kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১০ আষাঢ় ১৪২৮। ২৪ জুন ২০২১। ১২ জিলকদ ১৪৪২

মায়ের কোলে ছিল বলে

টানা ১১ দিনের লড়াই শেষে গত শুক্রবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল ও হামাস। কিন্তু ঝরে গেছে প্রায় আড়াই শ প্রাণ। বেশির ভাগই ফিলিস্তিনি। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যাই ৬৫। ঈদের দ্বিতীয় দিন এক হামলায়ই মারা যায় দুই পরিবারের আট শিশু। তারা একসঙ্গে হয়েছিল ঈদ উদযাপন করতে। সে ঘটনার পূর্বাপর জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

অনলাইন ডেস্ক   

২৫ মে, ২০২১ ১০:৪০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মায়ের কোলে ছিল বলে

গাজা, ফিলিস্তিন। একটি হাসপাতালের ভেতরের দৃশ্য। ছোট্ট বিছানায় শুয়ে আছে পাঁচ মাসের একটি শিশু। শিয়রে দাঁড়িয়ে বাবা। চোখে অশ্রু। ডাক্তারের বারণ আছে। তাই শিশুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারছেন না। বাবার নাম মোহাম্মদ আল হাদিদি। তাঁর সামনে শুয়ে থাকা শিশুটি তার পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য। ওমর।

মধ্যপ্রাচ্যে ঈদ পালিত হয়েছে ১৩ মে। সেদিনও পুরো পরিবার নিয়ে হাসি-আনন্দে কাটিয়েছিলেন মোহাম্মদ আল হাদিদি। পরিবার বলতে তিনি, তাঁর স্ত্রী মাহা আল হাদিদি আর পাঁচ সন্তান—১৩ বছরের সুহায়েব, ১১ বছরের ইয়াহিয়া, আট বছরের আবদুর রহমান, ছয় বছরের ওসামা আর পাঁচ মাসের ওমর। তারা থাকে গাজার উত্তর অংশে। আলশাতি শরণার্থী শিবিরে। সেটি ফিলিস্তিনের তৃতীয় বৃহত্তম শরণার্থী শিবির। ৫০০ একরেরও বেশি জায়গাজুড়ে এটি। থাকে প্রায় লাখখানেক মানুষ।

ঈদের পরদিন সবাইকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ আল হাদিদি। স্ত্রীর ভাই ইউসুফ আবু হাত্তাবের বাসায়। ওই ক্যাম্পেই। তিনতলা বাড়ি। সেখানে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকেন ইউসুফ। স্ত্রী ইয়াসমিন হাসান ও তিন সন্তান—পাঁচ বছরের ইয়ামেন, ১০ বছরের বিল্লাল আর ১১ বছরের ইউসুফ। ‘আসলে বাচ্চাদের জন্যই যাওয়া। ওরা সবাই একসঙ্গে হলে কী যে আনন্দ করে! আমার বাচ্চারা সবাই ঈদের নতুন জামা পরে গিয়েছিল। সঙ্গে নিয়েছিল প্রিয় খেলনাগুলো। সবাই মিলে খেলবে বলে।’ বলেন মোহাম্মদ আল হাদিদি।

শিশুরা খেলেছিল মন ভরেই। তারপর সন্ধ্যার সময় বাবার কাছে বায়না ধরেছিল থেকে যাওয়ার জন্য। “ওদের নিষ্পাপ মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে ‘না’ করতে পারিনি। ওদের সেখানে রেখে একাই বাসায় ফিরে আসি। ভেবেছিলাম, সবাই একসঙ্গে দারুণ একটি রাত কাটাচ্ছে! এই ভেবে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েও গিয়েছিলাম।’’ বলেন মোহাম্মদ আল হাদিদি। অকস্মাৎ তাঁর ঘুম ভাঙে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে। কাছেই কোথাও হচ্ছে বোমাবর্ষণ। এক প্রতিবেশী এসে তাঁকে খবরটি দেন। পরে জানলেন, মিসাইল আঘাত করেছে তাঁর স্ত্রীর ভাইয়ের বাসায়। অন্তত তিনটি এফ১৬ মিসাইল।

আক্রমণটি হয় রাত ২টার দিকে। কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই। মোহাম্মদের ভাই আহমেদ আল হাদিদির বাসা সেখান থেকে একেবারেই কাছে। তখনো তিনি জেগে ছিলেন। খবর দেখছিলেন ইসরায়েলি হামলার। আর তাঁর ছেলে আলী ঘুমাচ্ছিল। এর মধ্যেই বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। কাঁপুনিটা তিনি রীতিমতো অনুভব করেন। জানালার কাচ ভেঙে যায়। জিনিসপত্র মেঝেতে পরে যায়। আলীকে নিয়ে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন। দেখেন ইউসুফের বাড়িটি স্রেফ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘ওরা সবাই যে ওই বাড়িতেই ছিল, তা আমি জানতাম। এত অসহায় লাগছিল নিজেকে! বোধ-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিলাম কিছুক্ষণের জন্য। সংবিৎ ফিরে এলে দেখি, আমার হাত ধরে আলী চিৎকার করে কাঁদছে। বিস্ফোরণে সে-ও আহত হয়েছে। রক্ত ঝরছে। আমার অবস্থা দেখে প্রতিবেশীরাই সাহায্যে এগিয়ে আসেন।’ বলেন আহমেদ।

এর মধ্যেই খবর পেয়ে চলে আসেন মোহাম্মদ আল হাদিদি। দেখেন চারদিকে বাড়ির ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। কাজ শুরু করে দিয়েছে উদ্ধারকর্মীরা। এক এক করে বের করে আনছে মৃতদেহগুলো। তাঁর স্ত্রীর। সন্তানদের। স্ত্রী-সন্তানসহ ইউসুফের। মোহাম্মদকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। লাশ শনাক্ত করতে। এক এক করে সবার ক্ষতবিক্ষত লাশ শনাক্ত করছিলেন। তখনই জানতে পারেন ওমর বেঁচে আছে। মিসাইলের ধ্বংসযজ্ঞ তাকে মারতে পারেনি। মায়ের কোলের নিরাপদ আশ্রয়ে ছিল বলেই বোধ হয়।

হাসপাতালে এনে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় ওমরকে। তার পরই ছেলের দেখা পান। ছোট্ট হাতে ক্যানুলা। স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। ডান পায়ে প্লাস্টার। কাঁদছে হাত-পা ছুড়ে। বাবাকে পেয়ে ছোট্ট আঙুলগুলো দিয়ে আঁকড়ে ধরে তার হাত। অশ্রুসজল চোখে ওর গালে আলতো করে চুমু খান মোহাম্মদ। ডাক্তারের বারণ, বেশি নাড়াচাড়া করা যাবে না ওকে। ওমরের ডান পায়ের হাড় ভেঙে গেছে তিন জায়গায়। মুখেও লেগেছে চোট। পুরো ঘটনায় মোহাম্মদ আল হাদিদির অনুভূতি রীতিমতো ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। বুঝতে পারছিলেন না মনের অবস্থা। বলেন, ‘(তখনকার) অনুভূতিটা ছিল খুবই অদ্ভুত। একদিকে আমার স্ত্রী ও বাকি সন্তানদের হারিয়েছি। অথচ এর মধ্যেই ওমরকে ফিরে পেলাম। বুঝতে পারছিলাম না আমার কেমন লাগছিল।’

তবে বুঝে গিয়েছিলেন, ওমরের ওপর সৃষ্টিকর্তার রহমত আছে। বলেন কারণটিও, ‘আমার মনে হয়, আজকের জন্য সৃষ্টিকর্তা ওকে আগে থেকেই প্রস্তুত করে রেখেছিলেন।’ নিজেকে নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মোহাম্মদ, ‘ওমর যখন বড় হবে, পুরো ঘটনাটি জানবে, নিজেকে কিভাবে সামলাবে—আমি জানি না। পৃথিবীর প্রতি ওর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে বলতে পারি না। ওর কথাই বা কেন বলছি! স্ত্রী-সন্তানদের হারিয়ে আমি কিভাবে বেঁচে থাকব, সেটিই তো ভাবতে পারছি না।’

ঘটনার পরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র দাবি করেন, আক্রমণের লক্ষ্য ছিল ইউসুফ আল হাত্তাব। তিনি হামাসের সশস্ত্র বাহিনী কাসাম ব্রিগেডের সিনিয়র কমান্ডার। কিন্তু সে দাবি উড়িয়ে দেন মোহাম্মদ। বলেন, ‘এসব ভুয়া কথা। ইউসুফ পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী ছিল। বৈদ্যুতিক ও নির্মাণ সামগ্রীর। কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগই ছিল না।’ আর মোহাম্মদের আরেক ভাই খালেদ আল হাদিদি ছুড়ে দেন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি, ‘এগুলো যদি সন্ত্রাসবিরোধী আক্রমণই হয়, তাহলে কি মোহাম্মদ আর ইউসুফের সন্তানরাও সন্ত্রাসী? পাঁচ বছরের ইয়ামেন, ছয় বছরের ওসামা ইসরায়েলে রকেট ছুড়েছে? হামলা করেছে? ওদের ব্যাপারে কী অজুহাত দেবে ওরা?’

তথ্যসূত্র : আলজাজিরা, ফ্রান্স২৪, মিডলইস্ট আই



সাতদিনের সেরা