও তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত সহকারী বা ভেটেরিনারি নার্স নেই। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখি কেউ নেই, যিনি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন। আমাদের ল্যাবরেটরির ক্ষেত্রেও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। হতাশ না হয়ে ভাবলাম, এখানে কাজের একটা বড় সুযোগ আছে।’

 

দেশে এই প্রথম

২০১৫ সাল। ডেমরা এলাকায় গবাদি পশুর অনেক খামার থাকায় ওই এলাকায়ই ইনস্টিটিউট খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমুলিয়া মডেল টাউনে গড়ে তোলেন ‘মডেল লাইভস্টক ইনস্টিটিউট’। ব্যাংকার বাবার জমানো টাকা এবং বন্ধুদের কাছ থেকে ধারের টাকায় শুরু হলো সালমার স্বপ্নযাত্রা। এর আগে দেশে গবাদি পশু সম্পর্কিত কোনো কর্মমুখী শিক্ষাকেন্দ্র ছিল না বলে জানালেন সালমা। তাঁর দাবি, তিনিই প্রথম এর উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা। এক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডেরও অনুমোদন পেল সালমার ইনস্টিটিউট। এখানে পশু স্বাস্থ্য পরিচর্যা, পশু পালন, উৎপাদন ও পোল্ট্রি ফার্মিং ইত্যাদি বিষয়ে বেকার যুবক, কৃষি উদ্যোক্তা ও খামারিদের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করলেন সালমা। মাঠ পর্যায়ে পশু চিকিৎসায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে এই ইনস্টিটিউটে চালু করলেন ১৪ মাস মেয়াদি ‘এনিম্যাল হেলথ অ্যান্ড প্রডাকশন’ ও ‘পোলট্রি ফার্মিং’ কোর্স। এখন ডেইরি ফার্ম ব্যবস্থাপনা, পশু পরিচর্যা, হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা, কৃত্রিম প্রজনন ইত্যাদি বিষয়ে সংক্ষিপ্ত কোর্স রয়েছে। আছে ল্যাবরেটরিসহ একটি পশু চিকিৎসা হাসপাতাল। তিনজন চিকিৎসক পালা করে সেবা দেন।

 

অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন

সালমার ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে পাঁচ শতাধিক তরুণ উদ্যোক্তা গড়ে তুলেছেন গবাদি পশু বা হাঁস-মুরগির খামার। শতাধিক সেবাকর্মী সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। ইনস্টিটিউটের কার্যক্রমে ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় সমমনা কয়েকজন তরুণকে নিয়ে ২০১৬ সালে গড়ে তোলেন দ্য মডেল লাইভস্টক অ্যাডভান্সড ফাউন্ডেশন (এমএলএএফ)। এর সদস্যরা নিয়মিত বিভিন্ন খামার পরিদর্শন করেন এবং খামারিদের পরামর্শ দেন। সালমা বলেন, ‘আমরা যতটা সম্ভব বিনা মূল্যে সেবা দিই। শুরুতে অর্থসংকটে পড়েছিলাম। তাই এখন এটিকে এনজিওতে রূপ দিয়েছি। সঠিক গবেষণা ছাড়া ওষুধ প্রয়োগ করা হলে অবলা প্রাণীর ক্ষতি হতে পারে, তাই বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে চিকিৎসা নিরূপণের জন্য আমরা গবেষণাগারটি যুক্ত করেছি।’ তিনি আরো যোগ করলেন, ‘স্বপ্নকে সত্যি করতে দিন-রাত খেটেছি। কখনোই মাঝপথে আটকে থাকতে চাইনি, নিজেকে শুধু বলেছি, হাল ছেড়ো না।’

বেসিক ভেটেরিনারি অ্যানাটমি অ্যান্ড সাইকোলজি, ইজি লার্নিং অব ভেটেরিনারি প্যাথলজি, বেসিক কনসেপ্ট অব ফার্মাকোলজি, রুরাল লাইভস্টক এন্টারপ্রেনারশিপ ইত্যাদি শিরোনামে সাতটি বইও লিখেছেন সালমা।

 

ধীরে ধীরে সচেতনতা বাড়ছে

পর্যাপ্ত জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাবে খামারিরা গবাদি পশু ঠিকমতো প্রতিপালন করতে পারছেন না। এর ফলে তাঁরা যেমন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করেন সালমা। তিনি বলেন, ‘একটা গোয়ালঘরের ছাদ যে ১৪ থেকে ১৮ ফুট উঁচু হতে হবে সেটাও অনেকে জানে না। অনেকে আগে ভুসির সঙ্গে পানি মিশিয়ে গরুকে খাওয়াত। ভাত কিংবা জাউ রান্না করে খাওয়াত। কিন্তু এসব গরুর পেটের জন্য ক্ষতিকর। এ দেশে অনেক অসুস্থ গরু জবাই হয়। গরুটিকে হয়তো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এই অবস্থায় জবাইও করা হচ্ছে। ফলে ওষুধের উপাদানগুলো তার দেহে থেকে যাচ্ছে। সেই মাংসটা আমরা খাচ্ছি। এতে আমাদেরও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে গত কয়েক বছরে আমাদের কাজের ফলে কৃষকদের মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে।’

 

আগেও স্বীকৃতি মিলেছে

এশিয়ার শত বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পাওয়ার আগেও স্বীকৃতি পেয়েছিলেন সালমা। ২০১৭ সালে পেয়েছেন জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড। ২০২০ সালে পেয়েছেন ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ ফাউন্ডেশনের সম্মাননা। সেইবার ‘নরম্যান বোরলগ অ্যাওয়ার্ড ফর ফিল্ড রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশন’-এর বিজয়ী ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ থেকে এর আগে ১৯৯৪ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ২০১৫ সালে স্যার ফজলে হাসান আবেদ এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। সে সময় ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট বারবারা স্টিনসন বলেন, ‘পুরুষপ্রধান কর্মক্ষেত্রে বহু বাধা পেরিয়ে এগোতে হয়েছে সালমাকে। কঠোর অধ্যবসায় আর উদ্ভাবনী ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি নিজের দেশের খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’

 

তিনি চান

বাংলাদেশের সব জেলায় সেবা ছড়িয়ে দিতে চান সালমা। একটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পশু হাসপাতাল গড়ে তোলারও ইচ্ছা আছে তাঁর।



সাতদিনের সেরা