kalerkantho

সোমবার । ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৪ জুন ২০২১। ২ জিলকদ ১৪৪২

ঢাকা থেকে সাইকেলে সান্তাহার

'এখনও স্বপ্ন বলেই ভেবে যাচ্ছি'

মৌসুমি আক্তার এপি   

১২ মে, ২০২১ ১৫:২৮ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



'এখনও স্বপ্ন বলেই ভেবে যাচ্ছি'

সাইকেল নিয়ে বাড়ি আসার ইচ্ছা মনে মনে পুষে রেখেছিলাম অনেক দিন থেকেই। কিন্তু কখনো আসা হয়নি দুরত্ব বেশি বলে যে, একদিনে শেষ করাটা অনেক কঠিন হবে এই চিন্তা করে। ৩ দুপুর ৩ টা ৩৫ মিনিটে মিলন ভাইয়া কে ফোন করে বলি ভাইয়া টাঙ্গাইলে পরিচিত কেউ আছে যার বাসায় একরাত থাকতে পারবো। ভাইয়া বললো কোথায় যাবেন? বাড়ি যেতে চাই সাইকেল নিয়ে কিন্তু এতো পথ রোজা রেখে একদিনে চালিয়ে যেতে পারবো না। তাই ভেঙে ভেঙে যেতে চাই। ভাইয়া বললো রাতে চালাতে পারবেন তাহলে একদিনেই চলে যেতে পারবেন। এক ছোট ভাই যাবে তাহলে আমি তার সাথে কথা বলতে পারি। 

কোনও কিছু চিন্তা না করেই বললাম ভাইয়া সাথে কেউ থাকলে অবশ্যই পারবো। ঠিক ৪ মিনিট পরে ৩ টা ৩৯ মিনিটে ফোন করে বললো আপু আপনি এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যেতে পারবেন? হ্যাঁ পারবো! তখন রাসেল অলরেডি জিরানী বাজার পর্যন্ত চলে গিয়েছিল, আমার জন্য  আবার ব্যাক করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসে এবং অপেক্ষা করে। আমাকে রাসেলের নাম্বার দিল এবং বললো আপু কথা বলে এখনি বের হয়ে যান।

সময় নিলাম ২০ মিনিট।  ঠিক ২৫ মিনিট এর মধ্যে ব্যাগ  গোছানো, রেডি হওয়া এবং সাইকেলের ক্যারিয়ার লাগানো শেষ করে ৪ টা ৫ মিনিটে বাসা থেকে বের হই। তার পরে সাফকাত ভাইয়ার সাথে দেখা করে তার সাইকেলের লাইট নেই এবং ভাইয়াকেও সাথে নিয়ে যাই খামার বাড়িতে সেখানে আল্লামা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ঠিক ৫ টা ৩০ মিনিটে গিয়ে সেখানে পৌঁছাই। তখনও আমি স্ট্রাভা অন করিনি কেননা একবার ট্রাই করেছিলাম GPRS পাচ্ছিল না। খামার বাড়ি এসে যখন ট্রাই করলাম দেখি কাজ করছে এবং সেখান থেকে রেকর্ড করা শুরু করলাম। 

গন্তব্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু সময়ের কাছে আটকে গেলাম ইফতারের আগে সেখানে পৌঁছাতে পারলাম না তার কিছুটা আগেই একটা দোকানে বসে ইফতার সেরে নিলাম এবং নামায সারলাম পাশের একটা বাড়িতে। ইফতার এবং নামায সেরেই রওনা হলাম জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এবং দেখা মিললো রাসেল ভাইয়ের সাথে। আল্লামা এবং রাসেলর কথা বলা দেখে মনে হলো তারা দুজন পূর্ব পরিচিত। যা ভাবলাম তাই ঘটলো। সেখানে আমরা হালিম খেলাম, খাওয়া শেষে আল্লামা মহুয়া আপুকে ফোন দিলো এবং আমারা যাচ্ছি সে কথা বললো। আমদের যাওয়ার কথা শুনে মহুয়া আপু দেখা করতে চাইলেন। আমি আল্লামার কাছ থেকে মহুয়া আপুর নাম্বার নিলাম এর পরে আল্লামা এবং সাফকাত ভাইয়া বিদায় নিলো।
 
রাসেল আর আমি প্যাডেল মারা শুরু করলাম গন্তব্য মহুয়া আপুর সাথে দেখা করা। গণস্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আমরা যেতেই দেখি মহুয়া আপু তরমুজ হাতে রিকশা থেকে নামছেন, সারাদিন রোযা রাখার পরে শরীরের জন্য তরমুজ এর ভুমিকাই অন্যরকম। কি খাওয়াটাই না খেলাম। ধন্যবাদ মহুয়া আপু। বিদায় পালা, বিদায় নিলাম। 

শুরু হলো লম্বা পথের প্যাডেল মারা। চতুর্থ লেনের রাস্তা হওয়ায় পার্শ্ব রাস্তা দিয়ে আমি আর রাসেল পাশাপাশি সমান গতিতে চালাচ্ছিলাম আর গল্প করছিলাম, বেশ লাগছিল। মাঝে মাঝে একটু প্যারা লাগছিল উল্টো দিক থেকে আসা রিকশা, সিএনজি গুলোর জন্য। তবে খুব বেশিক্ষণ এই প্যারাটা নিতে হয়নি। রোযার দিন হবার কারণে ১০ টার মধ্যেই রাস্তা বেশ গাড়ি শূন্য হয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল পুরো রাস্তাটাই আমাদের। পার্শ্ব রাস্তা দিয়ে চালানোর কারণে রাস্তা বেশ ভালোই আলো শূন্য ছিল। তাই প্রথমে রাসেলের লাইটের আলোতে আমি আলোকিত হই, চার্জ শেষ হলে রাসেল আমার লাইটের আলোতে আলোকিত হয়। 

মানে একটা লাইট ব্যাবহার করি আবার পাওয়ার ব্যাংক এ দিয়ে রি-চার্জ করি কেননা সারারাতই তো চালাতে হবে। দুজনই চালাচ্ছি ছন্দে ছন্দে নিরব রাস্তা ধরে হঠাৎ  অনুভব করলাম শীতল বাতাস সমস্ত শরীর কে ছুঁয়ে দিল, সাথে সাথে বললাম মনে হয় বৃষ্টি হবে। ইফতারে তেমন কিছুই খাওয়া হয়নি তাই ভালোই ক্ষুধা ক্ষুধা অনুভব হচ্ছিল রাসেল কে বললাম ভাত খেতে হবে নইলে আর শক্তি পাচ্ছি না, হোটেল দেখো পেলেই দাড়িয়ে যাবা বলতেই, হঠাৎ দেখি একটা খাবার হোটেল। ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখি তখন বাজে রাত ১১টা ৩০ মিনিট, ৭৪ কিলোমিটার চালিয়ে তখন আমরা টাঙ্গাইলের করটিয়াতে বাংলা খাবার হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টের সামনে। সেখানেই ভাত খেলাম এবং কিছুক্ষণ রেস্ট নিলাম। 

রাসেল বললো আপু উঠবেন? আমি বললাম আর ৫ টা মিনিট বসি বাতাসের শীতলতা দেখে মনে হচ্ছিল বৃষ্টি হবে! কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো ঝোড়ো হাওয়া এবং ঝুম বৃষ্টি সাথে প্রচণ্ড বজ্রপাত! বৃষ্টির গতি দেখে বুঝতে আর বাকি থাকলো না যে, থামতে অনেক সময় লাগবে। তাই সেখানেই আমি এবং রাসেল নামায সেরে নিলাম। বৃষ্টি থামার অপেক্ষায়। 

সময় রাত ১ টা ৫৫ মিনিট অপেক্ষার পালা শেষ হলো এবং সাইকেলের চাকা ঘুরতে শুরু করলো। রাস্তায় বেশ পানি তাই আস্তেই চালাতে হচ্ছে যেন কাঁদা না ছিঁটে তাই। নিরব শান্ত রাস্তায় আমরাই দুজন, হাইওয়েতে চলছে অনেক গাড়ি। রাস্তা এতোই জনমানব শুন্য ছিল যে, কখনো কখনো বেশ ভয়ও লাগছিল। তার পরেও চালাচ্ছি দুজন দুজনের সাথে বকবক করতে করতেই। রাত প্রায় ৩ টার কাছাকাছি সেহেরি করতে হবে। আবারও হোটেল খোঁজার অভিযান।তখন আমরা এলেঙ্গার ভেতর। হঠাৎ চোখে পরে ধানসিড়ি নামের একটি হোটেল। নাম দেখেই খাওয়ার আগ্রহ বেরে গেলো, ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখি ৩ টা ১০ মিনিট, ১০০ কিলোমিটার চালানো হয়েছে হোটেলের সামনে এগিয়ে গেলাম এবং ফ্রেশ হয়ে খেতে বসলাম। খাওয়া শেষ করে চা অর্ডার করলাম, চা খাইনা অনেকক্ষণ হয়েছে। বেশ মজার একটা চা ছিল। 

অনেক লম্বা রাস্তা এগুতে হবে তাই আবারও প্যাডেল এ জোর দিলাম এবার আর কোনও বিরতি নেই সোজা যমুনাসেতু। চলছি তো চলছিই ১৬ কিলোমিটার পরেই যমুনাসেতু ৪টা ৩৫ মিনিট এ পৌছেও গেলাম  TCR এর সামনে, দরজা বন্ধ দেখে ভাবলাম কেউ নেই রুমে তাই সামনে এগিয়ে গেলাম একজন ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন কোথায় যাচ্ছেন?  বললাম সেতু পার হবো  কাউকে দেখছি না ঊনি বললেন দরজা নক করেন লোক আছে। গেলাম, নক করলাম, কথা হলো একজন আমাদেরকে সাথে নিয়ে টোল এর দিকে নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে জানালেন আপনারা বসেন গাড়ি আসলে উঠিয়ে দিবে। এই কথা বলে তিনি চলে গেলেন। 

প্রায় ৫০ মিনিট বসে থাকার পরে একটি কার্গো গাড়িতে উঠিয়ে দিলেন। বাসে বহুবার জানালা দিয়ে যমুনাসেতু দেখেছি কিন্তু এমন খোলাভাবে দেখা হয়নি অন্যরকম লাগছিল। ঠান্ডা বাতাসে সিক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম! সেতু পার করে হাসান ভাই আমাদের সকাল ৬টা ৪ মিনিটে নামিয়ে দিলেন।

নতুন দিনের শুরু করলাম নতুন জেলা দিয়ে সিরাজগঞ্জের দিকে যাচ্ছি আমরা। লক ডাউন এর কারণে গাড়ির চাপ খুবই কম তাই নির্ভয়ে চালাতে পারছি। জনশূন্য রাস্তায় সকালবেলা মনে হচ্ছিল মুক্ত পাখির মতো উড়ছি আর শরীরে শীতল হাওয়া লাগাচ্ছি! রাসেলের গন্তব্য ছিল সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত তার পরে বিদায় নিবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিদায় দিলাম ভূঁইয়াগাতী থেকে। 

এতোক্ষণ একটা জোশ ছিল চালানোর মধ্যে, একজন আরেক জনের সাথে কথা বলেছি আর চালিয়ে এখন বাকি পথ একা চালাতে হবে। কি আর করার বিদায় দিয়ে চালানো শুরু করলাম একভাবে চালাচ্ছি তো চালাচ্ছিই প্রায় ২০-২২ কিলোমিটার চালানোর পরে মনে হলো একটু রেস্ট নেওয়া দরকার রোদও উঠেছে প্রচণ্ড গলাও টানছে প্রচুর সব মিলিয়েই কোথাও বসা দরকার। চালাচ্ছি আর মনে মনে কোন ছায়াঘেরা জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছি। খোলামেলা তেমন কোন ছায়াঘেরা জায়গা না মিললেও যেটুকু মিলেছিল সেখানেই ঘাসের উপর কিছুক্ষণ শুয়ে  ছিলাম অনেক শান্তিতে। কিন্তু এই শান্তি তো বেশিক্ষণের না, উঠতে হবে ফের চলতে হবে লম্বা পথ।

দু'চাকায় ভর করে ফের চলা শুরু। চলছি তো চলছিই হাইওয়েতে সাইকেল চালানোর সময় একটা জিনিস বেশ মিস করি সেটা হলো গ্রামের সহজ সরল মানুষদের অনেক প্রশ্ন অনেক কৌতুহল। সেটাও দূর হয়ে গিয়েছিল হঠাৎ যখন চোখে পরে মেইন রাস্তার পাশেই তালগাছের সারি আর তার নিচে রোমাঞ্চকর একটি বাঁশের মাচা এবং সেখানে বা তার আশে পাশে কেউই ছিল না। দেখেই বসার জন্য উদগ্রীব হয়ে গেলাম এবং সেখানে বসলাম বসার ঠিক ২-৩ মিনিট পরেই ২ জন চাচি এবং ৫ জন চাচা কোথা থেকে যেন এগিয়ে আসলেন এবং আমাকে খুব সুন্দরভাবে জিজ্ঞেস করলেন মা কোথা থেকে এসেছো কোথায় যাবা? 

 আমি খুব অবাক হলাম এতো সুন্দর ভাবে মা ডাকা শুনে! খুব আনন্দের সাথে উত্তর দিলাম ঢাকা থেকে এসেছি, সান্তাহার যাবো। তারা দেখলাম ব্যাপারটা খুব সহজভাবে নিলো এবং জিজ্ঞেস করলো তুমি কি সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াও এই কথা শুনে আরো অবাক হয়েছিলাম এবং এর উত্তরও খুব হাসিমুখে দিয়েছিলাম। হ্যাঁ! তাদের কাছে সময় ছিল না তাই খুব বেশি কথা বলতে পারেনি। তারা সবাই পাশের একটা ভুট্টার কারখায় কাজ করেন। তারা সবাই এই গ্রামেই থাকেন গ্রামের নাম রাজাপুর। 

লম্বা পথ চলতে হবে আরো অনেক দূর। এরপর আর কোথাও না থেমে একটানে গেলাম বগুড়া পর্যটন মোটেলের সামনে সেখানে বগুড়ার সাইক্লিস্ট ডলার ভাইয়া আসার কথা। কিন্তু সেখানে আর তার সাথে সাক্ষাৎ হলো না আমি এগিয়ে গেলাম সাতমাথার দিকে যেতেই কলোনির একটু আগে চলতি পথে ভাইয়ার সাথে সাক্ষাৎ। গন্তব্য সাতমাথায় বান্ধবী মালা অপেক্ষা করছে। ১১ টার দিকে সাতমাথায় পৌঁছে গেলাম সেখানে কস্তুরী হোটেলে কিছুক্ষণ বসার পরে মালা বললো বান্ধবী আজ আমাদের বাসায় চলো কাল সকালে যেও। আমারও বেশ ভালোই খারাপ লাগছিল গলাও টানছিল তাই সেদিন মালার বাসায় রাত্রি যাপন করলাম। 

সেহেরি করে ভোর ৬টা ৩০ মিনিটে চালানো শুরু করি মালাদের বাসার সামনে থেকে। শুরু করার ঠিক ১০ মিনিট পরেই শুরু হয় ঝিরিঝিরি বৃষ্টি এর ভেতরেই আস্তে আস্তে চালাচ্ছি। এদিকে মোস্তাফিজও সান্তাহার থেকে রওনা হয়েছে আমাকে এগিয়ে নিতে। কাহালু পার হয়ে মোস্তাফিজকে ফোন দিলাম দুপচাঁচিয়া এসে দাঁড়াবি কেননা এটা মিডল পয়েন্ট। কি অদ্ভুত দুজনই একই সময়ে দুপচাঁচিয়া পৌঁছালাম। এর পরে একসাথে চালানো শুরু করলাম। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর শীতল বাতাস চালাতে মোটেও ক্লান্তি লাগছে না সাথে শান্ত ফাঁকা রাস্তা, দুই পাশে পাঁকা সোনালি ধান বেশ মনোমুগ্ধকর ও আমেজের। 

সোনালী ধান চাষীরা কাটাও শুরু করেছেন। তখন আমার একটা গানই মুখ থেকে গুন গুন করে বের হচ্ছিল-
হায়রে আমার মন মাতানো দেশ
হায়রে আমার সোনা ফলা মাটি
রূপ দেখে তোর কেন আমার
নয়ন ভরে না
তোরে এত ভালোবাসি তবু
পরান ভরে না

আদমদিঘী চলে এসেছি গুনগুনানির মধ্য দিয়ে। ঢাকা রোড এ ভাগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। ফুপাতো বোন দাঁড়িয়ে আছে খাড়িব্রিজ তার অফিসের সামনে। বিপি স্কুলের সামনে বান্ধবী ইসরাত দাঁড়িয়ে আছে। পাঁচতলার সামনে আমার ইপি দাঁড়িয়ে আছে। সব ভালোবাসা একে একে গ্রহণ করে ফাইনালি সকাল ১০টা ১০ মিনিটে নিজ বাড়িতে প্রবেশ করি। আলহামদুলিল্লাহ!  সকলের প্রতি আমি জানাই আমার কৃতজ্ঞতা ও অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালোবাসা।

 

মৌসুমি আক্তার এপি, সাইক্লিস্ট ও অ্যাথলেট 



সাতদিনের সেরা