kalerkantho

মঙ্গলবার । ১ আষাঢ় ১৪২৮। ১৫ জুন ২০২১। ৩ জিলকদ ১৪৪২

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান : উন্নয়ন মানেই কি অযথা বৃক্ষনিধন?

অনলাইন ডেস্ক   

৬ মে, ২০২১ ১২:০১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সোহরাওয়ার্দী উদ্যান : উন্নয়ন মানেই কি অযথা বৃক্ষনিধন?

পৃথিবীর সব কিছুরই প্রায় বিকল্প আছে কিন্তু বৃক্ষের বিকল্প আছে কি-না একবার ভেবে দেখছেন কি? বৃক্ষের বিকল্প কি তৈরি করছে বা তৈরি হয়েছে? হয়নি আর হবেও না। কবিগুরু তার বৃক্ষ-বন্দনায় বৃক্ষকে আদিপ্রাণ বলে সম্বোধন করেছেন। প্রাণদায়ী বৃক্ষরাজি এ বসুন্ধরাকে এক অফুরন্ত সৌন্দর্যের মধুর নিকুঞ্জ করে গড়ে তুলেছে। মানুষের বসবাসের জন্য বাড়ি করা দরকার, জায়গা সংকটের দরুন পাশের গাছটি নির্বিচারে কেটে ফেলছি। বাড়ি বড় করছি কিন্তু বাড়িতে আলো-বাতাস আসবে কি-না, বাসযোগ্য হবে কি-না তা কিন্তু ভাবি না। 

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে মানবজাতি অরণ্যের স্নিগ্ধ সান্নিধ্যে সুপ্ত পদব্রজে এগিয়ে চলেছে নগর-সভ্যতা বিনির্মাণে। কুঠারের আঘাতে ধ্বংস করেছে পৃথিবীর তপোবন আশ্রিত সেই শান্তি নিকেতনকে। নগর-সভ্যতার নিষ্পেষণে শূন্য হতে চলেছে পৃথিবীর অক্সিজেন ভাণ্ডার। বাতাস হয়ে উঠেছে বিষবাষ্পে পূর্ণ। মানুষ যেন বৃক্ষের সঙ্গে চির আত্মীয়তা ছিন্ন করার মরণখেলায় মত্ত হয়ে উঠেছে। তাই তো কবি বলেছেন, 'দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য, লও এ নগর'।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য কোনো দেশের মোট ভূমির শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে বনভূমি কর্তনের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৪৭ সালে এদেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৪ ভাগ বনভূমি ছিল। ১৯৮০-৮১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৭.২২ ভাগ। আর বর্তমানে বনভূমি দিনকে দিন কমছে। রমনা পার্ক-সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে বলা হয় ঢাকার ফুসফুস। কারণ সবুজে ঘেরা পাখ-পাখালির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত এ উদ্যানে নগরবাসীর কাটে স্বস্তির সময়। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রকৃতির রূপ ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান! রেস্টুরেন্ট বানানোর নামে উদ্যানের অর্ধ-শতাব্দীর শতাধিক পুরনো গাছ কেটে উজাড় করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৫ সালে ঢাকার সবুজ অঞ্চল ছিল ১২ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৮ শতাংশ এবং বর্তমানে ৬-৭ শতাংশের বেশি না। ঢাকাতে যত পরিমাণে গাছ কাটা হয়, তার অল্প পরিমাণই রোপণ করা হয়। ৮০ দশকের পর থেকে বৃক্ষনিধন শুরু হয়েছে। ফলে ঢাকার চেহারাও বদলাতে শুরু হয়। গাছপালা আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন। এছাড়া বৃষ্টিপাত ঘটাতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে। গাছের ডাল, বাকল, পাতা অনেকে ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করে। কিন্তু বৃক্ষনিধনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রীষ্মে ঢাকায় গড় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে। এছাড়া অতি বা অনাবৃষ্টি, ঝড়, বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। 

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের হাত থেকে দেশের মানুষকে বাঁচাতে সরকার যখন লকডাউনসহ নানান পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেই সুযোগে একদল মানুষ রেস্টুরেন্ট স্থাপনের নামে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্বিচারে একের পর এক গাছ কেটে চলছে। গত কয়েকদিন ধরে খোদ রাজধানীর বুকে বৃক্ষ হত্যার এ আয়োজন চলছে। অথচ এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আর রমনা পার্ক কংক্রিটের এ শহরের 'ফুসফুস' বলে পরিচত। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবগুলো প্রবেশপথসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৭টা রেস্টুরেন্ট স্থাপন করার কাজ শুরু করেছে গণপূর্ত বিভাগ। তাদের দাবি, এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও রয়েছে। কিন্তু বেশ কিছু প্রশ্ন এখানে সাধারণ মানুষের মনে জাগাটা একদমই স্বাভাবিক। প্রথমত, বৃক্ষনিধন করেই কেন এমন স্থাপনা নির্মাণ একান্ত প্রয়োজন? দ্বিতীয়ত, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেআইপি) এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। সেখানে রেস্টুরেন্টের মতো অপ্রয়োজনীয় নির্মাণ কেন বাধ্যতামূলক? তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক এমন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যানের ইতিহাসের সাক্ষী বৃক্ষগুলো কি একান্তই মূল্যহীন?

একটি গাছের বয়স শত বছর হয়ে গেলেও সেখানে একটি ইকো সিস্টেম দাঁড়িয়ে যায়। গাছটি কাটা হলে পুরো সিস্টেমের ওপর আঘাত পড়ে। যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই যেকোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশের কথা বিবেচনায় নিতে হবে। গাছ রেখেই উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। তাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবেশ, সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, দৈনন্দিন পরিচালনা বিশ্বমানের করতে হবে। রমনা গ্রিন ধরে রাখতে হবে; জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে উদ্যানের জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক ভারসাম্য যেন নষ্ট না হয় এর প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ, আমরা যদি আমাদের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিবেশের সুস্থতাকে এখনই সংশ্লিষ্ট না করে টেকসই উন্নয়নের স্বপ্নে বিভোর থাকি, আমাদের পরিবেশের সবকিছুই শেষ হয়ে যাবে; আমরা আমাদের পরবর্তী বংশধরদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারব না।

মোদ্দাকথা হলো, ইতিহাসের সাক্ষী সবুজের সমারোহ গাছ-গাছালির ছায়া ঢাকা ও পাখি ডাকা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। দেশের নতুন প্রজন্ম, পরবর্তী প্রজন্ম বংশপরম্পরায় শত শত বছর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দেখবে এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বকে স্মরণ করবে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিজড়িত স্থানগুলো চিহ্নিত করেই ঢাকার এই খোলা ময়দানকে উন্মুক্ত রাখা সম্ভব। সবুজ প্রায় নিঃশেষিত উদ্যানটি আর যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। তারপরও যদি একান্তই কোনো উন্নয়ন করতেই হয়, সেটা যেন হয় কোনো ধরনের পরিবেশের ক্ষতি না করে এবং ইতিহাসের কোনো মূল্যবান সম্পদকে ধ্বংস না করে করা হয়। নতুবা, খাবারের রেস্টুরেন্ট নির্মাণের নামে যদি ইকোলজিকাল পরিবেশ বিনষ্টের পাশাপাশি উদ্যানের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হয় ভবিষ্যতে এর জন্য আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে।
 
লেখক : মো. শাহ জালাল মিশুক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নগর পরিকল্পনাবিদ।



সাতদিনের সেরা