kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

‘মায়াবী অগ্র-নায়ক’ নজরুল

সৌমিত্র শেখর   

২৫ মে, ২০২১ ১৩:০৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘মায়াবী অগ্র-নায়ক’ নজরুল

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন হয়ে গেল। জাতীয় কংগ্রেস দল ও ফুরফুরা শরিফের ভাইজান বলে পরিচিত আবাস সিদ্দিকীর ধর্মীয় দলের সঙ্গে জোট করেও পশ্চিমবঙ্গের তামাম বামপন্থীরা একটি আসনও জিততে পারেনি। তাদের শতকরা ৮০ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এর আগে ত্রিপুরা রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে বামপন্থীরা। বাংলাদেশেও সংসদীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে কমিউনিস্টরা কার্যত উঠে গেছে। নির্বাচনে তারা জয়ী হতে পারে না। সাম্য আর সম্প্রীতির বৃহৎ বাংলায় কেন এমন হলো?

আমার একজন সহকর্মী, যিনি তরুণ বয়সে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রবীণ নেতাদের পুঁচকে চাঁই ছিলেন, তাঁর কাছে শুনেছি : পার্টির একজন প্রবীণ নেতা নাকি তাঁকে বলেছেন, দাড়ি শেভ করার জন্য গালে সাবান (তখন ফোম ব্যবহারের চল আসেনি) লাগানোটা অপচয় আর শৌখিনতা, তাই পরিত্যাজ্য। যাঁরা ধূম্রপান করতেন, সামর্থ্য থাকার পরও পাতার বিড়ি তাঁরা টেনেছেন। পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনী প্রচারের ভিডিওতে দেখা গেল, উচ্চশিক্ষিত তরুণ কমিউনিস্ট প্রার্থীরা প্রচারের শ্রমসাধ্য দিনে যখন একটু স্বাস্থ্যকর খাবার শরীরের চাহিদা, তখন দুপুরে মুড়ি আর তেলেভাজা প্রকাশ্যে চিবোচ্ছেন তাঁরা। এটি কি কৃচ্ছ্রসাধন, নাকি নিজেকেই বঞ্চনা? ত্রিপুরায় বহু বছর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কমিউনিস্ট মানিক সরকার। ক্ষমতা হারানোর পর গিয়ে উঠলেন পার্টি অফিসে। কারণ তাঁর নিজের কোনো বাড়ি নেই। যিনি নিজে একটি রাজ্য চালান তাঁর অন্তত ছয় শ স্কয়ার ফিটের একটি বাড়ি থাকবে না? যদি না থাকে, তাহলে পার্টির অন্য কর্মীরা তাঁর পথ অনুসরণ করলে পার্টি অফিসে তো জায়গা হবে না! তাই প্রশ্ন উঠতে পারে : মানুষের সম্পদ ও চাহিদার আধিক্য অপরাধ বলে গণ্য হলে এসবের অতি ন্যূনতাও অপরাধ কি না! অগাধ অর্থ, অধিক বাড়ি-গাড়ি সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করলে জীবনে এসব ক্ষেত্রে চরম কৃচ্ছ্রসাধনও একই কর্মের অনুঘটক বলে গণ্য হবে কি? আমার এক ছাত্র দশক দেড়েক আগে আমাকে প্রশ্ন করেছিল : ব্যক্তিজীবনে নিজেরাই যদি নিজেদের বঞ্চিত করলেন, নিজেরাই যদি জীবন-উদযাপনে অপারগ হলেন, তাহলে তারা অন্যকে উন্নত জীবনের পথ দেখাবেন কী করে? এই প্রশ্নটি বোধ হয় এখন বাঙালিসমাজে ভেতরে ভেতরে সবার মনে। আর তাই বামপন্থীদের ওপর মানুষের আস্থা হ্রাস পেয়েছে। তবে এ প্রশ্নের উত্তর বোধ হয় খানিকটা পাওয়া যায় কাজী নজরুল ইসলামের চিন্তার মধ্যে।

কাজী নজরুল ইসলাম এক দিন কলকাতা নিউ মার্কেটের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ে একজনের ওপর। ধর্মীয় পইতা বুকে ধারণ করা লোকটি এক হাতে এক গোছা রজনীগন্ধা ফুল আর এক হাতে দুটি মুরগি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। নজরুল গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে। বললেন, এটাই ঠিক। তাঁর ভাষায় : ‘ফেয়ার আর ফাউলের এমন কম্বিনেশন—সংগতি আর দেখি নাই।’ লোকটিও নজরুলকে জড়িয়ে ধরে বললেন : ‘নিত্য আপনার হাতে ফুল, পাতে মুরগি পড়ুক।’ জীবনেও ফুল ও মুরগি অর্থাৎ ফেয়ার আর ফাউলের সমন্বয় চেয়েছেন নজরুল। তাই বলা চলে, দাড়ি শেভের সময় একটু সাবান বা ফোম ব্যবহার করা, নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে মুড়ি-তেলেভাজার বদলে এক প্লেট মাছভাত খাওয়া, ধূম্রপান করলে পাতার বিড়ি না টেনে ফিল্টারযুক্ত সিগারেট গ্রহণ, মুখ্যমন্ত্রী (সামর্থ্য) থাকার পর সারা জীবনে মাথা গোঁজার জন্য দুই কামরার একটি ফ্ল্যাট কেনা নজরুলের আগ্রহের এই ‘ফুল ও মুরগিতত্ত্ব’ অনুমোদিত; ফেয়ার আর ফাউলের কম্বিনেশন। অর্থাৎ ভালো থাকতেও হবে, সুন্দরের জন্য স্বপ্নও দেখতে হবে, তাহলেই অন্যকে আকর্ষণ করা যাবে। নজরুলের কথা স্পষ্ট : ‘যে স্বধর্মে পূর্ণপ্রতিষ্ঠিত হয়নি, তার কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের কোনো অধিকার নাই।’ তাহলে এই ‘স্বধর্মে পূর্ণপ্রতিষ্ঠিত’ না হওয়া নেতাকর্মীদের জন্যই কি বাঙালিসমাজে আজ বামপন্থার মরণবীণ শোনা যায়?

নজরুল ইসলাম আত্মমুক্তির জন্য ‘ত্যাগ ও ভোগ’ এ দুইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাই বলেছেন। শুধু ত্যাগেই মুক্তি—এই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তিনি বলেন, যিনি ভোগের স্বাদ পেলেন না, তাঁর কাছে ত্যাগের সাধ জাগবে কী করে? সাধারণ মানুষের মনে ভালো খাবার, ভালো পরবার, ভালো থাকবার আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে হবে। আর এটি করবেন নিজের জীবনে ভালো থাকা সংযমী ও মায়াবী অগ্র-নায়করা। এই অগ্র-নায়ক মানুষের মনকে জাগাবেন আর সে মনকে সংযত রাখার মতো শক্তিধর হবেন। নজরুল ‘মায়াবী অগ্র-নায়ক’দের জন্য আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে জনগণের ধর্ম পালন সম্পর্কেও মত প্রকাশ করেন। বিভিন্ন রচনা ও বক্তব্যে নজরুল ধর্মের অপব্যবহার সম্পর্কে নানা সময় বলেছেন। কিন্তু ‘ফেয়ার ও ফাউলের কম্বিনেশন’ প্রসঙ্গে নজরুল বলেন, সাধারণ মানুষকে ধর্মের আশ্রয়চ্যুত করার অধিকার কারো নেই। তিনি একেবারে ‘ধর্মের আশ্রয়’ শব্দ দুটি ব্যবহার করেছেন। বামপন্থীদের মধ্যে মানুষের ধর্ম পালনের পরিধি নিয়ে বিতর্ক আছে। তাই মানুষের ধর্ম পালন নিয়ে নজরুলের চিন্তাটুকু বামপন্থীদের জানা দরকার। নজরুল বলেছেন : ‘জনগণকে তাই বলে ধর্মের আশ্রয়চ্যুত করবার অধিকার কারোর নেই। এ অধিকারচ্যুত করতে চাইবেন যিনি, তিনি মানবের নিত্য কল্যাণের, শান্তির শত্রু। মানুষের অন্ন-বস্ত্রের দুঃখ রাজসিক শক্তি দিতে পারে না। মানুষ পেট ভরে খেয়ে, গা-ভরা বস্ত্র পেয়ে সন্তুষ্ট হয় না; সে চায় প্রেম, আনন্দ, গান, ফুলের গন্ধ, চাঁদের জ্যোত্স্না।’ তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, ধর্ম ও কর্মের যোগসূত্র স্থাপন। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন : ‘ধর্ম ও কর্মের যোগসূত্রে যদি মানুষ না বাঁধা পড়ে, তাহলে মানুষকে এমনি চিরদিন কাঁদতে হবে।’ তাই মানবজীবনকে ধর্মের আশ্রয়ে থাকার সুযোগটুকুও দিতে হবে, তাকে কর্মের পথেও এগিয়ে নিতে হবে। ধর্মই অনিষ্টের মূল, প্রগতিশীলতার এমন আপ্তবাক্য যে মানব-অভিজ্ঞতার আলোকে আজ প্রশ্নের মুখে পতিত—বাংলাদেশ, ত্রিপুরা আর হালের পশ্চিমবঙ্গ তার বড় প্রমাণ। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের পথ বোধ হয় সমাজে নজরুল কথিত ‘ধর্ম ও কর্মের যোগসূত্র’ স্থাপন অথবা একটু লঘু করে বললে, বাঙালিজীবনে ‘ফুল ও মুরগিতত্ত্বে’র রূপায়ণ।

 লেখক : পরিচালক, নজরুল গবেষণা কেন্দ্র

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা