kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

এরা রাষ্ট্রের শত্রু কোনো ‘মার্সি’ নয়

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)   

২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০২:৪২ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



এরা রাষ্ট্রের শত্রু কোনো ‘মার্সি’ নয়

হেফাজতের বড় ষণ্ডা মামুনুল ১৮ এপ্রিল দুপুরের পরপর রাজধানীর একটি মাদরাসা থেকে গ্রেপ্তার হয়। খবরটি টেলিভিশনের সংবাদে প্রচারিত হওয়ার পর দেশের মানুষ জানতে পারে। রাত ৯টায় বাসায় একা একা তারাবির নামাজ পড়তে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ডজনখানেক টেলিফোন পাই। বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধা এবং এর সঙ্গে কয়েকজন নতুন প্রজন্মের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অনেকে অনেক কথাই বললেন। আফসোস করলেন কেউ কেউ, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক পক্ষ ক্ষমতায় থাকতে জাতির পিতার ম্যুরাল ভাঙার সাহস তারা কোথা থেকে পায়। সবার মুখে কমন কথা ছিল, এরা রাষ্ট্রের শত্রু। রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে এদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। ক্ষমা ও আপসের অর্থ এরা বোঝে না। তাই রাষ্ট্রের আইনি ক্ষমতার জোর হাড়ে হাড়ে এদের বুঝিয়ে দিতে হবে। বিকৃত অর্থসহ ধর্মের নামে এরা মিথ্যাচার করছে। অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে লাখ লাখ কিশোর মাদরাসাছাত্রের জীবন এরা নষ্ট করছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য। এই ষণ্ডারা তাদের বোঝাচ্ছে ‘দুনিয়াদারি কিছুই না; বরং ধর্মের নামে জীবন দিলে মুহূর্তের মধ্যে বেহেশত এবং সেখানে হুরসহ অশেষ আরাম-আয়েশ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। খামাখা এত কষ্ট করে দুনিয়ায় বেঁচে থেকে লাভ নেই। এই শিক্ষাই দেওয়া হয় মাদরাসায়। অথচ তারা জানে না, এই দুনিয়ার যদি কোনো অর্থই না থাকে, তাহলে আল্লাহ তা সৃষ্টি করতেন না।’

দুনিয়াভরা অগণিত বিশাল বিশাল সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ, যার মধ্যে মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ সৌন্দর্যের প্রতীক। আল্লাহর এই সৌন্দর্য ও সুন্দরকে বিকশিত করাই মানুষের প্রথম ও প্রধান কাজ, যার জন্য মানুষে মানুষে সম্প্রীতি আর সহাবস্থান অপরিহার্য। নাম হেফাজতে ইসলাম, কাজ সম্পূর্ণ বিপরীত। শিশুকাল থেকে শিখে আসছি, মিথ্যা বলা মহাপাপ। এখন হেফাজতের এই মামুনুল বলছে, স্ত্রীকে খুশি করার জন্য মিথ্যা কথা বলা যায়। এত বয়সের জীবনে এই প্রথমবার মিথ্যা কথা বলার পক্ষে সাফাই শুনলাম। ধর্মের নামে এত বড় মিথ্যা বলতে তার একটুও বাধল না। অথচ মুসলমানদের বড় পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) বাগদাদের পথে ডাকাত সর্দারের জিজ্ঞাসায় নিজের জামার আস্তিনের নিচে গোপনে সেলাই করে রাখা শেষ সম্বল ৪০টি স্বর্ণমুদ্রার কথা অকপটে স্বীকার করলেন। চরম বিপদে সব হারানোর ভয়েও ডাকাত সর্দারের কাছে মিথ্যা বললেন না। মামুনুলরা নামে-বেনামে তিন-চারটি বিয়ে করে এবং ঢাকার মতো ব্যয়বহুল শহরে প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন ফ্ল্যাটে রাখে। এত টাকা এরা কোথা থেকে পায়। মাদরাসায় শিক্ষকতা করে ঢাকায় তিন-চারটি পরিবার মেইনটেন করা কি সম্ভব? তবে সবাই জানে, এদের টাকা ভূতে জোগায়। এই ভূতের নাম পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর সফরের মধ্য দিয়ে আইএসআই বাংলাদেশে তাদের পুরনো দোসরদের সঙ্গে পুনঃসংযোগের যাত্রা শুরু করে। সেই সংযোগের চরম পরিণতি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল এবং জিয়ার হাত দিয়ে শুধু নামটা বাংলাদেশ রেখে মুক্তিযুদ্ধের বাকি সব কিছু কবর দেওয়ার কাজটি আইএসআই অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের মোল্লা ও মিলিটারিতন্ত্রে উদ্বুদ্ধ জামায়াতসহ সব উগ্র ধর্মান্ধ দল আইএসআইয়ের পরিকল্পনা ও ইচ্ছানুসারে বাংলাদেশে পুনরুজ্জীবিত হয়। মুসলিম লীগের সব উপদল ও চীনপন্থী চরম বাম, যারা মুক্তিযুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিল, তারাও কৌশলের অংশ হিসেবে ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এবং ভালো ছদ্মবেশ ধারণের জন্য মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের অধীনে জড়ো হয়ে বিএনপি নামের দল গঠন করে। তখন হেফাজত নামে কেউ ছিল না। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখুন, আজকের সব হেফাজত নেতার পূর্বপুরুষরা একাত্তরে পাকিস্তানের দোসর ছিল। সুতরাং জামায়াত-হেফাজতের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। কৌশলের অংশ এবং টাকা-পয়সার ভাগ-বাটোয়ারার সুবিধার্থে তারা ভিন্ন দুটি সংগঠনে। জামায়াতের কোমরে যত দিন জোর ছিল, তত দিন হেফাজত আত্মপ্রকাশ করেনি। কিন্তু ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের শুরু জামায়াতের জন্য অশনিসংকেত হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে হেফাজতের জন্ম হয়। যার পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতা ওই একই জায়গা আইএসআই থেকে এসেছে। সব কিছুর একটু সমীকরণ করলেই এর সত্যতা যে কেউ বুঝতে পারবেন। কিছুই বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে না। এরা যা করছে এবং তাতে বাংলাদেশের প্রতি যে হুমকি সৃষ্টি হচ্ছে সেটি তারা কিছুতেই করতে পারত না, যদি বিএনপি এদের একান্ত একনিষ্ঠ সঙ্গী না হতো এবং আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের রাজনীতিতে যদি আদর্শগত চরম পদস্খলন না ঘটত। আরেকটি বড় দুর্বলতার জায়গা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকার, দল, আমলাতন্ত্র এবং যে যেখানে আছেন তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য, কী করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে নিজস্ব সংকীর্ণ পদ-পদবি, ক্ষমতা ও কিছু সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেওয়া যায় তার জন্য শর্টকাট রাস্তা খোঁজায় ব্যস্ত থাকেন। ইতিহাসের শিক্ষা ও মাঠের বাস্তবতার সংমিশ্রণে যত তিক্ত-কঠিনই হোক বৃহত্তর স্বার্থে সেই মূল্যায়নপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের নৈতিক সাহস ও আত্মবিশ্বাস কয়জন রাখেন, সে কথাই আজকাল ঘরোয়া আলোচনার বিষয়বস্তু। তা না হলে জামায়াতের মতো ক্যাডারভিত্তিক দলের কোমর ভাঙা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সন্ত্রাসী দলের তকমা নিয়ে বিএনপি যখন খুঁড়িয়ে চলছে, তখন হেফাজতের মতো কালসাপকে দুধ-কলা খাওয়ানোর পরিণতি উপলব্ধি করা তো কঠিন কাজ ছিল না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বহু কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তিনি ইতিহাসে অনন্য স্থান পাবেন, যার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা যেমন আজও হয় না, তেমনি আগামী শত বছরেও হবে না। ইতিহাসের অভিশাপ মাথায় নিয়ে একটি রাষ্ট্র বেশি দূর অগ্রসর হতে পারে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে বড় এক অভিশাপ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছে। একটি কথা নির্দ্বিধায় সবাই বলেন, এটা শুধু বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনার জন্য সম্ভব হয়েছে। তিনি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে, সব দায় তিনি নিয়েছেন। অন্য কেউ এ দেশের জন্য কিছু করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। তাই বঙ্গবন্ধুর মেয়ে যদি ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি এবং হেফাজতের মতো উগ্রবাদীদের কবল থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করে দিয়ে যেতে পারেন, তাহলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আর কোনো বড় বাধা থাকবে না। কিন্তু যুদ্ধটা একাত্তরের চেয়েও কঠিন এবং অনিশ্চয়তায় ভরা। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ষড়যন্ত্র এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির জায়গায় চলমান সমীকরণের কোন দিকে, কোন অবস্থান থেকে কখন কী উদ্যোগ নিলে মূল লক্ষ্য অর্জনে তা সহায়ক হবে সেই ধরনের সঠিক, সত্য, নির্মোহ মূল্যায়নপত্রের আপডেট ভার্সন সব সময় প্রধানমন্ত্রীর সামনে থাকা উচিত। বিচ্ছিন্নভাবে এবং সহজাত শত্রু-মিত্রের বিষয়টি বিবেচনা ব্যতিরেকে সিদ্ধান্ত নিলে হিতে বিপরীত হবে। সম্প্রতি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার একটা ছদ্মবেশী চেষ্টা ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে কথা গত পাক্ষিকের লেখায় উল্লেখ করেছি। আলোচিত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক যুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ এখন পরিষ্কার। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রদ্রোহী হেফাজত নেতাদের ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জামায়াত, বিএনপিসহ সব ইসলামিসট দল যার যার জায়গা থেকে এখন হেফাজতকে সামনের সারির সেনা হিসেবে ব্যবহার করছে। এরা অপেক্ষায় আছে হেফাজতের প্রাথমিক বিজয় হলেই সম্মিলিতভাবে তারা মাঠে নামবে। এই সুযোগ তাদের দেওয়া যাবে না।

হেফাজতকে কঠোর হস্তে দমন করা গেলে সন্ত্রাসী দলের তকমাধারী জামায়াত-বিএনপি সম্মুখে আসার সুযোগ পাবে না। বৃহত্তর মানুষের সঙ্গে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ রক্ষায় সব ধরনের ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত। ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে মাঠে নামলে তাদের কী লাভ হবে, তা যদি সঠিকভাবে তুলে ধরা যায় তাহলে অবশ্যই তারা সামনে আসবে। হেফাজত ফাঁকা মাঠ পাবে না, যেমনটি তারা সম্প্রতি পেয়েছে। সামাজিক মাধ্যম ও ইউটিউব খুললেই সম্মিলিত ওই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পক্ষের প্রপাগান্ডা একের পর এক যেভাবে মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে তাতে যেকোনো মানুষের জন্য বিভ্রান্তিতে পড়া অস্বাভাবিক নয়। বিভ্রান্তিতে থাকা মানুষ সংকটে নীরব থাকাকে নিরাপদ মনে করে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তরুণদের মন থেকে বিভ্রান্তি দূরীকরণ এবং নতুনভাবে উদ্বুদ্ধকরণের সক্রিয় তৎপরতা নেই। পোশাকি বক্তৃতা আর অনুষ্ঠানে এ কাজ হবে না। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের ওপর থেকে তরুণ প্রজন্ম আস্থা হারিয়েছে। তাঁদের কথায় কেউ উদ্বুদ্ধ হয় না, বরং মনে মনে অন্য কথা ভাবে। ২৭ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তাণ্ডব প্রতিরোধে কেউ এগিয়ে এলো না বলেই আমি উপরোক্ত কথাগুলো বলছি। হেফাজত সেদিন রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ করেছে। আত্মতুষ্টি চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। জামায়াত-হেফাজত কোনো দিন তাদের মাদরাসা ও প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা ওঠায় না, জাতীয় সংগীত গায় না। আর কিছুর প্রয়োজন হয় না। এই অপরাধেই তাদের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচার করা যায়। হেফাজতের সাম্প্রতিক তাণ্ডব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, যে কথা আগেও বলেছি। ১৯৭৫ সালের পর আবির্ভূত সব সামরিকতন্ত্রের  রাজনৈতিক অপশক্তি বাংলাদেশকে বিলীন করার জন্য যা যা করে আসছে, তারই ধারাবাহিকতায় হেফাজত এখন তাণ্ডবে নেমেছে। স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের যা কিছু অগ্রগতি ও প্রাপ্তি আছে তা ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ওপর ভিত্তি করে। সুতরাং হেফাজতি অপশক্তিকে আর ছাড় দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রীয় আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ ও কঠিন শাস্তি দরকার। এদের প্রতি মার্সি দেখানো মানে রাষ্ট্রের সর্বনাশ।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]



সাতদিনের সেরা